মেসিও দ্বিধায়
লিওনেল মেসির খেলা দেখতে বসলে ফুটবলপ্রেমীদের প্রায়ই এক মধুর সমস্যায় পড়তে হয়। তার কোন জাদুতে বেশি মুগ্ধ হবেন? চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিংয়ে, অবিশ্বাস্য কোনো পাসে, নাকি দুর্দান্ত এক গোলে? একটি মুহূর্তকে সেরা ভাবতে না ভাবতেই আরেকটি মুহূর্ত এসে সেই সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। মেসি যে এত কিছু পারেন, সেটা জানা থাকার পরও বারবার অবাক হতে হয়। এত বছর ধরে তাকে দেখেও যেন মুগ্ধতার শেষ নেই।
অথচ যার খেলা দেখে কোটি কোটি মানুষ এমন দ্বিধায় পড়েন, সেই মেসি নিজেও এখন এক ধরনের দ্বিধায়। তবে সেটি তার খেলা নিয়ে নয়, নিজের অর্জন নিয়ে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ফুটবল তাকে যা দিয়েছে, তার সবটুকুর মূল্য সত্যিই বুঝতে পেরেছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর মেসির নিজেরও জানা নেই।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে দুই দশকের বেশি সময় কাটিয়ে বিদায় নেওয়ার পর এমন কথাই বলেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা। গত মঙ্গলবার বুয়েনস এইরেসের এল মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এরপর তার একটি বিশেষ ভিডিও প্রকাশ করেছে ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। সেখানেই নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার, অর্জন আর বিদায়ের অনুভূতি নিয়ে কথা বলেছেন মেসি।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের মেসিকে এখনকার মেসি কী পরামর্শ দিতেন? এমন প্রশ্নে তার উত্তর, ‘উপভোগ করো। প্রতিটি মুহূর্ত আরও বেশি করে উপভোগ করো। সত্যি বলতে, ফুটবলে আমি যা কিছু অর্জন করেছি, তার সবকিছু ঠিকমতো বুঝতে পেরেছি কি না, সেটাও জানি না।’
কথাটা শুনে কিছুটা অবাক লাগতেই পারে। যে মেসির ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ আছে, কোপা আমেরিকা আছে, চ্যাম্পিয়নস লিগ আছে, আছে আটটি ব্যালন ডি’অর, সেই মেসিই কিনা নিজের অর্জনের বিশালতা কতটা বুঝেছেন, তা নিয়ে নিশ্চিত নন!
অবশ্য মেসির ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কতটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি। একসময় আর্জেন্টিনার হয়ে বড় শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ তাকে তাড়া করেছে। টানা ফাইনাল হারের পর শুনতে হয়েছে সমালোচনা। জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ঘোষণাও দিয়েছিলেন একবার। আবার ফিরে এসেছেন। শেষ পর্যন্ত সেই আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছেন কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ। যে স্বপ্ন একসময় বারবার ভেঙেছে, সেই স্বপ্নই একদিন সত্যি হয়েছে তার হাতে।
এত সাফল্যের ভিড়েও দেশের জার্সিতে খেলার অনুভূতিটা মেসির কাছে সব সময় আলাদা। আর্জেন্টিনার হয়ে এতগুলো বছর কাটানোর পর বিদায় বলাটা তাই সহজ হচ্ছে না তার জন্য। মেসি বলেছেন, ‘এখানে আসতে আমার ভীষণ ভালো লাগত। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসেছি। তাই এখান থেকে সরে যাওয়া সহজ নয়। এতগুলো বছর আমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, আর্জেন্টিনা।’
দেশের হয়ে খেলার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জয়-পরাজয়ের কথাও বলেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সির গুরুত্ব কেবল শিরোপা জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বলে জানান তিনি, ‘এই জার্সি পরা এবং সমস্ত হৃদয় দিয়ে এর মর্যাদা রক্ষা করতে পারা আমার জন্য ছিল বিরাট সম্মানের। আমি পরাজয় দেখেছি, জয়ও দেখেছি। কিন্তু এই জার্সি পরার অর্থ সবকিছুর চেয়েও বেশি। আর আমি সব সময় সেভাবেই দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছি।’
আর্জেন্টিনার অধ্যায় শেষ হলেও মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার এখনই শেষ হচ্ছে না। ক্লাব ফুটবলে এখনো খেলে যাচ্ছেন তিনি। মাঠে বল পায়ে নিলেই সেই চেনা মেসিকে দেখা যায়, যার পরের মুহূর্তে কী করবেন, তা আন্দাজ করা আজও কঠিন।
আর সেখানেই যেন মিলে যায় মেসি ও তার ভক্তদের অনুভূতি। আমরা দ্বিধায় থাকি, মেসির কোন মুহূর্তটাকে সেরা বলব। আর মেসি দ্বিধায়, ফুটবল তাকে যা দিয়েছে, তার সবটুকুর মূল্য তিনি বুঝতে পেরেছেন কি না। পার্থক্য শুধু এটুকুই, আমাদের বিস্ময় মেসির খেলা দেখে, আর মেসির বিস্ময় নিজের এত দীর্ঘ পথচলা নিয়ে।

