কম খরচের ড্রোন দিয়ে ইরান যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে
ইরানে গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বিমান হামলা শুরুর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি ‘ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। তবে তিনি ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানের কথা উল্লেখ করেননি।
কিন্তু গত ছয় দিনে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কম খরচে তৈরি দুই হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সামরিক হামলার বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে ইরান।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেসব চিত্র।
শাহেদ ড্রোন
হামলায় ইরান মূলত ‘কামিকাজে’ শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করছে। এ ধরনের ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে শাহেদ ড্রোনের হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। যা এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর ওপর চালানো সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।
এছাড়া বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, দুবাইয়ের বিলাসবহুল পাম জুমেইরাহ হোটেল ও বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তরেও আঘাত হেনেছে শাহেদ ড্রোন।
জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত
এই ড্রোন হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
সৌদি আরবের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত দেশটির বৃহত্তম তেল শোধনাগার রাস তানুরায় চালানো একটি ড্রোন হামলা প্রতিহত করলেও অগ্নিকাণ্ডের ফলে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একইভাবে কাতারে বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি টার্মিনালটিও ইরানি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
ইরানে তৈরি সাড়ে ৩ মিটার লম্বা এই শাহেদ-১৩৬ ড্রোনগুলোর নির্মাণ খরচ বেশ সস্তা। এর প্রতিটির খরচ মাত্র ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার। এগুলো ওড়ানোর আগে স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গতিপথ ঠিক করে দেওয়া হয়। দূর থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
প্রপেলার ইঞ্জিনের সহায়তায় ওড়ে ড্রোনটি। এটি ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। ড্রোনগুলোর সামনের নাকের মতো অংশে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব, যা ৫০০ কেজির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে অনেক কম হলেও লক্ষ্যবস্তুর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করতে সক্ষম।
ড্রোনগুলো খুব দ্রুত গতির না হলেও অনেক নিচু দিয়ে উড়তে পারে। ফলে রাডার বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকারী ব্যবস্থার পক্ষে একে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ইরানের রণকৌশল
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ড্রোন ব্যবহারের পেছনে ইরানের কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ নিকোলাস কার্লের মতে, ইরান এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ‘মানসিক চাপ ও আতঙ্ক’ সৃষ্টি করতে চায় যেন তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বাধ্য হয়।
জিপিএস জ্যামিং ডিভাইস ও লেজার অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে এ ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করা যায়।
এছাড়া ইরান চায়, শত্রুরা যেন ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে নিজেদের দামি ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ শেষ করে ফেলে। যেমন, শাহেদের মতো একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে অনেক সময় প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ডলার অর্থমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইক মুলরয় বিবিসিকে জানান, এ ধরনের ড্রোনগুলো বিভিন্ন যুদ্ধে এত বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে যে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন নিজেদের উন্নত সংস্করণের ড্রোন তৈরি করেছে। ‘লুকাস’ নামের একটি ড্রোন তারা ইতোমধ্যে ব্যবহার শুরু করেছে।
এদিকে, মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপের মুখে ইরানের ড্রোন হামলার হার বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনের তুলনায় ড্রোন হামলার পরিমাণ ৮৩ শতাংশ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমেছে।
অবশ্য গত সোমবার ইরানের ফারস বার্তা সংস্থার এক ভিডিওতে দেখা যায়, দেশটির কোনো এক অজানা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সারি সারি এমন ড্রোনের মজুদ দেখা গেছে।
তবে ইরান কতদিন এই হামলা চালিয়ে যেতে পারবে তা এখনো অনিশ্চিত।