জার্মানি বনাম জার্মানি: যখন পরাক্রমশালী পশ্চিমকে চমকে দিয়েছিল পূর্ব
কখনো কি ভেবেছেন বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে ব্রাজিল খেলছে ব্রাজিলের বিপক্ষে? কিংবা ফ্রান্সের মুখোমুখি ফ্রান্স? অথবা আর্জেন্টিনা বনাম আর্জেন্টিনা? চিন্তাটা অদ্ভুত ও অবাস্তব মনে হলেও, ফুটবলের ইতিহাসে এমন একটি অভাবনীয় ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল। দিনটি ছিল ২২ জুন, ১৯৭৪। জার্মানির হামবুর্গের ভল্কসপার্কস্তাদিওন সাক্ষী হয়েছিল এমন এক ম্যাচের, যার পরতে পরতে মেশানো ছিল রোমাঞ্চ, রাজনীতি আর স্নায়ুর চূড়ান্ত পরীক্ষা।
বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের সেই ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল একই ভূখণ্ডের দুই বিচ্ছিন্ন অংশ— পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভাগ হয়ে যাওয়া দুই জার্মানির ফুটবল মাঠে এটাই ছিল প্রথম ও একমাত্র লড়াই। ৬০ হাজার ২০০ দর্শকের সামনে সেই রাতে যে রূপকথার জন্ম হয়েছিল, তা আজও ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অঘটন হিসেবে বিবেচিত। প্রতাপশালী পশ্চিম জার্মানিকে ১-০ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে জিতেছিল আন্ডারডগ পূর্ব জার্মানি। ৭৭তম মিনিটে ইয়ুর্গেন স্পারওয়াসারের করা সেই জাদুকরী গোলটি নিছক কোনো গোল ছাপিয়ে পরিণত হয়েছিল ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে কমিউনিজমের ক্ষণস্থায়ী জয়ে।
মজার ব্যাপার হলো, এই ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর আগেই দুই দল দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলেছিল। তাই টুর্নামেন্টে টিকে থাকার কোনো চাপ ছিল না। কিন্তু তারপরও এই ম্যাচের তাৎপর্য ছিল আকাশছোঁয়া। এক নম্বর গ্রুপের শীর্ষস্থান দখলের পাশাপাশি এই ম্যাচটি ছিল দুই জার্মানির অহং আর আদর্শিক লড়াইয়ে জেতার এক অলিখিত যুদ্ধ। চিলি ও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আসা পশ্চিম জার্মানির জন্য ড্রই যথেষ্ট ছিল গ্রুপ সেরা হওয়ার জন্য, অন্যদিকে জর্জ বুশনারের পূর্ব জার্মানির সামনে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না।
ম্যাচটির নেপথ্যে কাজ করছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা ও স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একপাশে ধনতান্ত্রিক পশ্চিম জার্মানি, অন্যপাশে সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানি। রাজনৈতিক বিভেদ এতটাই চরমে ছিল যে, পশ্চিম জার্মানি তখনো পূর্ব জার্মানিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি। পশ্চিমের বিখ্যাত ট্যাবলয়েড পত্রিকা 'বিল্ড' তাদের প্রতিবেদনে পূর্ব জার্মানির নাম লিখতো উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে পশ্চিম জার্মানির জন্য সময়টা মোটেও স্বস্তির ছিল না। মাত্র দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত মিউনিখ অলিম্পিকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী 'ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর' কর্তৃক ইসরায়েলি অ্যাথলেট ও কোচদের হত্যা করা হয়। তাছাড়া, চিলির কনস্যুলেটে বোমা হামলা, আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) হুঙ্কার এবং কুখ্যাত বাডার-মেইনহফ গ্যাংয়ের ভল্কসপার্কস্তাদিওন উড়িয়ে দেওয়ার হুমকির চিঠিতে পুরো টুর্নামেন্ট ঘিরে ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। হামবুর্গের উত্তরে মালেন্টেতে পশ্চিম জার্মানি দলের ক্যাম্পকে ডিফেন্ডার পল ব্রাইটনার আখ্যা দিয়েছিলেন একটি 'দুর্গ' হিসেবে। কাঁটাতারের বেড়া, পাহারাদার কুকুর আর সশস্ত্র প্রহরীর ঘেরাটোপে মাঠের বাইরে যুদ্ধংদেহী মেজাজ থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে ছিল খেলোয়াড়সুলভ প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
ম্যাচের আগের দিনগুলোর পরিবেশ ছিল দুই শিবিরের জন্যই নাটকীয়। পূর্ব জার্মানি দল যখন ছাই রঙের জ্যাকেট, সবুজ শার্ট আর হলুদ টাই পরে হামবুর্গ বিমানবন্দরে নামে, তাদের মুখে ছিল চওড়া হাসি। কিন্তু সেই হাসিতে কিছুটা ছেদ পড়ে যখন তাদেরকে নিতে করতে আসা বাসটি রহস্যজনকভাবে 'নিখোঁজ' হয়ে যায়। পশ্চিমের মাটিতে এমন একটি ঘটনা খুব একটা বিস্ময়কর ছিল না।
কুইকবর্নে নিজেদের ক্যাম্পে পূর্ব জার্মানির দলের সাথে সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো লেগে ছিল দেশটির কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্যাসির এজেন্টরা। তবে পশ্চিমের জৌলুস দেখে তারাও কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছিলেন। এই সুযোগে স্পোর্টহোটেলের মালিকদের আয়োজনে রেপারবানে এক রাতের বিনোদনেরও ব্যবস্থা করা হয়। পশ্চিম জার্মানির আয়োজকরা পূর্বের দলের সবাইকে একটি করে টেলিভিশন উপহার দিতে চেয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে অফিশিয়ালরা সেই প্রস্তাব প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ পশ্চিমের সাথে যেকোনো ধরনের সখ্যতা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কুইকবর্ন ছাড়ার সময় খেলোয়াড়রা খেয়াল করেন, সবগুলো টেলিভিশন গায়েব! অর্থাৎ, যে অফিসিয়ালরা পশ্চিম থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন, সম্ভবত তারাই গোপনে টেলিভিশনগুলো নিজেদের করে নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, আসরের ফেভারিট ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানির অন্দরমহলে চলছিল চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। দলের কোচ হেলমুট শুন ছিলেন প্রবল মানসিক চাপে। তার জন্ম হয়েছিল পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেনে, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তিনি পশ্চিমে পালিয়ে আসেন। তার জন্য এই ম্যাচটি ছিল সম্মানের, যেকোনো মূল্যে জেতার এক যুদ্ধ। কিন্তু তার দল তখন ব্যস্ত বোনাসের দাবিতে বিদ্রোহ করতে। বিশ্বকাপের বোনাস হিসেবে অধিনায়ক ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার দাবি করে বসেন জনপ্রতি ১ লাখ ডিএম (ডয়েচ মার্ক)। পশ্চিম জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (ডিএফবি) সহ-সভাপতির সাথে দীর্ঘ দরকষাকষির পর ৭০ হাজার ডিএমে রফা হলেও কোচ শুন ক্ষোভে ফেটে পড়েন, 'তোমাদের মুখে সারাদিন শুধু টাকা, টাকা আর টাকা!'
২২ জুনের রাত। গ্যালারিতে ৬০ হাজার ২০০ দর্শক, যার মধ্যে ছিলেন বেছে বেছে আনা পূর্ব জার্মানির মাত্র দেড় হাজার কট্টর সমর্থক। হাতুড়ি আর কম্পাস আঁকা ছোট্ট পতাকা নাড়ছিলেন তারা। উরুগুইয়ান রেফারি রামন বারেতোর বাঁশিতে শুরু হয় ইতিহাসের সেই মহারণ।
শুরু থেকেই ম্যাচটি ছিল চূড়ান্ত কৌশলগত ও স্নায়ুক্ষয়ী। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে নারাজ। পশ্চিম জার্মানি ফেভারিটের মতো আক্রমণ শানাতে থাকলেও রক্ষণ নিরেট রেখে পূর্ব জার্মানিও সুযোগ তৈরি করতে থাকে। প্রথমার্ধে গার্ড কিসে আর হান্স-ইয়ুর্গেন ক্রাইশে সহজ সুযোগ হাতছাড়া না করলে পূর্ব জার্মানি আগেই এগিয়ে যেতে পারত। অন্যদিকে, পশ্চিম জার্মানির সেরা সুযোগটি আসে ৪০তম মিনিটে। ডি-বক্সে বল পেয়ে ট্রেডমার্ক স্টাইলে ঘুরে শট নেন 'ডার বোম্বার' খ্যাত গার্ড মুলার, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বলটি পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
ম্যাচ গোলশূন্য অবস্থায় এগোচ্ছিল। সব মিলিয়ে ৪৮১ মিনিট ধরে পশ্চিম জার্মানির জালে কেউ বল জড়াতে পারেনি। ঘড়ির কাঁটা ৭৮ মিনিট ছুঁইছুঁই। সবাই ধারণা করছিল, 'দুই ভাই' হয়তো পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়বে। ঠিক তখনই ঘটে সেই মহাকাব্যিক মুহূর্ত।
পশ্চিম জার্মানির একটি কর্নার কিকের পর ডি-বক্সে উড়ে আসা একটি হেড দারুণ দক্ষতায় লুফে নেন পূর্ব জার্মানির গোলরক্ষক ইয়ুর্গেন ক্রয়। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন ডানপ্রান্তে থাকা বদলি খেলোয়াড় এরিক হামানের দিকে। বদলি হিসেবে মাঠে নামার পর মাত্র ১০ মিনিটের মতো তখন পার হয়েছে তার। নিজের সতেজ পায়ের পুরো সুবিধা নিয়ে তিনি বল নিয়ে দ্রুত গতিতে প্রায় ৩০ গজ ছুটে যান। তাকে আটকাতে পারেননি ধীরগতির পরিচয় দেওয়া বেকেনবাউয়ার।
সেই সুযোগে হামান সময় নিয়ে ডি-বক্সের ঠিক বাইরে এক অসাধারণ ডায়াগোনাল পাস বাড়ান। তীব্র বেগে ছুটে আসা মিডফিল্ডার স্পারওয়াসার দুর্দান্ত দক্ষতায় মাথা দিয়ে বল নামিয়ে নিয়ে বুক আর কাঁধের আলতো ছোঁয়ায় বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন। এতে বোকা বনে যান পশ্চিম জার্মানির দুই দুর্ধর্ষ ডিফেন্ডার বার্টি ফোগটস ও হোর্স্ট-ডিটার হোয়েটগেস। আক্ষরিক অর্থেই তাদের মাটিতে বসিয়ে দিয়ে স্পারওয়াসার ঢুকে পড়েন বক্সে। এরপর গোলরক্ষক সেপ মেইয়ারকে কোনো সুযোগ না দিয়ে মাত্র পাঁচ গজ দূর থেকে বল জড়িয়ে দেন জালে!
স্তব্ধ হয়ে যায় ভল্কসপার্কস্তাদিওন। স্পারওয়াসার আনন্দে ডিগবাজি খেয়ে শুয়ে পড়েন মাঠে, সতীর্থরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিস্তব্ধ রাতে কেবল শোনা যাচ্ছিল পূর্ব জার্মানির সেই দেড় হাজার সমর্থকের উল্লাস, 'হেয়া, হেয়া ডিডিআর!'
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের দৃশ্যপট ছিল অন্যরকম। কড়া রাজনৈতিক নির্দেশনার কারণে মাঠে জার্সি বদল করা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু খেলোয়াড়দের কাছে ফুটবলের ভাষা ছিল অভিন্ন। টানেলের অন্ধকারে ব্রাইটনার এগিয়ে যান ম্যাচজয়ী স্পারওয়াসারের দিকে। নীরবে জার্সি বদল করেন দুজন। সেই জার্সিগুলো ২৮ বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর ২০০২ সালের আগস্টে জার্মানিতে হওয়া ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্তদের সাহায্যার্থে নিলামে তোলা হয়।
পূর্ব জার্মানির ডিফেন্ডার কিসে পরে বলেছিলেন, 'পশ্চিমের গ্ল্যামারাস পেশাদারদের বিপক্ষে পূর্বের আনাড়িদের লড়াই— এভাবেই ম্যাচটিকে দেখা হচ্ছিল। আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম সবাই ভুল।' আর পশ্চিম জার্মানির ড্রেসিংরুমের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। মুলারের মতে, 'আমাদের ক্যাম্পে যেন নরক ভেঙে পড়েছিল। কোচ শুনের মেজাজ ভীষণ চড়া ছিল। আর আমরা ভোর পর্যন্ত জেগে ছিলাম এটা বের করার জন্য যে, কীভাবে আমরা হারলাম।'
১-০ গোলের এই ঐতিহাসিক জয়টি ছিল পূর্ব জার্মানির ফুটবল ইতিহাসের শেষ বড় চমক এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের শেষ জয়। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে এবং আর্জেন্টিনার সাথে ড্র করে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় তারা। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আর কখনোই দেখা যায়নি পূর্ব জার্মানিকে।
অন্যদিকে, এই অপ্রত্যাশিত হার পশ্চিম জার্মানির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। কিংবদন্তি বেকেনবাউয়ার পরে স্বীকার করেছিলেন, 'স্পারওয়াসারের গোলটি ছিল আমাদের জন্য এক ঘুমভাঙানিয়া ডাক। ওই গোলটি না হলে আমরা কখনোই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারতাম না।' সত্যিই তাই, ওই ধাক্কার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪ সালের আসরের শিরোপা জেতে— দ্বিতীয়বারের মতো তারা হয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি একত্রিত হয়ে গেলেও ইতিহাসের পাতায় ১৯৭৪ সালের ২২ জুনের রাতটি স্পারওয়াসারের নামেই লেখা থাকবে চিরকাল। তার অমর উক্তিটিই যেন এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় সারসংক্ষেপ, 'যদি কোনো একদিন আমার সমাধি ফলকে শুধু "হামবুর্গ ৭৪" লেখা থাকে, তবুও সবাই জানবে নিচে কে শুয়ে আছে।'