ইরান যুদ্ধের আগেই পেট্রোলিয়ামের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫২ শতাংশ

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান
মো. মেহেদী হাসান
মো. মেহেদী হাসান

চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশের পেট্রোলিয়ামের আমদানি ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আমদানিতে এমন উল্লম্ফন ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট (পিওএল) আমদানিতে দেশ সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।

এ সময়ে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ১১৯ শতাংশ বেড়ে ৮৮৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, পিওএল বাবদ পরিশোধ বছরওয়ারি ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

পেট্রোলিয়াম আমদানির লাগামহীন ব্যয়ের এই তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন বাংলাদেশ তীব্র জ্বালানি সংকটের মোকাবিলা করছে। মূলত ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বিশ্বের প্রধান জ্বালানি করিডোরগুলোর একটি, যেখান দিয়ে এশিয়ায় সরবরাহকৃত বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

বাংলাদেশে বছরে ৭০ লাখ টন পেট্রোলিয়ামের চাহিদা রয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। এছাড়া দেশটিতে ব্যবহৃত গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও বিদেশ থেকে আনতে হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারই বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ সরবরাহ করে থাকে।

যেহেতু এই দেশগুলো তাদের জ্বালানি পণ্য হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই পরিবহন করে, তাই বর্তমান সংঘাত এবং তেল ও এলএনজির আকাশচুম্বী দাম অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালির বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশে এক বিশাল জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে।  এটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু হওয়া সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার বিপরীতে বাংলাদেশের চরম নাজুক অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।

সংস্থাটি আরও বলেছে যে, এই সংঘাত জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং বাণিজ্য—এই তিনটি খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত হানতে পারে, যার মধ্যে জ্বালানি খাতই সবচেয়ে আসন্ন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পেট্রোলিয়াম আমদানি ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন সম্ভবত আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং উচ্চমূল্যের কারণেই হয়েছে। যেহেতু সংঘাতটি ফেব্রুয়ারির একদম শেষ দিকে শুরু হয়েছিল, তাই ওই সময়ে এর প্রভাব ছিল বেশ সীমিত।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্চ মাসে ডিজেলের আমদানি-সমন্বিত খরচ লিটার প্রতি প্রায় ১৯৮ টাকায় পৌঁছেছে, যেখানে এর খুচরা বাজারমূল্য ছিল ১০০ টাকা।

অকটেনের ক্ষেত্রে আমদানি খরচ ছিল প্রতি লিটার ১৫০ দশমিক ৭২ টাকা, যেখানে খুচরা বিক্রয়মূল্য ছিল ১২০ টাকা। এর ফলে শুধুমাত্র মার্চ মাসেই ডিজেলে আনুমানিক ৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৭৭৯ কোটি টাকার ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, জ্বালানি তেলের বর্তমান দাম বজায় রাখতে জুন মাস নাগাদ সরকারকে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হতে পারে।

এ ছাড়া, ৩০ মার্চ পর্যন্ত করা হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন সময়ের জন্য এলএনজির অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় মেটাতে আরও ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।

পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সার আমদানির খরচও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার আমদানির বিল ৬০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে সামগ্রিক আমদানি ব্যয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বাড়িয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্চ মাসে আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘাটতি আরও বাড়তে পারে, যা চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং সামগ্রিক ব্যালেন্স অব পেমেন্টে (বিওপি) প্রভাব ফেলবে। বিওপি হলো বহির্বিশ্বের সাথে একটি দেশের সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের সারসংক্ষেপ।

নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মধ্যে উচ্চ পেট্রোলিয়াম আমদানি ব্যয়ের কারণে জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।

গত বছরের একই সময়ের ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এবার চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। পাশাপাশি, বিওপির তথ্য অনুযায়ী, আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) ৪ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার।

রহমান আরও বলেন, সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর এর প্রভাব এখনই হয়তো তীব্র হবে না, কারণ আমদানির একটি অংশ বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে মেটানো হচ্ছে, যা আর্থিক খাতকে সবল রাখছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং উচ্চ বৈদেশিক অর্থায়নের কারণে বাংলাদেশের বিওপি পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এই সুফল ধরে রাখতে হলে শেষ পর্যন্ত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। কারণ আর্থিক খাতের এই প্রবাহগুলো ভবিষ্যতে ঋণের দায় তৈরি করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আট মাসের এই সময়ে সামগ্রিক ব্যালেন্স ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্তে ফিরেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।