মানুষ কেন পায়ের আঙুল একটার পর একটা নাড়াতে পারে না

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন, আমরা হাতের আঙুলগুলো একটার পর একটা নাড়াতে পারি, কিন্তু পায়ের আঙুলগুলো পারি না? আবার অনেক প্রাণী যেমন শিম্পাঞ্জি বা অন্যান্য বানর হাত ও পা সমানভাবে ব্যবহার করতে পারে। যেমন, তারা গাছে ঝুলে থাকা অবস্থায় পায়ের আঙুল দিয়ে ডাল ধরতে পারে।

কিন্তু, প্রশ্ন হলো—মানুষ কেন পারে না?

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী স্টিভেন লটজেনহাইজার বলেন, মানুষের চলাচলের বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন বল শারীরিক গঠনে প্রভাব ফেলেছে এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের গঠনগত পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের পায়ের আঙুল ইচ্ছেমতো বা একটার পর একটা নাড়াতে না পারার কারণ—পেশি, মস্তিষ্ক ও পায়ের বিবর্তন।

লাইভ সায়েন্সের এক প্রতিবেদনে অনুসারে, মানুষ প্রাইমেট শ্রেণির প্রাণী। এর মানে আমরা সেই দলে পড়ি, যে দলে শিম্পাঞ্জির মতো বানরজাতীয় প্রাণীও আছে। আসলে জিনগত দিক দিয়ে শিম্পাঞ্জি আমাদের সবচেয়ে কাছের। মানুষের ডিএনএর প্রায় ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ তাদের সঙ্গে মিল আছে।

স্টিভেন লটজেনহাইজার জানান, আমাদের খুব প্রাচীন পূর্বপুরুষরা সম্ভবত শিম্পাঞ্জিদের মতোই চলাফেরা করত। তারা হাত ও পা দুটোই ব্যবহার করত। কিন্তু বিবর্তনের কারণে মানুষ দুই পায়ে হাঁটা শুরু করে।

তিনি বলেন, সোজা হয়ে হাঁটার সময় ভারসাম্য রক্ষা করা এবং শরীরের ওজন বহন করার জন্য মানুষের পায়ের গঠন পরিবর্তিত হতে শুরু করে। ওই সময়ে পায়ের আঙুলগুলো আলাদাভাবে নাড়াতে পারার চেয়ে ভারসাম্য ধরে রাখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিবর্তের শুরু থেকে মানুষের হাত ধীরে ধীরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার জন্য। সময়ের সঙ্গে আমাদের হাতের আঙুলগুলোর আলাদাভাবে নড়ার ক্ষমতা বেড়েছে। তাই বর্তমানে মানুষ হাত ব্যবহার করে অনেক কাজ করতে পারে। যেমন ছবি আঁকা, মোবাইলে বা ল্যাপটপে টাইপ করা কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানো।

আরও স্পষ্ট করে বললে, এই লেখাটি টাইপ করতে পারছি কারণ আমার আঙুলগুলো ছোট, সূক্ষ্ম এবং নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া করতে পারে।

জীববিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের হাত ও পা ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য বিবর্তিত হয়েছে। বিবর্তনের ফলে আমাদের পেশি, হাড় ও টেন্ডন এমনভাবে বদলেছে যেন হাঁটা ও ভারসাম্য রক্ষা সহজ হয়।

অবশ্য হাত ও পায়ের গঠন অনেকটা একই রকম। দুটিতেই পাঁচটি করে আঙুল আছে। আর এই আঙুলগুলো পেশি ও টেন্ডনের সাহায্যে নড়ে।

মানুষের পায়ে ২৯টি পেশি আছে, যেগুলো একসঙ্গে কাজ করে হাঁটতে ও দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। বিপরীতে একটি হাতে ৩৪টি পেশি আছে।

পায়ের পেশি আমাদের আঙুল নিচে টানতে সাহায্য করে, যেমন আমরা আঙুলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াই। আবার আঙুল উপরে তুলতেও সাহায্য করে, যেমন আমরা পা ফেলে হাঁটি এবং সামনের দিকে যাই।

এই পেশিগুলো পা-কে সামান্য ভেতরের দিকে বা বাইরের দিকে ঘোরাতেও সাহায্য করে। তাই আমরা অসমতল জায়গাতেও ভারসাম্য ধরে রাখতে পারি।

মানুষের জন্য পায়ের বুড়ো আঙুলটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটার সময় এটি শরীরকে সামনে ঠেলে দেয়। এজন্য আবার আলাদা কিছু পেশি আছে।

কিন্তু বাকি চারটি আঙুলের জন্য আলাদা আলাদা পেশি নেই। পায়ের তলায় এবং পায়ের পেছনের অংশে থাকা কয়েকটি প্রধান পেশি একসঙ্গে এই চারটি আঙুল নড়তে সহায়তা করে।

এই আঙুলগুলো একই পেশি ভাগ করে ব্যবহার করে, তাই তারা নড়তে পারে। কিন্তু হাতের আঙুলের মতো ইচ্ছেমতো নড়তে পারে না।

লাইভ সায়েন্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পায়ের পেশির সঙ্গে যুক্ত লম্বা টেন্ডনগুলো পায়ের ভেতরে পর্যন্ত পৌঁছেছে। এগুলো সবসময় নড়াচড়া করার চেয়ে বরং মানুষকে স্থির রাখা ও হাঁটতে সাহায্য করার জন্য বেশি উপযোগী।

অন্যদিকে হাতের প্রতিটি আঙুল নড়তে ছয়টি প্রধান পেশি গ্রুপ কাজ করে। এই পেশিগুলোর বেশিরভাগই বাহুর ভেতরে থাকে এবং টেন্ডনের মাধ্যমে আঙুলের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

পাশাপাশি বুড়ো আঙুল ও কনিষ্ঠ আঙুলের জন্য অতিরিক্ত পেশি আছে, যা আমাদের কোনো কিছু ধরতে ও শক্তভাবে আঁকড়ে রাখতে সাহায্য করে। এই সব পেশি সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। যেমন আমরা যখন লিখি তখন হাতের আঙুল ইচ্ছেমতো নড়াচড়া ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

এটা সত্যি যে, হাতের আঙুল নড়ানোর জন্য বেশি পেশি আছে। তবে পায়ের আঙুলগুলো একে একে নাড়াতে না পারার জন্য এটিই একমাত্র কারণ নয়।

স্টিভেন লটজেনহাইজার বলেন, আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে এই প্রশ্নের উত্তরের একটি অংশ লুকিয়ে আছে।

সাধারণত মানুষের মস্তিষ্কে মোটর কর্টেক্স নামে একটি অংশ আছে। এই অংশটি শরীর কীভাবে নড়বে তার নির্দেশ দেয়। এটি নিউরন কোষ দিয়ে তৈরি এবং ছোট বার্তাবাহকের মতো কাজ করে। মস্তিষ্কের এই অংশটি শরীরের বিভিন্ন অংশে সংকেত পাঠায়।

এই মোটর কর্টেক্স হাতের আঙুল নিয়ন্ত্রণের জন্য পায়ের আঙুলের চেয়ে অনেক বেশি নিউরন ব্যবহার করে। তাই এটি পায়ের আঙুলের চেয়ে হাতের আঙুলকে বিস্তারিত নির্দেশনা দিতে পারে।

মানুষের পায়ের আঙুল একে একে নাড়াতে না পারার প্রধান কারণ হলো—বিবর্তন, পেশির গঠন এবং মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। মানুষের পায়ের আঙুলগুলো দুই পায়ে সোজা হয়ে চলতে, ভারসাম্য ধরে রাখতে এবং হাঁটার জন্য অভিযোজিত হয়েছে।

অপরদিকে, হাতের আঙুল ইচ্ছেমতো নড়ার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। তাই আমরা হাত দিয়ে সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত কাজ করতে পারি।