‘ভয় লাগতেছে, কখন আমাদের স্কুল ভেঙে নদীতে যায়’
‘মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে, ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে’, শিক্ষকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে কবিতা পড়ছিল শিশুরা। তাদের সবার চোখেমুখে ছিল নদী ভাঙনের আতঙ্ক।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের ১২২নং আলতাফ হোসেন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পদ্মা নদী এখন মাত্র ৫০ মিটার দূরে।
২০১৭ সালে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খান কান্দি গ্রামে ৩৩ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলা হয় বিদ্যালয়টি। সেসময় বিদ্যালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ছিল পদ্মা নদী। কিন্তু গত দুই বছর ধরে ভাঙনে বিদ্যালয়ের অনেক কাছে চলে এসেছে নদী।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙনের মুখে থাকা বিদ্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বিদ্যালয়ের সামনের মাঠের একটি অংশ ভেঙে ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে দ্রুত বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার জন্য টিনের বেড়া, দুটি শ্রেণিকক্ষের মাঝের পার্টিশন ও ফ্যান খুলে রাখা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দুটি শ্রেণিকক্ষের দুই পাশে বসে শিশুদের পড়াচ্ছেন দুই শিক্ষক।
তারা জানান, সবসময় দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়, কখন পদ্মার ভাঙনে স্কুলটি বিলীন হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তারা। পাঠদানের পাশাপাশি ভাঙন পরিস্থিতির দিকেও সবসময় নজর রাখতে হয় তাদের।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী বর্ণা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলে, ‘নদী ভাঙতে ভাঙতে আমাদের স্কুলের মাঠে চলে এসেছে। ভয় লাগছে, কখন আমাদের স্কুল ভেঙে নদীতে যায়। আমাদের স্কুলটি নদীতে চলে গেলে আমরা আর এখানে পড়াশোনা করতে পারব না। তখন আমরা কোথায় পড়াশোনা করব? আমরা চাই, আমাদের স্কুলটি রক্ষার ব্যবস্থা করা হোক।’
শিক্ষক নাঈমুর রহমান খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শুধু ভাঙন আতঙ্কে আমাদের বিদ্যালয় থেকে অন্তত ১০০ শিক্ষার্থী অন্যত্র চলে গেছে। আমাদেরও সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়। স্কুল ছুটির পর বাসায় গিয়েও এলাকাবাসীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে ভাঙনের পরিস্থিতির খোঁজ রাখতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আগেই স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। এখন কিছু বালুভর্তি বস্তা ফেলে যদি ভাঙন ঠেকানো যেত, তাহলে শিশুরা নির্ভয়ে ক্লাস করতে পারত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই আমাদের এলাকাটি ভাঙছে। নদী এখন বিদ্যালয়ের কাছে চলে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ করার পরও তারা এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন বলেন, ‘আলম খান কান্দি গ্রামে ভাঙনের বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বর্তমানে চরাঞ্চলে ভাঙন রোধে জরুরি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
তিনি জানান, চরে বিদ্যালয় নির্মাণের আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে কোনো অনাপত্তিপত্র বা এনওসি নেওয়া হয়নি।
মো. মিলটন হোসেন আরও বলেন ‘ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয়টির বিষয়ে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা বিভাগ থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। তারপরও আমরা এলাকাটি পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান বলেন, ‘আলম খান কান্দি গ্রামের বিদ্যালয়টি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি, ভাঙনের আগেই বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করার জন্য অন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে।’
একইসঙ্গে বিদ্যালয়টি ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অনুরোধ করবেন বলে জানান তিনি।
এর আগে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একই ইউনিয়নের দুইটি গ্রামে নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।