৪৬ দিন বাকি

কনফেত্তির বৃষ্টি, কেম্পেস ও এক বন্দী দেশের স্বপ্ন

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

ভয়ের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। বারুদের ধোঁয়া, জমাট রক্ত আর রাতের বেলা হঠাৎ বুটের মচমচ শব্দ মিলিয়ে সেই গন্ধটা যেন একটা গোটা দেশের শ্বাসরোধ করে রেখেছিল। মানুষের ছায়াগুলোও যেন তখন ফিসফিস করে কথা বলত, ভয় পেত নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে। গুম হয়ে যাওয়া স্বজনদের শূন্য বিছানার পাশে বসে থাকা মায়েদের চোখের জল যখন শুকিয়ে পাথর, ঠিক সেই চরম হতাশার কৃষ্ণগহ্বর থেকে আচমকাই জন্ম নিল একটা জাদুকরী মুহূর্ত। আকাশের বুক চিরে নেমে এল এক অদ্ভুত শুভ্র ধারা, যা সাময়িকভাবে হলেও ধুয়ে দিল রাজপথের সব ক্লান্তি, সব আতঙ্ক।

১৯৭৮ সালের ২৫ জুন।

বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল তখন আক্ষরিক অর্থেই এক বারুদের স্তূপ। ভিআইপি বক্সে বসে চশমার আড়ালে স্থির দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন সামরিক জান্তার প্রধান হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা। তার শীতল চোখের ইশারায় তখন বাইরে চলছে লাশের মিছিল। স্টেডিয়ামের উন্মাতাল গর্জনের মাত্র কয়েকশো মিটার দূরেই কুখ্যাত 'এসমা' বন্দিশিবির। সেখানে তখন ইলেক্ট্রিক শকের যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে বন্দিরা, আর বাইরে লাখো মানুষের উল্লাস। এমন এক পরাবাস্তব, গায়ে কাঁটা দেওয়া বৈপরীত্যের মঞ্চে সেদিনের চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা আর নেদারল্যান্ডস।

ডাচরা লড়াই করছিল নিখুঁত ছন্দে। তাদের পাসিং, তাদের কৌশল, সবকিছু যেন একটি সুপরিকল্পিত সিম্ফনি। আর আর্জেন্টিনা? তারা খেলছিল হৃদয় দিয়ে, যেন প্রতিটি স্পর্শে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চায়।

খেলার গতি যত বাড়ছিল, ততই সময় যেন ভারী হয়ে উঠছিল। মিনিটগুলো কেবল সংখ্যা ছিল না, সেগুলো যেন জমে থাকা উত্তেজনার স্তর। প্রথম গোলটি করে আর্জেন্টিনা, আর সেই গোল যেন স্টেডিয়ামের বুকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ফুটবল কখনো একরৈখিক গল্প নয়। নেদারল্যান্ডস ফিরে এলো, ম্যাচ সমতায় বাঁধল। আর সেই মুহূর্তে মনে হলো, উৎসবের ওপর যেন আবার নেমে এলো অদৃশ্য ছায়া।

খেলা গড়াল অতিরিক্ত সময়ে।

দমবন্ধ করা এক উত্তেজনা, শিরায় শিরায় বইছে উত্তাপ। অতিরিক্ত সময়ের খেলা গড়ালে যেন ক্লান্তির চেয়েও স্নায়ুর চাপ বড় হয়ে ওঠে। ঠিক এমন সময়েই ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হলেন লম্বা চুলের এক ম্যাটাডোর -মারিও আলবার্তো কেম্পেস। যিনি নির্ধারিত সময়ের প্রথমার্ধেও একবার এগিয়ে দিয়েছিলেন আলবেসিলেস্তেদের। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন বুয়েনস আইরেসের বিষণ্ণ মানুষের একমাত্র জাদুকর।

১০৫ মিনিটের মাথায় ঘটে সেই মহাকাব্যিক মুহূর্ত। বক্সের ভেতর বল পেলেন কেম্পেস। চারপাশে চাপ, সামনে প্রতিরোধ, তবু তিনি দৌড় শুরু করলেন। তার সেই দৌড় ছিল না কোনো নিয়ন্ত্রিত কৌশল; বরং ছিল মুক্তির দিকে ছুটে যাওয়া এক বুনো স্রোত। ডিফেন্ডাররা এগিয়ে এলো, তাকে থামাতে চাইল। কিন্তু তিনি যেন তাদের ভেতর দিয়ে সরে যাচ্ছিলেন, ঠিক যেমন আলো অন্ধকারকে ভেদ করে যায়।

প্রথম শটটি প্রতিহত হলো, বল ছিটকে গেল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো সব শেষ।

কিন্তু না।

বলটি আবার ফিরে এলো তার কাছে। যেন ভাগ্য তাকে বলছে, 'এবার।'

সেই ক্ষণে সময় থেমে গেল। কনফেত্তি তখনই পড়তে শুরু করেছে, সাদা কাগজের টুকরো বাতাসে ভাসছে, যেন অদৃশ্য কোনো আকাশ ভেঙে পড়ছে নিচে। কেম্পেস আবার আঘাত করলেন।

গোল।

এই এক শব্দে যেন বিস্ফোরিত হলো সবকিছু।

বলটা জালের সাদা সুতো স্পর্শ করতেই যেন আকাশ ভেঙে পড়ল বুয়েনস আইরেসে। তুষারপাতের মতো গ্যালারি থেকে ঝরতে শুরু করল লক্ষ লক্ষ সাদা কনফেত্তি। কাগজের সেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে মুহূর্তের মধ্যে ঢেকে গেল মাঠের সবুজ আর জান্তার অদৃশ্য লাল রক্ত।

কেউ চিৎকার করছে, কেউ কাঁদছে, কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কনফেত্তি ঝরছে, কিন্তু সেগুলো আর কেবল উৎসবের প্রতীক নয়, সেগুলো যেন এক একটি মুক্তির কাগজ, এক একটি ছেঁড়া শিকল।

দু'হাত পাখির ডানার মতো প্রসারিত করে, মুখভর্তি বুনো উল্লাস নিয়ে ছুটছেন কেম্পেস। তার দৌড় যেন একটি দেশের দৌড়। তার সেই উড়ন্ত চুল, ঘর্মাক্ত পেশি আর কনফেত্তি বৃষ্টির মাঝ দিয়ে ছুটে চলা যেন মাইকেলেঞ্জেলোর খোদাই করা কোনো জীবন্ত ভাস্কর্য, যা শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওই উদযাপন ছিল বুটের তলায় পিষ্ট হতে থাকা একটা জাতির মুক্তির দীর্ঘশ্বাস।

স্বৈরশাসক ভিদেলা এই বিশ্বকাপকে সাজিয়েছিলেন নিজের ত্রাসের রাজত্বকে বৈধতা দেওয়ার এক নিখুঁত উৎসব হিসেবে। তিনি ভেবেছিলেন, এই জয় তার রক্তমাখা হাতকে আড়াল করবে। কিন্তু কেম্পেসের ওই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি জাদুকরী শক্তিতে স্বৈরশাসকের হাত থেকে আনন্দটুকু ছিনিয়ে নিয়ে তুলে দিয়েছিল সাধারণ মানুষের হাতে।

কনফেত্তির ওই মায়াবী বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে সেদিন রাজপথে, গ্যালারিতে আর প্রতিটি বাড়ির উঠোনে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল আপামর আর্জেন্টাইন। সেই কান্নায় মিশে ছিল নিখোঁজ সন্তানের জন্য শোক, আর একবুক মুক্ত বাতাস প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার এক মহাজাগতিক স্বস্তি। কেম্পেসের সেই গোল কেবল জালের ঠিকানায় পৌঁছায়নি, তা আছড়ে পড়েছিল সামরিক শাসনের লৌহকপাটে।