ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ইকুয়েডরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কেন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এরমধ্যেই খবর এসেছে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরেও হামলা চালিয়েছে তারা।

এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা, ইকুয়েডরে ‘সন্ত্রাসীদের’ মোকাবিলায় তারা দেশটির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।

আল জাজিরা বলছে, বুধবার মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় সামরিক অভিযান তদারকি করা মার্কিন সামরিক ইউনিট ইউএস সাউদার্ন কমান্ড জানায়, ইকুয়েডরে ইতোমধ্যে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে।

ইউএস সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল ফ্রান্সিস ডোনোভান বলেন, ‘৩ মার্চ ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইকুয়েডরে ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে।’

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই অভিযান লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অংশীদার দেশগুলোর মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ মোকাবিলায় দৃঢ় অঙ্গীকারের শক্তিশালী উদাহরণ।’

এই বিবৃতির সঙ্গে সামরিক হেলিকপ্টার উড্ডয়নের ভিডিও এবং আকাশ থেকে ধারণ করা সাদাকালো নজরদারি চিত্র প্রকাশ করা হয়, যেখানে মাটিতে থাকা কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে উঠতে দেখা যায়।

এই ঘোষণা লাতিন আমেরিকায় অপরাধী নেটওয়ার্ক ও মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৃহত্তর অভিযানের অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইকুয়েডরে এই অভিযানের পূর্ণ পরিসর এখনো জানা যায়নি। তবে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সরকারি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ইকুয়েডরের সেনাদের লজিস্টিক ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে।

বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এই যৌথ অভিযানের প্রশংসা করেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যৌথভাবে মাদক-সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছি, যারা দীর্ঘদিন ধরে পুরো অঞ্চলের নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাস, সহিংসতা ও দুর্নীতি চাপিয়ে দিয়েছে।’

ছবি: রয়টার্স

কার্টেলের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান

গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প একাধিক প্রভাবশালী মাদক কার্টেলকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেন। যে অভিধা সাধারণত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-সম্পন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহার করা হয়।

তার প্রশাসন মাদক পাচার দমনে ক্রমেই সামরিকধর্মী কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে সন্দেহভাজন পাচারকারী নৌযানে বোমা হামলাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনে মাদক পাচার একটি অপরাধ, যুদ্ধ নয়। ফলে এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলাকে বিচার-বহির্ভূত হত্যা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

এ পর্যন্ত ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে বিভিন্ন নৌযান লক্ষ্য করে আকাশপথে অন্তত ৪৪টি  হামলা চালানো হয়েছে।

এর ফলে কমপক্ষে ১৫০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিহতদের পরিচয় এখনো মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেননি এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও প্রকাশ করা হয়নি।

অক্টোবর মাসে একটি সাবমেরিনে হামলার পর জীবিত উদ্ধার দুই ব্যক্তিকে দ্রুত তাদের নিজ দেশ ইকুয়েডর ও কলম্বিয়ায় ফেরত পাঠানো হয় এবং পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

অন্যদিকে কলম্বিয়া এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর কিছু পরিবার দাবি করেছে, নিহতদের অনেকেই মাদক পাচারকারী নয়, তারা ছিলেন জেলে বা অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক, যারা ভেনেজুয়েলা ও কাছাকাছি দ্বীপগুলোর মধ্যে যাতায়াত করতেন।

ভেনেজুয়েলায়ও অভিযান

ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডেও দুটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে, একটি গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে এবং আরেকটি ৩ জানুয়ারি।

দুই ক্ষেত্রেই হামলাকে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

প্রথম অভিযানে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ ব্যবহার করত বলে অভিযোগ থাকা একটি জেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

দ্বিতীয় অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করা হয়। পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে একটি ফেডারেল আদালতে মাদক পাচার ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।

এই অভিযানেরও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং উসকানি ছাড়া সামরিক আগ্রাসনের একটি উদ্বেগজনক ধারা।

ট্রাম্পের মাদকবিরোধী অভিযানের নতুন ফ্রন্ট

ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করে স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতেও চালানো হতে পারে। ইকুয়েডরের ঘোষণা সেই অভিযানের নতুন একটি ফ্রন্টের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এর আগে, গত ২ মার্চ ইকুয়েডরের রাজধানী কুইটোতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইউএস সাউদার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডোনোভান।

২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর থেকে ইকুয়েডরে হত্যা ও সহিংস অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কারণ বিভিন্ন অপরাধী নেটওয়ার্ক দেশটিতে প্রভাব বিস্তার করছে।

এর আগে অঞ্চলটিতে সহিংস অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে ইকুয়েডরকে একসময় লাতিন আমেরিকার ‘শান্তির দ্বীপ’ বলা হতো।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির সময় উচ্চ যুব বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে কৌশলগত অবস্থানের (যা বড় কোকেন উৎপাদক দেশ কলম্বিয়া ও পেরুর মাঝামাঝি) কারণে অপরাধ বেড়েছে।

ছবি: রয়টার্স

‘নতুন ধাপ’ শুরুর ঘোষণা নোবোয়ার

২০২৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ডানপন্থী নেতা নোবোয়া গত বছর পুনর্নির্বাচনী প্রচারে অপরাধ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আইন প্রয়োগে তার কৌশলকে অনেকেই ‘মানো দ্যুরা’ বা ‘নিষ্ঠুর দমননীতি’ বলে উল্লেখ করেন।

ট্রাম্পও লাতিন আমেরিকার নেতাদের অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হতে উৎসাহ দিয়েছেন। নোবোয়া ও ট্রাম্প দুজনেই বামপন্থী নেতা গুস্তাভো পেত্রো নেতৃত্বাধীন কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, দেশটি মাদক পাচার দমনে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

উদাহরণ হিসেবে, ১ মার্চ নোবোয়া ঘোষণা দেন যে কোকেন পাচার দমন করতে ব্যর্থ হওয়ায় কলম্বিয়ার আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।

বুধবার জেনারেল ডোনোভান ইকুয়েডরের সামরিক বাহিনীর ‘অটল প্রতিশ্রুতির’ প্রশংসা করেন।

প্রেসিডেন্ট নোবোয়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সহযোগিতাকে স্বাগত জানান। গত এক বছরে তিনি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েমসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একাধিকবার স্বাগত জানিয়েছেন।

২ মার্চ সামাজিকমাধ্যমে নোবোয়া লিখেছেন, ‘মাদকপাচার ও অবৈধ খনি খননের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন ধাপ শুরু করছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইকুয়েডরের জনগণের নিরাপত্তাই আমাদের অগ্রাধিকার। দেশের প্রতিটি কোণে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা লড়ব। সেই শান্তি অর্জনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

সমালোচকদের উদ্বেগ

তবে সমালোচকেরা বুধবারের ঘোষণাকে সন্দেহ ও উদ্বেগের সঙ্গে দেখেছেন, কারণ বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সংখ্যা বাড়ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন সামাজিকমাধ্যমে বলেন, ‘এই যৌথ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী এবং লক্ষ্যবস্তু কারা, তা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি।’

তিনি লিখেছেন, ‘আমার ধারণা প্রশাসনের কিছু লোক অনেক দিন ধরেই মাদক-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোথাও মার্কিন সেনা মোতায়েন করে অভিযান চালাতে চেয়েছিল এবং পরে তা নিয়ে প্রকাশ্যে গর্ব করতে চেয়েছে।’

‘মেক্সিকোর তুলনায় ইকুয়েডর এ বিষয়ে বেশি সহযোগিতাপ্রবণ ছিল’, যোগ করেন তিনি।