জ্বালানি সংকটে ই-বাইকের চাহিদা বেড়েছে

জাগরণ চাকমা
জাগরণ চাকমা

রাজধানীর সড়কে হরহামেশা যানজট লেগেই থাকে। এর সঙ্গে আছে পার্কিংয়ের ঝামেলা। মানে ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক ও পার্কিংয়ের ঝামেলা মাথায় রেখে গাড়ি নিয়ে বের হতে হয়। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট। এ বছরের মার্চে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। যার সরাসরি ধাক্কা লেগেছে জ্বালানিতে। এতে গাড়ির মালিকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে এবং বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ ইমরুল কায়েস জানান, তিনি সম্প্রতি রানার মোটরস লিমিটেড থেকে একটি ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল (ই-বাইক) কিনেছেন। তবে এটি গাড়ি বা মোটরসাইকেলের বিকল্প হিসেবে নেননি।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিনের জ্বালানি কেনার ঝামেলা থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। এখন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কখন জ্বালানি পাওয়া যাবে, আদৌ পাওয়া যাবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া।’

ফাইল ছবি। সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তার ভাষ্য, ‘ই-বাইক কিনে আমি স্বস্তিতে আছি। আবার খুব সহজে সমস্যারও সমাধান হয়েছে। ই-বাইক একদম ঝামেলামুক্ত।’
ইমরুল কায়েসের এই সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যাচ্ছে, জ্বালানি সংকটে ঢাকার নগরজীবনে যাতায়াত ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে এক ধরনের পরিবর্তন আসছে।

শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ই-বাইকের মাসিক বিক্রি হঠাৎ বেড়েছে। আগে যেখানে মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার ই-বাইক বিক্রি হতো, মার্চে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১০০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে মাসিক বিক্রি ৩ হাজারে পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশে দ্রুত বড় হওয়া বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) বাজারে ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড প্রবেশ করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে রানার মোটরস লিমিটেড, ওয়ালটন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

রানার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম জ্বালানি হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝোঁকার প্রতি গুরুত্ব দেন।

বর্তমানে রানার ১২টি ‘ইয়াদিয়া’ ব্র্যান্ডের ই-বাইক বাজারজাত করছে। যেগুলোর দাম ফিচার অনুযায়ী ৯০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকার মধ্যে।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘স্পষ্টভাবেই ই-বাইক একটি ভালো ও সুবিধাজনক সমাধান।’

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তিনি আরও বলেন, যেসব পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তারা খুব কম খরচে দীর্ঘদিন ইলেকট্রিক যানবাহন (ইভি) চালাতে পারে। এর বিপরীতে জ্বালানিচালিত যানবাহন সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ই-বাইক সাধারণ গাড়ির মতো জটিল না। এতে মূলত শুধু একটি মোটর ও একটি ব্যাটারি থাকে। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের খরচও অনেক কম।

‘অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ প্রায় নেই বললেই চলে,’ বলেন তিনি।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে দুই চাকার যানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাশ্রয়ী মূল্য, সহজ ব্যবহার এবং শহর ও গ্রাম উভয় জায়গায় চালানোর উপযোগী হওয়ায় ই-বাইক এই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি হতে পারে।

তবে এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ই-বাইকের ব্যবহার খুব ধীরে বাড়ছে। পুরো শিল্পখাতে বছরে মাত্র ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার ই-বাইক বিক্রি হয়। দেশের মোট মোটরবাইক বাজারে ই-বাইকের অংশ মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে ই-বাইকের চার্জিং ব্যবস্থা, ব্যাটারির স্থায়ীত্ব ও একবার চার্জ দিলে কত দূর যাওয়া যাবে—এসব নিয়ে এখনো অনেকের উদ্বেগ আছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

নজরুল ইসলাম এগুলোকে বড় কোনো সমস্যা মনে করেন না। তিনি বলেন, ই-বাইক চার্জ দেওয়া অনেকটা মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার মতোই সহজ। একবার ফুল চার্জ দিতে খরচ পড়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টাকা, আর এটি রাতে সহজেই করে রাখা যায়।

তিনি আরও বলেন, নতুন ধরনের ব্যাটারি প্রযুক্তি, বিশেষ করে সলিড-স্টেট ব্যাটারি, এসে গেলে ই-বাইকের ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়বে।

দেশের বড় ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন বর্তমানে ‘টাকিয়ন’ ব্র্যান্ডের সাতটি মডেলের ই-বাইক বাজারে বিক্রি করছে।

ওয়ালটন ডিগি-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা মো. তৌহিদুর রহমান রাদ বলেন, ‘মার্চে পাম্পগুলোতে জ্বালানির সংকট তীব্র হলে ই-বাইকের চাহিদা প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।’

তিনি জানান, এখনো জ্বালানিচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় ই-বাইকের বাজার ছোট, তবুও গত তিন বছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে এর চাহিদা নিয়মিত বাড়ছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তিনি আরও জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে ই-বাইকের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে, কারণ এটি বাস্তবসম্মত একটি বিকল্প। একবার পুরো চার্জে মডেলভেদে ৮০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলা যায়।

প্রাণ-আরএফএফ গ্রুপের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামাল বলেন, জ্বালানি সংকট শুরুর পর তাদের ‘রাইডো’ ই-বাইকের বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালার কথা উল্লেখ করে বলেন, যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক থাকায় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের খরচ বেড়ে যায়, আবার সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য কম দামে আমদানি হওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, এখানে চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। তাই ই-বাইকের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি সহায়তা জরুরি।