রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়: ডুলি
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮১ নম্বরে থাকা একটি দলের খেলার ধরন রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়—দায়িত্ব নিয়ে আবারও এই কথা উচ্চারণ করলেন জাতীয় ফুটবল দলের নতুন কোচ থমাস ডুলি। সান মারিনোর বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচের আগে সময় নিয়ে বদল আনার আভাস দিলেন তিনি।
আগামী ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের জন্য ২৩ সদস্যের দল ঘোষোনার পর স্কোয়াড নির্বাচন, নিজের ফুটবল দর্শন এবং খেলোয়াড়দের মানসিকতায় বড় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ডুলি।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দলের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ডুলি অকপটে জানান দায়িত্ব নেওয়ার পরের সংক্ষিপ্ত প্রস্তুতি সময়ের চ্যালেঞ্জগুলোর কথা। দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র দুই থেকে তিনটি অনুশীলন সেশন পরিচালনা করতে পেরেছেন তিনি।
২৩ সদস্যের চূড়ান্ত দল নিয়ে নিজের মূল্যায়ন জানাতে গিয়ে ডুলি বলেন, ‘সবকিছুর জন্য সময়ের প্রয়োজন, এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। আপনাদের বুঝতে হবে যে, এখানে আসার পর আমরা কয়টি অনুশীলন সেশন পেয়েছি? বড়জোর দুটি বা তিনটি। তাই দেশের সব ভালো খেলোয়াড়কে এত কম সময়ে চেনা খুবই কঠিন। এটা এমন নয় যে বাংলাদেশে সব খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি ওপেন ট্রায়াল হচ্ছে কিংবা আপনি অনলাইনে গেলেই সব খেলোয়াড়দের তথ্য পেয়ে যাবেন।’
কোচ জানান, প্রাথমিক ক্যাম্পের খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে যারা অনুশীলনে নিজেদের মেলে ধরতে পেরেছেন, তাদেরই চূড়ান্ত তালিকায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। খেলোয়াড়রা কেউ রোবট নন—এই বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা মানুষ, মেশিন নয়। কখনো তারা ভুল করবে, কখনো অনুশীলনে দুর্দান্ত করবে, আবার কখনো হয়তো সাধারণ মানের সেশন যাবে।’
ডুলির কাছে সান মারিনো ম্যাচটি মূলত একটি তাৎক্ষণিক পরীক্ষার ক্ষেত্র। এরপর লিগের খেলাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিনি প্রায় দুই মাস সময় পাবেন। কোচের মূল লক্ষ্য বছরের পরের দিকে হতে যাওয়া ফিফা উইন্ডোগুলো, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং নভেম্বরের ফিফা উইন্ডো, যখন টুর্নামেন্টগুলো থাকবে। তখনই আমাদের সেরা ২৩ জনকে বেছে নিতে হবে।’
দল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়দের আশ্বস্ত করে তিনি জানান, নিজেদের প্রমাণ করতে পারলে দলের দরজা সবার জন্যই খোলা রয়েছে।
ভুল অভ্যাস ভাঙার চেষ্টা
বাংলাদেশ দলকে কেমন ফুটবল উপহার দিতে চান—এমন প্রশ্নে ডুলির উত্তর ছিল স্পষ্ট। তিনি পজেশনভিত্তিক আক্রমণাত্মক ফুটবলের পক্ষে। যদিও তিন ডিফেন্ডারের ফরমেশনে দল সাজাতে ভালোবাসেন, তবে এই মুহূর্তে তিনি ৪-২-৩-১ ফরমেশনেই আস্থা রাখছেন। কারণ তিন ডিফেন্ডারের ব্যাকলাইনে খেলতে হলে খেলোয়াড়দের ব্যাকগ্রাউন্ডে অসাধারণ গতি, ম্যাচ রিডিং এবং ওয়ান-অন-ওয়ান ডিফেন্ডিংয়ের দারুণ দক্ষতা থাকতে হয়।
ডুলি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের মূল ভাবনা হলো আমরা ফুটবল খেলব, বলের পেছনে দৌড়াব না। তার মানে ফুটবল পাসের মৌলিক বিষয় এবং রিসিভিং একদম নিখুঁত বা নিখুঁতের কাছাকাছি হতে হবে। এটি কোনো পানীয় নয় যে আপনি পান করলেন আর হঠাৎ করেই বলের ওপর আপনার ভালো টাচ চলে এল। এটি আসে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে।’
শুধু টেকনিক্যাল দিকই নয়, ডুলি সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন মাঠের ভেতরের মানসিকতায়—যেটিকে তিনি খেলোয়াড়দের ‘পুরোনো ভুল অভ্যাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮১ নম্বরে আছি। আমাদের সামনে ১৮০টি দল আছে যারা আমাদের চেয়ে ভালো কিছু করছে। তাই আমাদের তাদের কাছাকাছি যেতে হবে এবং আমি মনে করি এটি ঠিক করা সম্ভব। আমাদের শুধু একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করা শুরু করতে হবে।’ দলের প্রেসিং নিয়ে উদাহরণ দিয়ে তিনি যোগ করেন, 'সবাইকে একসঙ্গে প্রেস করতে হবে। মাঝমাঠের একজন খেলোয়াড়ও যদি প্রেসিংয়ে অংশ না নেয়, তবে পুরো চেষ্টাটাই বৃথা যাবে।’
এই পেশাদার চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে কোচিং স্টাফরা প্রচুর ভিডিও অ্যানালাইসিস ব্যবহার করছেন, যাকে ডুলি বলছেন 'ব্রেইন মেমোরি' তৈরি করা—যার মাধ্যমে খেলোয়াড়রা মাঠে তাৎক্ষণিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ডুলির মতে, ‘প্রত্যেক খেলোয়াড়কে নিজের দায়িত্ব বুঝতে হবে। একজন ডিফেন্ডারের দায়িত্ব একজন ফরোয়ার্ডের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের খেলোয়াড়দের মাথায় এই বিষয়টি ঢুকিয়ে দিতে হবে।’
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ দেখার সময় নেই
কাজের প্রতি ডুলির নিবেদন কতটা গভীর, তা বোঝা যায় যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলা দেখবেন কিনা।
ডুলি বলেন, ‘আমার সময় নেই। আমি অবশ্যই দেখতে পছন্দ করতাম। তবে তার চেয়ে আমি আমাদের গতদিনের ম্যাচটি বারবার দেখব, আমরা কোথায় ভুল করছি আর কোথায় ঠিক করছি—তা কেটে আলাদা ফাইলে সাজাব। এই মুহূর্তে আমার পুরো মনোযোগ শুধুই বাংলাদেশ জাতীয় দল।’
কোচের এই আধুনিক ও অ্যানালিটিক্যাল পদ্ধতির সঙ্গে খেলোয়াড়রাও দারুণভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন। নতুন কোচের কাছ থেকে দল কতটা শিখছে—জানতে চাইলে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা যখন মিটিং করি, তিনি মূলত ভিডিও অ্যানালাইসিস দিয়ে আমাদের দেখান যে অতীতে আমরা ঠিক কীভাবে গোলগুলো কনসিড (হজম) করেছিলাম।’