সন্তান রেগে গেলে কী করবেন?
সন্তান হঠাৎ চিৎকার করছে, জিনিসপত্র ছুড়ে মারছে—এমন পরিস্থিতি অনেক অভিভাবকের কাছেই অস্বস্তিকর। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে, এই আচরণকে কেবল ‘দুষ্টুমি’ বা ‘অবাধ্যতা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং অনেক সময় এটি হতে পারে শিশুর অসহায়ত্ব প্রকাশের ভাষা।
চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট দীপু মাহমুদ বলেন, শিশু যখন প্রচণ্ড রেগে যায়, তখন সে অনেক সময় নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। হতাশা, ভয়, ক্লান্তি বা অপূর্ণ চাহিদা তার ভেতরে জমে থাতে। তখন সেই অনুভূতি বেরিয়ে আসে কান্না, চিৎকার, জিনিস ছোড়া কিংবা জিদের মাধ্যমে।
অর্থাৎ, শিশুর আচরণ অনেক সময় তার মনের অবস্থারই প্রকাশ বলে জানান তিনি।
বাবা-মা শান্ত থাকাই সবচেয়ে বড় শক্তি
দীপু মাহমুদ বলেন, রেগে থাকা শিশুর সামনে যদি অভিভাবকও চিৎকার শুরু করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। শিশুরা বড়দের আচরণ অনুকরণ করে। তাই অভিভাবক শান্ত থাকতে পারলে শিশুও ধীরে ধীরে শান্ত হবে। হয়তো এটি সহজ নয়, কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি।
কান্না থামাতে সব দাবি মেনে নেবেন না
অনেক সময় অভিভাবকরা ঝামেলা এড়াতে শিশুর চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাবি পূরণ করেন। এতে সে শিখে যায়, চিৎকার বা মারামারি করলেই নিজের ইচ্ছে পূরণ করা যায়।
দীপু মাহমুদ বলেন, তাই ভালোবাসা দেখান, কিন্তু নিয়ম ভাঙবেন না।
শান্ত হলে প্রশংসা করুন
রাগ কমে গেলে যদি শিশু নিজে থেকে শান্ত হয়, নিজের অনুভূতি বলার চেষ্টা করে বা ক্ষমা চায়, তাহলে তাকে আন্তরিকভাবে প্রশংসা করুন। যেমন বলতে পারেন, ‘বিষয়টা তুমি বুঝতে পেরেছে, এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ’, অথবা বলতে পারেন, ‘আমি জানতাম, তুমি এটা বুঝতে পারবে’।
এ ধরনের ইতিবাচক উৎসাহ শিশুর আচরণ বদলাতে সাহায্য করে।
সমস্যা সমাধান শেখান
রাগের সময় নয়, বরং শান্ত মুহূর্তে শিশুর সঙ্গে কথা বলুন। জিজ্ঞেস করতে পারেন—তুমি তখন এত রেগে গেলে কেন? পরেরবার এমন হলে কী করা যায়? রাগ হলে তুমি কি আমাকে বলবে?
দীপু মাহমুদের ভাষায়, তাহলে শিশু ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শিখে যায়।
কোন সময়ে রাগ বেশি হয়, খেয়াল করুন
অনেক শিশুর রাগের নির্দিষ্ট কিছু কারণ থাকে। যেমন—পড়তে বসার সময়, ঘুমাতে যাওয়ার আগে, মোবাইল বা টিভি বন্ধ করতে বললে, খেলাধুলা থামাতে বললে, ক্ষুধা বা ক্লান্তির সময় ইত্যাদি। এই সময়গুলো আগে থেকেই বুঝতে পারলে অনেক সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারেন, ‘আর দশ মিনিট পর খেলাটা শেষ করবে’, অথবা ‘আগে জুতা পরে নিই, তারপর বাইরে যাব’।
এভাবে আগাম প্রস্তুতি শিশুকে মানসিকভাবে তৈরি হতে সাহায্য করে বলে জানান তিনি।
সব রাগ এক রকম নয়
শিশু শুধু কাঁদছে বা গড়াগড়ি দিচ্ছে, আবার কারো দিকে তেড়ে যাচ্ছে—এই দুই পরিস্থিতি এক নয়। যদি শিশু নিজের বা অন্য কারও ক্ষতি করার মতো আচরণ করে, তাহলে তাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান। আশপাশ থেকে ধারালো জিনিস সরিয়ে ফেলুন। তবে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং সবাইকে নিরাপদ রাখার জন্যই এটি করুন।
টাইম-আউট কি কাজে আসে
তিনি পরামর্শ দেন, ছোট শিশু হলে (বিশেষ করে সাত বছরের কম বয়সে) সীমিত সময়ের জন্য শান্ত পরিবেশে বসিয়ে রাখা অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এটি শাস্তি নয়, শান্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। জায়গাটিতে খেলনা বা মোবাইল থাকবে না। শিশুর বয়স অনুযায়ী অল্প সময় রাখাই যথেষ্ট। পরে অবশ্যই তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করুন।
টাইম-আউটের পাশাপাশি ইতিবাচক আচরণের প্রশংসাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?
দীপু মাহমুদ বলেন, যদি দেখেন শিশু প্রায়ই মারধর বা জিনিসপত্র ছোড়ে, পরিবারের সবাই ভয় পেতে শুরু করেছে, স্কুলেও একই সমস্যা হচ্ছে, বয়স বাড়লেও আচরণ কমছে না, তাহলে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।
কখনো কখনো শিশুর রাগের পেছনে অন্য কোনো সমস্যা লুকিয়ে থাকে। যেমন—মনোযোগ ঘাটতি ও অতিচঞ্চলতা, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা, শেখার কোনো সমস্যা, শব্দ, আলো বা স্পর্শে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা। এসব ক্ষেত্রে বকা বা শাস্তি দিয়ে সমাধান হয় না। প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা।
ওষুধ কি সব সময় প্রয়োজন
দীপু মাহমুদ বলেন, না। বেশির ভাগ শিশুর ক্ষেত্রে আচরণগত কৌশল, অভিভাবকের প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সেলিংই যথেষ্ট। তবে যদি শিশুর অন্য কোনো মানসিক বা স্নায়বিক সমস্যা থাকে এবং চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করেন, তখন ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। কখনোই নিজের সিদ্ধান্তে শিশুকে ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
অভিভাবকের ধৈর্যই সবচেয়ে বড় ওষুধ
আক্রমণাত্মক আচরণ করা শিশুকে সামলানো সহজ নয়। অনেক সময় অভিভাবক নিজেরাও ভেঙে পড়েন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাগের মুহূর্তে শিশুটি আপনার বিরুদ্ধে লড়ছে না, সে আসলে নিজের অনুভূতির সঙ্গে লড়াই করছে। তাই তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অভিভাবকের সহযোগিতা।
ভালোবাসার সঙ্গে নিয়ম শেখানো, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া—এই তিনটি বিষয়ই শিশুকে ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখতে সাহায্য করে।
আজ যে শিশুটি রাগ সামলাতে পারে না, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে সেই শিশুই একদিন নিজের অনুভূতি সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে শেখে। আর সেই পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হতে পারেন তার বাবা ও মা।




