রিয়াল মাদ্রিদে কেন আলোনসোর অধ্যায় থেমে গেল?

স্পোর্টস ডেস্ক

দৃশ্যগুলো মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছিল। কিলিয়ান এমবাপে সতীর্থদের মাঠ ছাড়তে ইশারা করছেন। জাবি আলোনসো তাকে থেকে যেতে অনুরোধ করছেন। এমবাপে অনড়। আর শেষ পর্যন্ত তারকার দাবির কাছেই নতি স্বীকার করছেন কোচ। রোববার স্প্যানিশ সুপার কাপ জয়ের পর বার্সেলোনার জন্য কোনো গার্ড অব অনার হয়নি।

অনেকের চোখে এটি ছিল ক্রীড়াসুলভ সৌজন্যের অভাব, যা জাবি আলোনসোর চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। কিন্তু এর চেয়েও বড় যে ইঙ্গিতটি মিলেছিল, তা হলো দলের নিয়ন্ত্রণ যেন কোচের হাতে নয়, বরং খেলোয়াড়দের হাতেই।

ফাইনালটি ছিল সমানে সমান, ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল এক ডিফ্লেকশনে। এমন এক মুহূর্তে মনে হতেই পারে, আলোনসোর ভেতরে কোথাও সিদ্ধান্তটা গড়ে উঠেছিল, এবার যথেষ্ট।

তবে এটি কোনো পদত্যাগ ছিল না। আর আগেভাগে পরিকল্পনাও করা হয়নি। রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাড়ে সাত মাস পরই বিদায় নিতে হবে, এমনটা আলোনসো নিজেও ভাবেননি। অন্তত তখন নয়।

ক্লাবের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এটিকে বলা হয়েছে 'পারস্পরিক সমঝোতার সিদ্ধান্ত'। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল এক অনিবার্য বিদায়।

গত কয়েক মাস ধরে কৌশল ও খেলার ধরন নিয়ে কোচের সঙ্গে একের পর এক মতবিরোধ চলছিল। শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ সময় সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বোর্ড বৈঠকে বসে একটি মাত্র এজেন্ডা নিয়ে, জাবি আলোনসোর বিদায়।

তাকে ও তার ঘনিষ্ঠদের যে ব্যাখ্যাগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো ছিল, নরম করে বললেও, অস্পষ্ট।

— বায়ার লেভারকুজেনে যে ফুটবল তাকে এতটা সফল করেছিল, তা তিনি মাদ্রিদে বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

— দলের শারীরিক অবস্থা আদর্শ পর্যায়ে ছিল না।

— খেলোয়াড়দের প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি।

— তারা যেন কোচের জন্য খেলছিল না।

এর সঙ্গে যোগ করা হয় পরাজয়ের তালিকাও, ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্যারিস সাঁ জার্মেইর (পিএসজি) কাছে হার, লা লিগায় আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে ৫–২ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজয়সহ আরও কয়েকটি ম্যাচ।

তবু বাস্তবতা হলো, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বে রিয়াল মাদ্রিদ রয়েছে সেরা আটে, যে প্রতিযোগিতিই তাদের পরিচয়ের ভিত্তি। কোপা দেল রের পরের রাউন্ডেও তারা জায়গা করে নিয়েছে। লা লিগার মাঝপথে বার্সেলোনার চেয়ে চার পয়েন্ট পিছিয়ে থাকলেও অক্টোবরে এল ক্লাসিকোতে কাতালানদের হারিয়েছে মাদ্রিদ। তাহলে কি এটাকে সত্যিই সংকট বলা যায়?

সংকটের চেয়েও বড় সত্য ছিল এটি, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ কখনোই তার কোচের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেননি।

আলোনসোর নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে নয়। বায়ার লেভারকুজেনেও শুরুতে সবাই তার ওপর আস্থা রাখেনি। তবে ফল আসতেই দল তার দিকে ঝুঁকে পড়ে। মাদ্রিদে তা হয়নি। ভালো ফল থাকা সত্ত্বেও শুরু থেকেই আলোনসো নিজেকে একা অনুভব করেছেন।

রিয়াল মাদ্রিদে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা ফুটবলের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। কেউ মাদ্রিদকে না বলে না, এমনকি যারা জানেন, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সংস্কৃতিকে আধুনিক, সমবেত ফুটবলে, যেখানে সবাই প্রেস করবে, সবাই রক্ষণে নামবে, রূপান্তর করা কতটা কঠিন।

একজন কোচ সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে থাকেন দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে। কিন্তু মাদ্রিদ শুরু থেকেই আলোনসোর কর্তৃত্বে আঘাত করেছে। তিনি চেয়েছিলেন ক্লাব বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নিতে, তার আগে নয়। দীর্ঘ মৌসুম শেষে হওয়া সেই টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের মাথায় ছিল ছুটি, আর কেউ কেউ জানত পরের মৌসুমে তারা দলে থাকবে না। এই বাস্তবতা নিয়ে আলোচনার সুযোগও তাকে দেওয়া হয়নি।

নতুন সাইনিংগুলোও খুব একটা সহায়ক হয়নি। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোকে মিডিয়ার একাংশ 'অ্যান্টি–লামিনে ইয়ামাল' হিসেবে তুলে ধরলেও মাঠে তার কোনো বাস্তব প্রভাব দেখা যায়নি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সংকটই যেন শেষের শুরু। ফর্ম হারানো, নতুন কোচকে দায়ী করা, এল ক্লাসিকোতে বদলি হওয়ার পর প্রকাশ্য প্রতিবাদ, এরপর সবার কাছে ক্ষমা চাইলেও কোচের কাছে নয়, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। এমনকি আলোনসোর ভবিষ্যৎ কী হয়, তা দেখার জন্য ভিনিসিয়ুসের চুক্তি আলোচনা পর্যন্ত থামিয়ে রাখা হয়।

চোটে বিধ্বস্ত ছিল রক্ষণভাগ। মাঝমাঠে একজন খেলোয়াড় চেয়েছিলেন আলোনসো, মার্টিন জুবিমেন্দিকে। ক্লাব সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে।

দলকে একসূত্রে বাঁধার মতো শক্ত ব্যক্তিত্বেরও অভাব ছিল। এমনকি ফেদেরিকো ভালভার্দেও যেন দলগত স্বার্থের চেয়ে নিজের পজিশন নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন। এদিকে এমবাপে ছুটছিলেন রেকর্ডের পেছনে, নিজের সর্বশেষ চোট থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠার প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। লক্ষ্য ছিল ক্যালেন্ডার বছরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ৫৯ গোলের রেকর্ডে পৌঁছানো।

এই সবকিছুর মাঝেই আলোনসো খেলোয়াড়দের বোঝাতে ব্যর্থ হন যে তার পথটাই সঠিক। আর তা না পারলে লেভারকুজেনে যেভাবে হাই প্রেস, গতি আর পজিশনাল ফুটবল চাপিয়ে দিয়েছিলেন, মাদ্রিদে তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভবই ছিল।

তাহলে এখন কী?

আলোনসোকে ঠিক করতে হবে, এখন কি তার বিশ্রামের সময়। যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তারা মনে করেন, এই বিদায় অনিচ্ছাকৃত হলেও এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। কারণ, এটি আর কাজ করছিল না।

তবে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর বার্তা পরিষ্কার, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী মৌসুমেই অনেক ক্লাব তাকে পেতে আগ্রহী। রিয়াল মাদ্রিদ আবারও নিজেকে ব্যতিক্রম হিসেবে তুলে ধরছে, একটি ক্লাব, যারা আলাদা নিয়মে চলে, কোচের ক্ষমতা সীমিত রাখে, এমনকি বিদায়ের মাটি তৈরি করে দেয় অনেক আগেই, বিশ্বস্ত মিডিয়ার নীরব সহায়তায়।

এখন দায়িত্ব পাচ্ছেন কাস্তিয়ার কোচ আলভারো আরবেলোয়া, ক্লাবেরই মানুষ। কিন্তু জাবি আলোনসোর মতো এক কিংবদন্তিও যদি এই সংস্কৃতি বদলাতে না পারেন, তাহলে আরবেলোয়ার সামনে অপেক্ষা করছে প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ।

এই মৌসুম যদি ট্রফিহীন শেষ হয়, ইউরোপের অভিজাতদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে। আর যদি ফুটবলের চিরচেনা বৈপরীত্যে রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেই ফেলে, তবুও আমরা আবার সেই একই সিদ্ধান্তেই পৌঁছাব।

কিছু কোচ কিছু ক্লাবের সঙ্গে মানিয়ে যায়। আর কিছু ক্লাব, কখনোই পরিচালিত হতে চায় না।