‘সমালোচক’ পোপ লিওর সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব কী নিয়ে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ চতুর্দশ লিওর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে এক নজিরবিহীন ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক-কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতি, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং অভিবাসন নীতির তীব্র সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন প্রথম মার্কিন বংশোদ্ভূত পোপ লিও। এই বিরোধ কেবল দুই নেতার কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ডানপন্থী রক্ষণশীল শিবির এবং ভ্যাটিকানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
ইরান যুদ্ধ এবং পোপের শান্তি আহ্বান
ট্রাম্প-লিও বিবাদের কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৭ এপ্রিল ট্রাম্প হুমকি দেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তিতে না আসে, তবে তিনি ইরানের ‘গোটা সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেবেন।
পোপ লিও ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি সংঘাত নিরসনের আহ্বান জানান এবং সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় এক প্রার্থনা সভায় বলেন, ‘ক্ষমতার আস্ফালন যথেষ্ট হয়েছে! যুদ্ধ আর নয়!’।
টাইম ম্যাগাজিন জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন যখন তাদের সামরিক পদক্ষেপকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন পোপ এর কড়া সমালোচনা করেন।
পোপ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘ঈশ্বর কোনো সংঘাতকে আশীর্বাদ করেন না’ এবং যারা যুদ্ধ করে ঈশ্বর তাদের প্রার্থনা শোনেন না।
‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ট্রাম্পের আক্রমণ
পোপের শান্তিবাদী অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোপের বিরুদ্ধে একটি তীব্র আক্রমণাত্মক পোস্ট দেন।
ট্রাম্প পোপকে ‘অপরাধের বিষয়ে দুর্বল’ এবং ‘পররাষ্ট্র নীতির জন্য ভয়ানক’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, পোপ একজন রাজনীতিকের মতো আচরণ করছেন এবং বামপন্থীদের স্বার্থসিদ্ধিতে কাজ করছেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে আরও দাবি করেন, তিনি হোয়াইট হাউসে না থাকলে লিও কোনোদিন ভ্যাটিকানের পোপ হতে পারতেন না। তিনি জানান, পোপের ভাই লুই প্রিভোস্টকে বেশি পছন্দ করেন তিনি। কারণ লুই একজন কট্টর ট্রাম্প বা ‘মাগা’ সমর্থক। এছাড়া, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপদেষ্টা ডেভিড অ্যাক্সেলরডের সঙ্গে পোপের সাম্প্রতিক একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়েও ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অ্যাক্সেলরডকে ‘বামপন্থী লুজার’ বলে আখ্যা দেন।
নিজেকে যিশুর মতো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করে ট্রুথ সোশ্যালে একটি এআই-জেনারেটেড ছবিও পোস্ট করেন ট্রাম্প।
পোপ লিওর জবাব
ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত আক্রমণের পর পোপ লিও চুপ থাকেননি। বিবিসি জানায়, আলজেরিয়া সফরে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পোপ বলেন, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে বা জোরেসোরে সত্য কথা বলতে ‘ভয় পান না’। পোপ জানান, তার ভূমিকা কোনো রাজনীতিকের নয়, বরং তিনি কেবল গসপেলের শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান।
ইউএসএ টুডে জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে জড়াতে না চাইলেও ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালের’ নাম নিয়ে পোপ পরিহাস করে বলেন, ‘সাইটটির নামই অদ্ভুত—এর বেশি কিছু বলার নেই’।
পেন্টাগনের প্রচ্ছন্ন হুমকি
এই সংঘাতের সবচেয়ে বিস্ফোরক দিকটি হলো ‘অ্যাভিগনন-গেট’ কেলেঙ্কারি। ভক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জানুয়ারিতে পেন্টাগনের আন্ডারসেক্রেটারি অব ডিফেন্স এলব্রিজ কোলবি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাটিকানের শীর্ষ কূটনীতিক কার্ডিনাল ক্রিস্টোফ পিয়েরের মধ্যে একটি অস্বাভাবিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘনের বিষয়ে পোপের সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণেই এই বৈঠক ডাকা হয়েছিল।
‘দ্য ফ্রি প্রেস’ এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৈঠকে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা ভ্যাটিকানকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে ‘অ্যাভিগনন’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ চতুর্থ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তৎকালীন পোপকে রোম থেকে ফ্রান্সের অ্যাভিগনন শহরে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছিলেন, যা ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায়।
পেন্টাগনের এই রেফারেন্সকে ভ্যাটিকানের জন্য একটি পরিষ্কার সামরিক হুমকি হিসেবে দেখা হয়, যার অর্থ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক ক্ষমতা রয়েছে এবং পোপের উচিত তাদের পক্ষে থাকা। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে একটি ‘সম্মানজনক’ বৈঠক বলেছে এবং ভ্যাটিকানও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি খারিজ করেছে, তবে এই ঘটনা মার্কিন ক্যাথলিক সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ ও শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
অভিবাসন নীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব
যুদ্ধ ছাড়াও অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্প ও পোপ লিওর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে বলে জানায় টাইম। পোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অমানবিক আচরণের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা অভিবাসীদের ওপর সহিংসতা চালায়, তারা কীভাবে নিজেদের ‘প্রো-লাইফ’ বা জীবন-সমর্থক বলে দাবি করতে পারে। এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, তারা কেবল দেশের আইন প্রয়োগ করছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ট্রাম্প এবং পোপের এই দ্বন্দ্ব মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, বিশেষ করে ট্রাম্পের কট্টরপন্থী সমর্থক গোষ্ঠী বা ‘মাগা’ শিবিরের মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাটল তৈরি করেছে। দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডানপন্থী ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টানরা ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি সমর্থন করে বলছেন—ঈশ্বর ইতিহাসের পক্ষ নেন।
কিন্তু অন্যদিকে, অনেক ক্যাথলিক এবং যুদ্ধবিরোধী ডানপন্থী নেতা (যেমন: টাকার কার্লসন, ক্যান্ডেস ওয়েন্স, নিক ফুয়েন্তেস) পোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা এই প্রশাসনকে ক্যাথলিক-বিরোধী আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা করছেন।
ভক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জেডি ভ্যান্সের মতো ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ ক্যাথলিক কর্মকর্তারা এই ‘অ্যাভিগনন-গেট’ বিতর্কের বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন, যা তাদের রাজনৈতিক অস্বস্তিরই প্রমাণ দেয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পোপ চতুর্দশ লিওর মধ্যকার এই বিরোধ আধুনিক রাজনীতি ও ধর্মের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এটি কেবল দুটি পরাশক্তির মধ্যে কূটনৈতিক মতবিরোধ নয়, বরং এটি বিশ্বব্যাপী নৈতিকতা, যুদ্ধনীতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের একটি আদর্শিক লড়াই। একদিকে ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও সামরিক শক্তির একচেটিয়া প্রয়োগকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, অন্যদিকে পোপ লিও তার শান্তিবাদী অবস্থান থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
‘অ্যাভিগনন-গেট’ বিতর্ক এই সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটের ভেতরেও প্রভাব ফেলছে এবং আগামী দিনগুলোতে মার্কিন-ভ্যাটিকান সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।