কলম্বিয়ার নির্বাচনে এআই প্রার্থী ‘গাইতানা’ কে নিয়ে আলোচনা কেন?
গুগলে খোঁজ করলে ‘গাইতানা’ সম্পর্কে তিন ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবে প্রথমে আসে কলম্বিয়ার ষোড়শ শতকের আদিবাসী নেত্রী গাইতানার নাম। তিনি সেই অঞ্চলে স্প্যানিশ উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে কালজয়ী হয়েছেন। তাকে নিয়ে দেশটিতে ভাস্কর্য আছে।
সার্চের দ্বিতীয় ফলাফলে পাওয়া যায় ইউরোভিশন-খ্যাত ইউক্রেনীয় গায়িকা গাইতানার নাম। আফ্রিকা-বংশোদ্ভূত এই গায়িকার ‘বি মাই গেস্ট’ গানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ জনপ্রিয়।
এরপর পাওয়া যায় কলম্বিয়ার আসন্ন আইনসভা নির্বাচনে আলোচিত এআই প্রার্থী ‘গাইতানা’ সম্পর্কিত সংবাদ।
তবে এআই মোডে সার্চ ফলাফলে সবার আগে আসে প্রার্থী ‘গাইতানা’, পরে গায়িকা গাইতানা ও সবশেষে বিপ্লবী আদিবাসী নেত্রী গাইতানা।
এদিকে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সংস্থা এএফপির এক্স অ্যাকাউন্টে এআই প্রার্থী ‘গাইতানা’র নির্বাচনী প্রচারণার একটি ভিডিও পোস্ট করে। এই বট প্রার্থী সম্পর্কে ৫৩ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়।
🇨🇴 AI candidate stands in legislative elections
An artificial intelligence bot is running in the 8 March legislative elections in Colombia. Called “Gaitana,” it is aiming for one of the seats reserved for Indigenous communities. pic.twitter.com/s0weDIvLOX— AFP News Agency (@AFP) February 21, 2026
সেই ভিডিও থেকে জানা যায়—আগামী ৮ মার্চ দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আইনসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ‘গাইতানা’ নামের এআই প্রার্থী সেখানকার আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত এক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
সমাজমাধ্যমে এএফপির প্রকাশিত ‘আইনসভা নির্বাচনে এআই প্রার্থী’ শিরোনামের সেই ভিডিও ক্লিপে আরও বলা হয়—এই বটকে সাজানো হয়েছে এক নীল-রঙা নারীর অবয়বে। তার মুখের ভাষা কৃত্রিমভাবে তৈরি। কলম্বিয়ার আইনসভায় আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত এক আসনে এই প্রার্থী নির্বাচন করছে।
দেশটির প্রচলিত আইন অনুসারে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একজন মানুষকে নিবন্ধন করতে হবে। তাই ‘গাইতানা’ ডিজিটাল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু, ব্যালটে এর নাম থাকবে ‘এআই’ হিসেবে।
ভিডিওটিতে ‘গাইতানা’ নিজেকে ‘পরিবেশবাদী’ ও ‘প্রাণী অধিকাররক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
প্রকল্পটির কারিগর বলছেন—১০ হাজারের বেশি অনলাইন ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে বটটির মতামত সাজানো হয়েছে।
‘গাইতানা’র নির্বাচনী প্রচারণায় ‘ডিজিটাল গণতন্ত্রের’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। আইন পরিষদে নিজের প্রস্তাবগুলো তুলে ধরার আগে এই বট অনলাইনে প্রস্তাবগুলো জনমত যাচাইয়ের জন্য তুলে ধরতে চায়।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কভিত্তিক এবিসি নিউজের এক ভিডিও প্রতিবেদনে কলম্বিয়ার রাজনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গণতান্ত্রিক ব্যবহারের পাশাপাশি এর আইনি অস্পষ্টতা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
ভিডিওটিতে সঞ্চালক অ্যালেক্স প্রেশা জানান—‘গাইতানা’ নিজেকে ‘পরিবেশবাদী’ ও ‘প্রাণী অধিকাররক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দিলেও, এ নিয়ে একটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর তা হলো—ওর তো কোনো বাস্তবিক অস্তিত্বই নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বট ‘গাইতানা’ কলম্বিয়ায় সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দুনিয়াজুড়ে এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মানবসমাজে এআইয়ের অবস্থান ও ব্যবহার নিয়েই এই বিতর্ক।
এ বিষয়ে নিউইয়র্কভিত্তিক এবিসি নিউজের প্রদায়ক ও সিরিয়াসএক্মএম রেডিওর উপস্থাপক মাইক মিউজের মন্তব্য: ‘ভবিষ্যৎ এখনই দেখতে পাচ্ছি।’
তিনি মনে করেন, ‘উদ্ভাবনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শাসনব্যবস্থাকেও এগিয়ে যেতে হবে।’
একে একটি ‘মুখরোচক’ আলোচনা বা ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করে মাইক আরও বলেন—‘যদি বিষয়টি নিয়ে তত্ত্বগতভাবে কথা বলতে হয় তাহলে বলবো—এটা সম্ভব। কারণ নিয়মকানুন বলছে মানুষই প্রযুক্তি পরিচালনায় কাজ করবে।’
‘এই প্রযুক্তির পেছনে কারিগর হিসেবে একজন মানুষ কাজ করছেন। ভোটও দেবেন মানুষজন। এখন দেখার বিষয় এতসব বিতর্ক বা আলোচনার মধ্য দিয়ে এটি কেমন কাজ করে।’
মাইক মনে করেন, তত্ত্বগতভাবে প্রযুক্তিবিদরা গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছেন। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা মানুষের ভাবনাগুলো জানবেন এবং সেই অনুসারে কাজ করবেন। এআইয়ের কথাগুলো আসলে মানুষেরই কথা। তাদের সম্মিলিত চিন্তাভাবনা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে কাজে লাগানো হবে।
অনেকে মনে করেন, রাজনীতিবিদ হিসেবে এআই ভালোকিছু হবে। এআইয়ের বেতন দরকার হবে না। এআই দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারবে। তবে অ্যালেক্স প্রেশারের প্রশ্ন—প্রযুক্তির বাজারে এসব যুক্তির কোনো মূল্য আছে কি?
এ বিষয়ে মাইক মিউজের জবাব—‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দুটিই। তিনি বলেন যে এসব যুক্তির শেকড় খুঁজতে হবে। এসব নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও আসলে এআইকে দিয়ে কতটা কাজ করানো যাবে এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এআইয়ের ‘ভালো’ ও ‘মন্দ’—দুটি দিকই আলোচনায় আছে। এআইকে আইনি প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো যেতে পারে। অনেক তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন নতুন আইন তৈরির কাজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনেকে মনে করেন যে, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নত দেশ থেকে শুরু হওয়া দরকার। কলম্বিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশে আইন প্রণয়নের মতো জটিল কাজে এআইয়ের এমন ব্যবহারের কথা শুনে অনেকে অবাক। আর তাই যেন ‘গাইতানা’কে নিয়ে বিশ্বজুড়ে এতো আলোচনা।




