হামে কেন এত মৃত্যু, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখল বাংলাদেশ। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে ৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ ১২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, এই ১৭ শিশুর মধ্যে ২ শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং বাকি ১৫ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল।

এই ১৫ শিশুর মধ্যে গত রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল এই তথ্য পাওয়ায় তা সর্বশেষ মৃত্যুর পরিসংখ্যানে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হাম উপসর্গে মোট প্রাণহানি ৩১১-তে পৌঁছাল। ২৬ এপ্রিলের পরবর্তী সাত দিন নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যুর হার কম ছিল, দিনে এক থেকে সাত জনের মধ্যে ছিল। তবে রোববার সেই মৃত্যু ১০ এবং গতকাল ১৭ জনে দাঁড়ায়।

মারাত্মক ছোঁয়াচে এই রোগের বিস্তার এবং শিশুমৃত্যু রোধে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চলাকালেই এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সঙ্গে অপুষ্টি এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ধারণা, মে মাসের শেষভাগে বা জুনের শুরুর দিকে সংক্রমণ কমে আসার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও কমবে।

শহরের হাসপাতালগুলো এখনও হামে আক্রান্ত শিশুদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এদের অনেককেই জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে রেফার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে অনেক অভিভাবক আইসিইউ সুবিধার সংকট নিয়ে অভিযোগ করেছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৮৬ শতাংশ শিশুকে এরইমধ্যে টিকা দেওয়া হয়েছে এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে এই সংক্রমণের প্রকোপ কমে আসবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) জানিয়েছে, গতকাল নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, তারা ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের। এর ফলে নিশ্চিত মৃত্যুর মোট সংখ্যা বেড়ে ৫২ জনে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে রেকর্ড করা ১৫ শিশুর সন্দেহভাজন মৃত্যু নিয়ে মোট সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৯। সর্বশেষ মৃতদের মধ্যে ১১ শিশু ঢাকা বিভাগের এবং ৪ শিশু চট্টগ্রাম বিভাগের।

একই সময়ে ১৫৪ শিশু নতুন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হওয়ায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪৬৭। এ ছাড়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক হাজার ৩০২ নতুন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করেছে, যার ফলে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৪১ হাজার ৭৯৩-তে পৌঁছেছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, এখানে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ শিশুরই একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আগে থেকেই কম থাকে, ফলে হামে আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে।

তিনি গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, অনেক হাম রোগীর হৃদ্‌যন্ত্র (হার্ট) বা কিডনির জটিলতা রয়েছে, আবার বড় একটি অংশ তীব্র অপুষ্টি বা নিউমোনিয়ায় ভুগছে।

তিনি আরও যোগ করেন, কিছু উপজেলায় হামের প্রকোপ কমার খবর পাওয়া গেলেও শিশু হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগী আসা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল পর্যন্ত সেখানে ৮৯ হাম রোগী ভর্তি ছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চলায় সংক্রমণের হার ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং সংক্রমণ কমলে মৃত্যুর সংখ্যাও কমবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, হামে মৃত্যুর ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মৃতদের অনেকেরই টিকা নেওয়া ছিল না, তারা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল এবং তাদের অন্যান্য শারীরিক জটিলতা ছিল।

তিনি মনে করেন, বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির সুযোগ দিতে ২০২৪ সালের নির্ধারিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিটি যদি সময়মতো পালন করা হতো, তবে হয়তো এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

তিনি আরও জানান, টিকা দেওয়ার পর শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত চার সপ্তাহ সময় লাগে। তাই মে মাসের শেষ দিকে বা জুনের শুরুতে সংক্রমণের হার কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞও মে মাসের শেষ দিকে সংক্রমণের হার কমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, যে ৩০টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছিল, সেখানে নতুন করে কোনো হামের সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গত ১২ এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরুর পর চারটি সিটি করপোরেশনেও সংক্রমণের হার কমেছে।

গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।

মন্ত্রী বলেন, শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা এখনও সেই সময়সীমায় পৌঁছাইনি। সংক্রমণের বর্তমান ঊর্ধ্বগতি কমতে আরও চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগবে।

মুমূর্ষু হাম রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইসিইউ সংকট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিষয়টি স্বীকার করে নেন। 

তিনি বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেই শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও, যেমন মানিকগঞ্জে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে এবং রাজশাহীতেও আইসিইউ সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।