জেন্টল প্যারেন্টিং কী, এসব পরিবারের শিশুরা কীভাবে বেড়ে ওঠে

রবিউল কমল
রবিউল কমল

বর্তমানে সামাজিকমাধ্যমে বেশ আলোচিত বিষয় হলো জেন্টল প্যারেন্টিং। এটি এমন এক ধরনের আধুনিক শিশু লালন-পালন পদ্ধতি, যেখানে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সম্মান এবং সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। জেন্টল প্যারেন্টসরা শাসন বা জোর করার বদলে সন্তানকে বুঝিয়ে বলেন।

আরও সহজভাবে বললে, এই পদ্ধতিতে বাবা-মা শিশুর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন এবং তাদের ভাবতে শেখান, যেন তারা নিজেরাই ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ শিশুকে ভয় দেখানো বা উপহার দিয়ে নিয়ন্ত্রণের বদলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

একটা উদাহরণ দিই—আগে যদি কোনো শিশু সকালে স্কুলে যেতে দেরি করতো, তাহলে মা-বাবা হয়তো বলতেন, ‘তাড়াতাড়ি করো! দেরি হয়ে যাবে!’

কিন্তু জেন্টল প্যারেন্টসরা ভাবেন, শিশু দেরি করছে কেন? সে কি খেলায় মগ্ন? নাকি বাসা থেকে যেতে ভালো লাগছে না? নাকি স্কুলে কোনো সমস্যা আছে?

এই কারণগুলো জানার পর তারা বলেন, ‘আমি জানি, তোমার খেলতে ভালো লাগছে। তবে এখন এগুলো রেখে চলো স্কুলে যাই। স্কুল থেকে ফিরেই আবার খেলতে পারবে।’

এজন্য জেন্টল প্যারেন্টিংকে অনেক সময় ‘রেসপেক্টফুল প্যারেন্টিং’, ‘কনশাস প্যারেন্টিং’, ‘মাইন্ডফুল প্যারেন্টিং’ বা ‘ইনটেনশনাল প্যারেন্টিং’ বলা হয়।

যদিও সামাজিকমাধ্যমে অনেক সময় এই পদ্ধতি নিয়ে মজা বা সমালোচনা করা হয়। তবুও এটা সত্য যে, এই ধারণাগুলো সন্তান পালনের ধরণ বদলে দিয়েছে।

gentle parenting
জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের সুবিধা হলো, যখন বাবা-মা ভালোভাবে গাইডলাইন ও সহায়তা দেন, তখন শিশুরা নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস পায়। ছবি: সংগৃহীত

জেন্টল প্যারেন্টিং কীভাবে কাজ করে

টুডে.কমের প্রতিবেদনে বলা হয়, জেন্টল প্যারেন্টিংয়ে বাবা-মাকে কড়া শাসক হিসেবে দেখা হয় না। বরং অভিভাবক ও সন্তানের সম্পর্ককে একটু সমানভাবে দেখা হয়। হ্যাঁ, বাবা-মা সব নিয়ম ঠিক করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তারা শিশুকে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেন এবং তাদের চিন্তা, অনুভূতি ও পছন্দকে গুরুত্ব দেন। এখানে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে সহানুভূতি ও মমতা বেশি ব্যবহার করা হয়।

জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের সুবিধা হলো, যখন বাবা-মা ভালোভাবে গাইডলাইন ও সহায়তা দেন, তখন শিশুরা নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস পায় এবং ধীরে ধীরে নিজের মতো করে পৃথিবীকে সামলাতে শেখে। এই পদ্ধতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল আছে; যেমন—শিশুর প্রশংসা করা, আদেশ না দিয়ে কারণ বুঝিয়ে বলা, খোলামেলা কথা বলার পরিবেশ তৈরি করা। এতে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ভালো হয়।

যদি কোনো শিশু খুব রেগে যায় বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, তাহলে জেন্টল প্যারেন্টসরা একা করে ‘টাইম আউট’ দেওয়ার বদলে পাশে থেকে সাহায্য করে। এতে তারা নিজের অনুভূতি বুঝতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুকে বোঝানো হয়, ‘তুমি যা-ই ভাবো বা করো না কেন, আমি সবসময় তোমার পাশে আছি।’ 
এতে শিশু তার ভয়, দুঃখ বা ভাবনাগুলো নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সাহস পায়।

gentle parenting
যারা খুব কড়া শাসনের মধ্যে বড় হয়েছেন, তাদের জন্য এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়া সহজ নয়। ছবি: সংগৃহীত

কীভাবে জেন্টল প্যারেন্টিং চর্চা করবেন 

বিজনেস ইনসাইডারের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে অনেক বাবা-মা জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। বাবা-মায়েরা মনে করেন, ছোটবেলায় তারা যথেষ্ট সহানুভূতি পাননি। তাই তারা সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, যেখানে ভালোবাসা, সম্মান ও যোগাযোগ থাকবে।

তবে যারা খুব কড়া শাসনের মধ্যে বড় হয়েছেন, তাদের জন্য এই পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়া সহজ নয়। কারণ এখানে ‘টাইম আউট’ বা ‘পুরস্কার দিয়ে খুশি করার’ মতো সহজ নিয়ম কম থাকে। বরং সন্তানের পাশে থেকে বোঝানো, সময় দেওয়া ও আবেগ দিয়ে গাইড করার প্রয়োজন হয়, যা একটু বেশি পরিশ্রমের।

তবে জেন্টল প্যারেন্টিং মানে সবকিছুতে ছাড় দেওয়া নয়। বরং নিজের মতো করে নিয়ম ও সহানুভূতির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

gentle parenting
জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের উদ্দেশ্য হলো, শিশুকে বোঝানে সে একা নয় এবং বাবা-মা হিসেবে আপনারা সবসময় তার পাশে আছেন। ছবি: সংগৃহীত

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, জেন্টল প্যারেন্টিংয়ে শিশুর বয়স ও মানসিক বিকাশের ধাপ বিবেচনায় নিতে হয়। এমনকি নবজাতকের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি শুরু করা যায়। শিশুর কান্নাকে সমস্যা না ভেবে যোগাযোগ হিসেবে দেখা, তার প্রয়োজন দ্রুত বুঝে নেওয়া এবং কাছে নিয়ে শান্ত করা—এসবই এই পদ্ধতির অংশ। এতে শিশু নিজেকে নিরাপদ মনে করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা আরও ভালোভাবে আবেগ বুঝতে শেখে এবং বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়াও বুঝতে পারে।

টডলার বা ছোট শিশু যদি রাগ করে কাউকে আঘাত করে, তখন তাকে শাসন না করে বোঝাতে হবে এবং তার কথা শুনতে হবে। এতে শিশুকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের আবেগকে আমলে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বলা যেতে পারে, ‘আমি বুঝতে পারছি তুমি রেগে গেছো, কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাব না। তুমি ভেবে জানাও।’ এখানে শিশুকে বোঝানো হয় রাগ করা স্বাভাবিক, কিন্তু রাগ করলেই সব ইচ্ছে পূরণ হবে না।

শেষ কথা, জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের উদ্দেশ্য হলো, শিশুকে বোঝানে সে একা নয় এবং বাবা-মা হিসেবে আপনারা সবসময় তার পাশে আছেন।

এখানে শিশুকে বোঝানো হয় রাগ করা স্বাভাবিক, কিন্তু রাগ করলেই সব ইচ্ছে পূরণ হবে না।
এখানে শিশুকে বোঝানো হয় রাগ করা স্বাভাবিক, কিন্তু রাগ করলেই সব ইচ্ছে পূরণ হবে না। ছবি: সংগৃহীত