ডাইনোসর বিলুপ্ত না হলে কেমন হতো আজকের পৃথিবী?

রবিউল কমল
রবিউল কমল

ভাবুন তো, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন রাস্তার ওপাশে একটি বিশাল টি. রেক্স হেঁটে যাচ্ছে। পার্কে শিশুরা খেলছে ছোট ছোট পালকওয়ালা ডাইনোসরের সঙ্গে। রাজধানীর রমনার উদ্যানে ঘুরে বেড়াচ্ছে লম্বা গলার সৌরোপড। এমন একটি পৃথিবী কি সত্যিই হতে পারত?

অবিশ্বাস্য হলেও, বিজ্ঞানীরা মনে করেন হতে পারত।

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ঘটেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়গুলোর একটি। বিশাল একটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। সেই এক ঘটনাই পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয়। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী হিসেবে রাজত্ব করা ডাইনোসরদের যুগ শেষ হয়ে যায়।

Digital illustration of T-Rex.
টাইরানোসরাস রেক্স। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু যদি সেই গ্রহাণুটি পৃথিবীতে না পড়ত? অথবা অন্য কোথাও গিয়ে পড়ত? তাহলে কি আজও পৃথিবীতে ডাইনোসরদের রাজত্ব চলত? মানবসভ্যতা গড়ে উঠত?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তাদের গবেষণা বলছে, ডাইনোসররা টিকে থাকলে হয়তো আজকের পৃথিবী অন্যরকম হতো।

পৃথিবী বদলে দিয়েছিল মহাজাগতিক সংঘর্ষ

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে প্রায় ১৪ কিলোমিটার চওড়া একটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানে। আঘাতের শক্তি ছিল এতটাই ভয়ংকর যে মুহূর্তের মধ্যে আকাশে উড়ে যায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টন ধুলা, ছাই ও কালো ধোঁয়া।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পৃথিবীর আকাশ ঢেকে যায় ঘন ধুলার পর্দায়। সূর্যের আলো আর মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। দিনের পৃথিবী যেন রাতের অন্ধকারে ডুবে যায়।

সূর্যের আলো না থাকায় গাছপালা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারেনি। তারা নিজের খাবার তৈরি করতে পারেনি। ধীরে ধীরে উদ্ভিদ মারা যেতে থাকে। আর উদ্ভিদ কমে যেতেই ভেঙে পড়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল। তৃণভোজী প্রাণীরা খাবার পেত না, ফলে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। এরপর একে একে বিলুপ্ত হতে শুরু করে মাংসাশীরাও।

একই সঙ্গে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যায়। শুরু হয় দীর্ঘ ও ভয়াবহ শীতকাল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও অনেক বিপর্যয়—প্রচণ্ড ভূমিকম্প, সুনামি, বিশাল দাবানল এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। প্রথম ধাক্কায় যেসব প্রাণী কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিল, তাদের জন্যও সামনে অপেক্ষা করছিল অনাহার, শীত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

Triceratops dinosaur, artwork
ট্রাইসেরাটপস। ছবি: সংগৃহীত

যদি গ্রহাণুটি কয়েক মিনিট আগে আসত...

সেই বিপর্যয়ে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ জীবপ্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। স্থলভাগে ল্যাব্রাডর কুকুরের চেয়ে বড় প্রায় কোনো প্রাণীই আর টিকে থাকতে পারেনি।

তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভাগ্যের সামান্য পরিবর্তনেই ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্য রকম হতে পারত।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, যদি গ্রহাণুটি মাত্র কয়েক মিনিট আগে এসে পৃথিবীতে আঘাত করত, তাহলে সেটি বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের অগভীর সমুদ্রে না পড়ে গভীর সমুদ্রে গিয়ে পড়ত।

সেক্ষেত্রে আঘাতের শক্তি হয়তো একই থাকত, কিন্তু ধুলা, ছাই ও সালফার গ্যাস অনেক কম পরিমাণে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ত। ফলে সূর্যের আলো এতটা আটকে যেত না। বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত বিপর্যয়ও হয়তো এত ভয়াবহ হতো না।

তাহলে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের ডাইনোসর বেঁচে যেতে পারত।

Velociraptor dinosaur roaring against white background.
ভেলোসিরাপ্টর। ছবি: সংগৃহীত

তাহলে কি আজও পৃথিবীতে ডাইনোসর থাকত

মজার ব্যাপার হলো, সব ডাইনোসর কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। পালকযুক্ত ছোট একদল থেরোপড ডাইনোসর সেই মহাবিপর্যয় থেকে বেঁচে গিয়েছিল। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারাই আজকের পাখিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন আমাদের চারপাশে উড়ে বেড়ানো চড়ুই, কাক, কবুতর কিংবা ঈগল সবই ডাইনোসরের উত্তরসূরি।

কিন্তু যদি টি. রেক্স, ট্রাইসেরাটপস, ভেলোসির্যাপটর কিংবা বিশাল সৌরোপডরাও টিকে থাকত?

স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ ড. স্টিফেন ব্রুসাটে মনে করেন, সে ক্ষেত্রে আজও পৃথিবীতে নানা ধরনের ডাইনোসর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল।

তার মতে, পরে পৃথিবীতে বরফ যুগ এসেছে, মহাদেশের অবস্থান বদলেছে, ঘাসের বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের কোনোটিই ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো শক্তিশালী ছিল না।

বরং কোটি কোটি বছর ধরে তারাও বিবর্তিত হতো। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে তাদের শরীর, খাদ্যাভ্যাস, আচরণ সবকিছুই বদলে যেত।

তাই আজকের পৃথিবীতে যদি ডাইনোসর থাকত, তাহলে তারা জুরাসিক পার্কের সিনেমায় দেখা প্রাণীগুলোর মতো হতো না। হয়তো তাদের দেখে বোঝা যেত, তারা ডাইনোসরের বংশধর। কিন্তু তাদের চেহারা ও জীবনযাত্রা হতো আমাদের কল্পনার চেয়েও আলাদা।

Digital illustration of stegosaurus dinosaur.
স্টেগোসরাস। ছবি: সংগৃহীত

কোটি কোটি বছরে ডাইনোসররা কতটা বদলে যেত

একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত, ডাইনোসররা যদি বিলুপ্ত না-ও হতো, তাহলে আজ তাদের চেহারা নিশ্চয়ই আগের মতো থাকত না।
প্রকৃতির সবচেয়ে বড় নিয়মের নাম বিবর্তন। পরিবেশ বদলায়, জলবায়ু বদলায়, খাবারের ধরন বদলায়। আর এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে প্রাণীর শরীরও বদলে যায়। লাখো নয়, কোটি কোটি বছরে এই পরিবর্তন এতটাই বড় হয়ে উঠতে পারে যে, একই প্রাণীকে আর চেনাই কঠিন হয়ে পড়ে।

ডাইনোসরদের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটত।

আজকের হাতি আর কোটি বছর আগের হাতির পূর্বপুরুষ এক রকম ছিল না। ঘোড়া, তিমি, এমনকি মানুষও তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের মতো দেখতে নয়। তাহলে ডাইনোসররাই বা ব্যতিক্রম হবে কেন?

১৯৮৮ সালে স্কটিশ ভূতত্ত্ববিদ ও লেখক ডুগাল ডিকসন এই প্রশ্নের উত্তর কল্পনার মাধ্যমে খোঁজার চেষ্টা করেন। তিনি লেখেন ‘দ্য নিউ ডাইনোসরস: অ্যান অলটারনেটিভ ইভল্যুশন’

বইটির সব প্রাণীই কাল্পনিক, কিন্তু তাদের বিবর্তনের ধারণাগুলো গড়ে উঠেছে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে।

Digital illustration of spinosaurus dinosaur.
স্পাইনোসরাস। ছবি: সংগৃহীত

তিনি কল্পনা করেছিলেন দক্ষিণ আমেরিকার এক ভয়ংকর শিকারি ডাইনোসরের কথা, যার নাম কাটলাসটুথ। দল বেঁধে শিকার করাই ছিল তার বিশেষত্ব।

আবার অস্ট্রেলিয়ায় তিনি কল্পনা করেছিলেন ক্রিব্রাম নামে এক অদ্ভুত ডাইনোসরের। দেখতে অনেকটা ফ্লেমিঙ্গোর মতো। পানির মধ্যে ঠোঁট ডুবিয়ে ছোট ছোট প্রাণী ছেঁকে খেত। 

আর ছিল গুরমঁ নামে টি. রেক্সের এক দূরের আত্মীয়। বিবর্তনের পথে তার ছোট দুটি সামনের হাত প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। কিন্তু বদলে তৈরি হয়েছে বিশাল, শক্তিশালী চোয়াল। সাপের মতো মুখ অনেক বড় করে খুলে একবারেই বড় শিকার গিলে ফেলতে পারত সে।

শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো লাগলেও, এসব ধারণা পুরোপুরি অসম্ভব নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ ড. টম হল্টজ মনে করেন, টি. রেক্স কিংবা অ্যাবেলিসরের মতো বড় মাংসাশী ডাইনোসরদের ছোট সামনের হাত শিকার ধরার কাজে খুব একটা ব্যবহার হতো না। তাই দীর্ঘ বিবর্তনের পথে সেই হাত আরও ছোট হতে হতে একসময় পুরোপুরি হারিয়েও যেতে পারত।

Digital illustration of archaeopteryx dinosaur.
আর্কিওপটেরিক্স। ছবি: সংগৃহীত

তখন পৃথিবীর রাজত্ব কারা করতো

ডাইনোসররা যদি টিকে থাকত, তাহলে পৃথিবীর নতুন যুগও শুরু হতো তাদের দিয়েই।

আজ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে শুরু হয়েছিল সিনোজোয়িক যুগ। বাস্তবে এই যুগেই স্তন্যপায়ী প্রাণীরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ডাইনোসররা বেঁচে থাকলে সেই ইতিহাস বদলে যেত।

লম্বা গলার টাইটানোসর, হাঁসের ঠোঁটের মতো মুখওয়ালা হ্যাড্রোসর, শিংওয়ালা সেরাটোপসিয়ান আর ভয়ংকর টাইরানোসর—তারাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলপ্রাণী হিসেবে রাজত্ব চালিয়ে যেত।

তবে তারা আগের মতো থাকত না।

ক্যালিফোর্নিয়ার রেমন্ড এম. আলফ মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিদ ড. অ্যান্ডি ফার্কে বলেন, আজ যদি ডাইনোসররা পৃথিবীতে থাকত, তাহলে তাদের টি. রেক্স বা ট্রাইসেরাটপস বলে চিনে নেওয়া সহজ হতো না।

হয়তো শরীরের গঠন বদলে যেত। কেউ আরও দ্রুত দৌড়াতে পারত, কেউ গাছে উঠতে শিখত, কারো আবার নতুন ধরনের দাঁত বা ঠোঁট তৈরি হতো। কোটি কোটি বছরের বিবর্তন তাদের এমনভাবে বদলে দিত যে, তারা হতো একেবারেই নতুন ধরনের প্রাণী।

Dino Wallpaper, Free, 4k
ডাইনোসররা যদি টিকে থাকত, তাহলে পৃথিবীর নতুন যুগও শুরু হতো তাদের দিয়েই। ছবি: সংগৃহীত

স্তন্যপায়ীদের ভাগ্যে কী ঘটত

এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ডাইনোসররা যদি পৃথিবী ছেড়ে না যেত, তাহলে মানুষসহ আজকের পরিচিত স্তন্যপায়ী প্রাণীরা কি আদৌ জন্মাতে পারত?

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর উত্তর খুব সহজ নয়।

গ্রহাণুর আঘাতের আগে প্রায় ১৬ কোটি বছর ধরে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা পৃথিবীতে ছিল। কিন্তু তারা ছিল ছোট, দুর্বল এবং প্রায় সব সময় ডাইনোসরদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাণী।

কারণ, বড় প্রাণীদের প্রায় সব পরিবেশগত জায়গাই দখল করে রেখেছিল ডাইনোসররা। বিশাল তৃণভোজী আছে, ভয়ংকর শিকারি আছে, মাঝারি আকারের প্রাণীও আছে। তাই নতুন কোনো স্তন্যপায়ীর বড় হয়ে ওঠার সুযোগই ছিল খুব কম।
কিন্তু গ্রহাণুর আঘাতের পর সবকিছু বদলে যায়।

বড় ডাইনোসররা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে অসংখ্য নতুন জায়গা খালি হয়ে যায়। সেই শূন্যস্থান দ্রুত দখল করে নেয় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা।

ড. অ্যান্ডি ফার্কের ভাষায়, ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ছিল স্তন্যপায়ীদের জন্য যেন নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে যাওয়ার মতো।
সেই সুযোগ পেয়েই জন্ম নেয় বিশাল হাতি, গণ্ডার, তিমি, বানর এবং শেষ পর্যন্ত গড়ে ওঠে মানবসভ্যতা।

Digital illustration of brachiosaurus.
ব্র্যাকিওসরাস। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ডাইনোসররা যদি টিকে থাকত...

তাহলে হয়তো স্তন্যপায়ীরা আরও কোটি কোটি বছর ছোট আকারের নিশাচর প্রাণী হিসেবেই রয়ে যেত। তাদের মধ্যে কেউই হয়তো পৃথিবীর প্রধান প্রাণী হয়ে উঠতে পারত না।

আর সেই ক্ষেত্রে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর আবির্ভাবও কঠিন হয়ে যেত। তবে এটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। বিবর্তনের পথ কখনোই সরল নয়। প্রকৃতি প্রায়ই আমাদের চমকে দেয়।

Digital illustration of allosaurus dinosaur.
অ্যালোসরাস। ছবি: সংগৃহীত

গাছে বসবাসকারী বুদ্ধিমান ডাইনোসর

এই প্রশ্নটি শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো লাগতে পারে। কিন্তু এর পেছনেও কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে। ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ দিকে পৃথিবীতে অনেক ছোট, পালকযুক্ত ডাইনোসর গাছে বাস করত। তারা দেখতে অনেকটা আজকের পাখির মতো হলেও পুরোপুরি পাখি ছিল না। গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে চলত, পোকামাকড় ধরত, ফল খেত এবং শিকারিদের চোখ এড়িয়ে বাঁচত।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যদি ডাইনোসররা বিলুপ্ত না হতো এবং পৃথিবীতে ফুলগাছ ও ফলের গাছ আগের মতোই ছড়িয়ে পড়ত, তাহলে গাছে থাকা কিছু ডাইনোসর ধীরে ধীরে ফল খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত হতে পারত।

নিউ জার্সির স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ প্রফেসর ম্যাথিউ বোনান মনে করেন, ফল খাওয়া প্রাণীদের মধ্যে একটি মজার মিল দেখা যায়। তাদের অনেকেরই মস্তিষ্ক তুলনামূলক বড় হয় এবং দুই চোখ সামনের দিকে থাকে। এতে তারা দূরত্ব ঠিকভাবে বুঝতে পারে এবং গাছের ডাল থেকে ডালে সহজে চলাফেরা করতে পারে।

হয়তো কিছু ডাইনোসরের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটত।

তারা ফল খেত, আর সেই ফলের বীজ দূরে দূরে ছড়িয়ে দিত। ফলে গাছপালা ও ডাইনোসরের মধ্যে গড়ে উঠত এক ধরনের সহ-বিবর্তনের সম্পর্ক। গাছ তাদের খাবার দিত, আর ডাইনোসর গাছের বংশ বিস্তারে সাহায্য করত।

ছবি: সংগৃহীত

ডাইনোসর কি আবার সমুদ্রে ফিরত

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে।

অনেক স্থলচর প্রাণী পরে আবার পানিতে ফিরে গেছে। তিমি ও ডলফিনের পূর্বপুরুষ একসময় স্থলভাগে হাঁটত। মানাটি, সিল কিংবা ভোঁদড়ও স্থলচর প্রাণী থেকেই ধীরে ধীরে জলজ জীবনে মানিয়ে নিয়েছে।

তাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ডাইনোসরদের মধ্যেও হয়তো কেউ কেউ আবার সমুদ্রের জীবন বেছে নিত।

কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফলে তাদের পা হয়তো পাখনায় পরিণত হতো। শরীর আরও সরু ও সাঁতারের উপযোগী হয়ে উঠত। তারা গভীর সমুদ্রে মাছ কিংবা অন্য সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করত।

তবে এখানে একটি বড় বাধাও ছিল।

যদি মোসাসর, প্লেসিওসর কিংবা অন্য বিশাল সামুদ্রিক সরীসৃপরাও বিলুপ্ত না হতো, তাহলে সমুদ্রে নতুন ডাইনোসরদের জায়গা করে নেওয়া সহজ হতো না। সেখানে আগে থেকেই শক্তিশালী শিকারিদের আধিপত্য থাকত।

Digital illustratino of apatosaurus dinosaur.
অ্যাপাটোসরাস। ছবি: সংগৃহীত

আজকের পাখিরা কি থাকত

এই প্রশ্নের উত্তর অনেককেই অবাক করতে পারে।

বাস্তবে আজকের সব পাখিই ডাইনোসরের বংশধর। কিন্তু আমরা যে চড়ুই, টিয়া, কবুতর, ঈগল, বাজপাখি কিংবা হামিংবার্ড দেখি, তারা সবাই এসেছে ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার পরের দীর্ঘ বিবর্তনের পথ ধরে।

কানাডার রয়্যাল অন্টারিও মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিদ ড. ভিক্টোরিয়া আরবর বলেন, ডাইনোসর ও উড়ন্ত প্টেরোসররা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই আকাশে অসংখ্য নতুন পরিবেশগত সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই পাখিরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর নানা পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে তারা হাজার হাজার নতুন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়।

Digital illustration of dilophosaurus dinosaur
ডাইলোফোসরাস। ছবি: সংগৃহীত

মানুষ ও ডাইনোসর কি একসঙ্গে বাস করতে পারত

সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই।

যদি মানুষ আর ডাইনোসর একই সময়ে পৃথিবীতে বাস করত, তাহলে কী ঘটত?

হলিউডের সিনেমা দেখলে মনে হয়, মানুষ হয়তো সারাক্ষণ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াত।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা একটু ভিন্ন।

ড. অ্যান্ডি ফার্কে বলেন, মানুষ এমন একটি পৃথিবীতে বিবর্তিত হয়েছে, যেখানে সিংহ, বাঘ, ভালুক, নেকড়ে, কুমিরের মতো বড় ও ভয়ংকর শিকারি প্রাণী ছিল। মানুষ এসব প্রাণীর সঙ্গেও টিকে থাকতে শিখেছে।

তাই ডাইনোসরের উপস্থিতি মানুষকে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হুমকি হতো এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ড. ভিক্টোরিয়া আরবরও একই কথা বলেন।

একজন নিরস্ত্র মানুষ অবশ্যই একটি বড় শিকারি ডাইনোসরের সামনে অসহায় হয়ে পড়ত। কিন্তু মানুষ কখনো একা লড়াই করে টিকে থাকেনি। মানুষ দল গড়ে বাস করে। পরিকল্পনা করে। আগুন ব্যবহার করতে পারে। অস্ত্র বানাতে পারে। ফাঁদ পাতে। জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়।

এই অসাধারণ ক্ষমতাগুলোর কারণেই মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

তাই ডাইনোসরদের সঙ্গে একই পৃথিবীতে বাস করলেও মানুষ হয়তো নিজের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করে নিতে পারত।
তবে সেই পৃথিবী অবশ্যই আজকের পৃথিবীর মতো হতো না। বিশাল তৃণভোজী ডাইনোসরের পাল হয়তো বনভূমি দখল করে রাখত। কোথাও কোথাও বিশাল শিকারি ডাইনোসরের কারণে মানুষের বসতি গড়ে তোলাই কঠিন হয়ে পড়ত।

অর্থাৎ, মানুষ ও ডাইনোসর পাশাপাশি থাকতে পারলেও পৃথিবীর মানচিত্র, শহর, বন আর মানুষের জীবনধারা—সবকিছুই হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস, নিউ সায়েনটিস্ট, সায়েন্স নিউজ, দ্য আর্থ