গরমে বিদ্যুৎ নিয়ে শঙ্কা: দিনে লোডশেডিং হতে পারে ৩ ঘণ্টা

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

ইরান যুদ্ধের আঁচ লাগতে যাচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ খাতেও। জ্বালানি সংকটের কারণে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে সরকারিভাবে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ সারি, গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রেকর্ড দামের পরও এলপিজি বাজারের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

গ্যাসের ঘাটতি ও বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, চাহিদার সর্বোচ্চ সময় অর্থাৎ পিক আওয়ারে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে। এর ফলে সারা দেশে মানুষকে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে জনগণের সহযোগিতা চেয়েছেন।

সন্ধ্যার পর বাড়বে লোডশেডিং

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল বিদ্যুৎ ভবনে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনার বিষয়ে আলোচনা হয়। সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং বাড়ার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত এক সূত্র জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। 

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত আমদানিনির্ভর গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক যেকোনো অস্থিরতায় দেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে দিনে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তবে উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে। পিডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও এপ্রিলে-মে মাসে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর এর বিপরীতে মোট উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কয়লার বড় অংশই আমদানি করা হয়, গ্যাসেরও একটা অংশ আমদানি করতে হয়। তাই সরবরাহের স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এপ্রিল-মে মাসে যে ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার কথা ছিল, আমরা হয়তো তার পুরোটাই পাব না। তবে খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে কেনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ঠিক সময়ে দেশে এসে পৌঁছালে ঘাটতির কিছুটা হয়তো পূরণ করা সম্ভব।’

বিদ্যুতের চাহিদা আবহাওয়ার ওপরও নির্ভর করবে বলে মনে করেন পিডিবির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকলে বিদ্যুৎব্যবস্থায় হয়তো অতটা চাপ পড়বে না।’

গতকাল দেশে ১৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। সাধারণত ১ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি হলে সারা দেশে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। তবে ২০২২ সালের সংকটের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শহর ও গ্রামের লোডশেডিংয়ে বেশ পার্থক্য থাকে। সে সময় রাজধানীতে এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তিন থেকে চার ঘণ্টা মানুষকে বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হতো।

মার্চের শুরুতে দেশে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। লম্বা ঈদের ছুটিতে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় তা কিছুটা কমে এলেও এখন আবার লোডশেডিং বাড়ছে।

এদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। বকেয়া পরিশোধ না করা হলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না বলে সতর্ক করেছেন কেন্দ্রগুলোর পরিচালনাকারীরা। এর ফলে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

এর ওপর আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে এপ্রিলে দেশে একাধিক তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা পৌঁছাতে পারে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের আপত্তি

গতকালের বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতির দাবি জানান। তবে বিদ্যুৎমন্ত্রী এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আপাতত মন্ত্রিসভার নির্দেশ অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হবে।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগামী তিন মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পয়লা বৈশাখ এবং ঈদুল আজহার আগে এই নির্দেশনা পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে। তবে আপাতত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি গাড়িতে জ্বালানি বরাদ্দ ৭০ শতাংশ কমানো হয়েছে, ‘কারপুলিং’ (একই গন্তব্যে একাধিক ব্যক্তির এক গাড়িতে ভ্রমণ) উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং অফিসের সময় কমানো হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতি সপ্তাহে অর্ধেক ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

মন্ত্রী আরও বলেন, মানুষ যখন জানবে যে সন্ধ্যা ছয়টায় দোকান বন্ধ হয়ে যায়, তারা কেনাকাটার অভ্যাসও সেভাবে বদলে নেবে। তবে বিশেষ বিবেচনায় ফার্মেসি ও খাবারের দোকান খোলা রাখা যেতে পারে বলে জানান তিনি।

তবে ব্যবসায়িক নেতাদের দাবি, শুধু মার্কেটের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা যৌক্তিক নয়। তাদের দাবি, অনেক মার্কেটে বিদ্যুতের ব্যবহার আবাসিক ভবন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম। তবু তাদের ওপরই বিধিনিষেধ চাপানো হচ্ছে।

তারা সতর্ক করে বলেন, দোকানপাট আগে বন্ধ করা হলে বাণিজ্যিক এলাকাগুলো অন্ধকার থাকবে, যাতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। এর বদলে যেসব জায়গায় বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার হয়, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

ব্যবসায়ীরা বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার সিসির ওপরের বড় ব্যক্তিগত গাড়িগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। ‘অড-ইভেন’ বা জোড়-বিজোড় নম্বর প্লেট অনুযায়ী গাড়ি চলাচলের একটি পদ্ধতি চালু করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা, যেখানে জোড় নম্বরের গাড়ি জোড় তারিখে এবং বিজোড় নম্বরের গাড়ি বিজোড় তারিখে চলবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষতি এখনো তারা পুষিয়ে নিতে পারেননি। এর ওপর আবার নতুন এ সংকট তাদের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়ীরা সন্ধ্যা ৬টায় দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আপাতত মেনে নেবেন, তবে তারা সময়সীমা পরিবর্তনের দাবি জানিয়েই যাবেন।