শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির ১১টি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকায় প্রকাশ করেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার মধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানি আলোচিত ও সমালোচিত এস আলম গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত।

এই ২০ ঋণখেলাপির মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চট্টগ্রামভিত্তিক এই ব্যবসায়ী গ্রুপটির সঙ্গে জড়িত। তাদের ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল ১৯৮৫ সালে আলম এস আলম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আত্মীয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রুপটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হয়ে ওঠে।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তার করে এস আলম গ্রুপ। এই সময় ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই এই গ্রুপের হাতে ছিল। একইভাবে তারা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও প্রভাব বিস্তার করে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে এই তালিকা উপস্থাপন করেন, তবে তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের মোট ঋণ ছিল ১৪ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে, যার ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ইসলামী ব্যাংকের।

এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, আর মোট ঋণ ছিল ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। এই ঋণ নেওয়া হয়েছে ইসলামী, জনতা, এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে।

এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, আর মোট ঋণ ছিল ১১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এই ঋণ নেওয়া হয়েছে ইসলামী, জনতা ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে।

এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস জনতা, ইসলামী, এক্সিম এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা খেলাপি করেছে, যেখানে তাদের মোট ঋণ ছিল ৫ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা।

শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকায় থাকা এস আলম গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সোনালী ট্রেডার্সের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশনের ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানির ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা এবং ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজের ১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের মে পর্যন্ত হিসাব।

চেমন ইস্পাত, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ এবং কর্ণফুলী ফুডস প্রাইভেট লিমিটেডও এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি।

এস আলম গ্রুপের এই ১১টি প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ অন্তত ২২ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা, যা শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির ৬৫ শতাংশ।

শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এই গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

বেক্সিমকো গ্রুপ তাদের বেশিরভাগ ঋণ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে।

বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা অগ্রণী, জনতা, সোনালী, রূপালী, এবি, ন্যাশনাল, ইউসিবি এবং এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া।

চলতি বছরের মে পর্যন্ত এই কোম্পানির মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা।

বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্সের খেলাপি ঋণ অগ্রণী, রূপালী এবং সোনালী ব্যাংকে ৯৮২ কোটি টাকার মতো।

গত বছরের মে পর্যন্ত কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিক্সের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। কোম্পানিটি এই ঋণ নিয়েছে সোনালী, ন্যাশনাল, সাউথইস্ট, সোশ্যাল ইসলামী, স্ট্যান্ডার্ড, প্রিমিয়ার ব্যাংক, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল থেকে।

সিকদার গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট এবং পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্টের খেলাপি ঋণ যথাক্রমে ১ হাজার কোটি টাকা এবং ৬২৯ কোটি টাকা। তারা এই ঋণ নিয়েছে অগ্রণী, এবি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী, এক্সিম এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে।

রঙধনু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রঙধনু বিল্ডার্সের খেলাপির পরিমাণ ৯৬১ কোটি টাকার। কোম্পানিটি এই ঋণ নিয়েছে ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে।

মাইশা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সিএলসি পাওয়ার কোম্পানির ন্যাশনাল ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। এই কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হক।

প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকমের (সিটিসেল) খেলাপি ঋণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মোরশেদ খানের মালিকানাধীন।

সোশ্যাল ইসলামী ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আছে দেশবন্ধু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু সুগার মিলসের। কোম্পানিটির সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ ৫৪৪ কোটি টাকা।