যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কমতে পারে রেমিট্যান্স, দুশ্চিন্তায় প্রবাসী পরিবারগুলো
গত পাঁচ দিনে ২২২টি ফ্লাইট বাতিল ও মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি রুটে বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মূলত ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা হামলার জেরে নিরাপত্তা রক্ষায় বেশ কিছু উপসাগরীয় দেশ তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দেয়। ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৭৬টি এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দাম্মাম, দোহা, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও কুয়েত।
প্রতিটি ফ্লাইটে ২৫০ জন যাত্রী যেতে পারলেও অন্তত ৫৫ হাজার যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক এখন কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আতঙ্কে প্রবাসীরা
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জনই গিয়েছেন সৌদি আরবে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান। যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
কুয়েতে কর্মরত এক বাংলাদেশি শ্রমিক বলেন, আমরা আতঙ্কে আছি। বেশিরভাগ কোম্পানি কাজ বন্ধ রেখেছে। যারা ছুটিতে বাংলাদেশে গিয়েছেন, আকাশপথ বন্ধ থাকায় তারা আর ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে তিনি দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন না বলে চিন্তিত। ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমার পরিবারের কী হবে, আল্লাহই জানে।’
অন্যান্য দেশের প্রবাসীরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন এবং বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এছাড়া কুয়েতে চারজন ও বাহরাইনে তিনজন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।
ঝুঁকিতে রেমিট্যান্স
রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি—এই দুটিই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। বিশ্বব্যাপী সংকটের মধ্যেও রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোকে সচল রাখতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা এক বছরে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ধীর হয়ে যেতে পারে বা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, তেলের দাম বৃদ্ধি ও বাণিজ্য পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের হাতে সঞ্চয় কম থাকবে ও তারা দেশে কম টাকা পাঠাতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা ব্যাংকিং বা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পারবেন ঠিকই, আসল সমস্যা হলো তাদের হাতে পাঠানোর মতো যথেষ্ট আয় থাকবে কি না।’
তিনি আরও জানান, ক্ষুদ্র দোকানপাট, দিনমজুরি বা অস্থায়ী চুক্তিতে যারা কাজ করেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। নিরাপত্তার কারণে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে তাদের আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে। আতঙ্ক রোধে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট যোগাযোগ ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই সংকট বাংলাদেশে আটকে পড়া বা বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার কর্মীকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, এই প্রভাব বহুমাত্রিক এবং অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
তিনি জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য একেকজন কর্মী ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তাদের অনেকের ভিসা শেষ হয়ে আসছে, অথচ তারা যেতে পারছেন না।
শরিফুল হাসান সতর্ক করেন যে, দ্রুত যেতে না পারলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। কারণ সংঘাত চলতে থাকলে বিদেশি নিয়োগকর্তারা তাদের পরিকল্পনা বদলে ফেলতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বাংলাদেশি অস্থায়ী বা অনানুষ্ঠানিক কাজ করেন। অস্থিরতার কারণে তারা নিয়মিত কাজ পাবেন না, ফলে আয় কমলে রেমিট্যান্সও কমবে। এর প্রভাব প্রথমে শ্রমিকের ওপর পড়ে, তারপর পরিবার, জেলা ও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরও এর আঁচ লাগবে।
বাংলাদেশের অন্তত ২০ থেকে ২৫টি জেলা পুরোপুরি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এসব এলাকায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের মুখে পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব এবং রিক্রুটিং এজেন্সিজ ঐক্য পরিষদের সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তিনি জানান, সংঘাত চলতে থাকলে বর্তমান কর্মীরা কাজ হারাতে পারেন এবং নতুন কর্মী যাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স কমবে। টিপু সুলতান পরামর্শ দেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের আকামা (কাজের অনুমতি) এবং ভিসার মেয়াদ বাড়াতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সরকারের আলোচনা করা উচিত।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার প্রবাসীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। বর্তমান সংকটে টিকিট বা ভিসা সংক্রান্ত যে কোনো জটিলতায় আমরা উদ্যোগ নেব।
তিনি আশ্বাস দেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।