ম্যাপ, চার্ট ও ছবিতে ইরান সংকট

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজিরবিহীন সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে নতুন এক সংঘাত। এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরানের ক্ষমতা কাঠামো, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাজার, সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এই হামলার বিস্তার, এর কৌশলগত প্রভাব এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে রয়টার্স।

ইরানের যেসব স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের ওপর সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা চালায়। এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।

এই পদক্ষেপকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতিগত ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ পুনর্নির্বাচনের প্রচারণায় তিনি নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন এবং ইরানের সঙ্গে অচলাবস্থার কূটনৈতিক সমাধান চান বলে জানিয়েছিলেন।

শনিবার ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে, যার মধ্যে ছিল টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় ইরানি নকশা অনুসরণে তৈরি কম খরচের একমুখী আক্রমণ ড্রোন।

ইরান এই হামলাকে উসকানিহীন ও অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে এবং পাল্টা আঘাত হিসেবে ইসরায়েলসহ অন্তত সাতটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব দেশের মধ্যে উপসাগরীয় কয়েকটি রাষ্ট্র রয়েছে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে।

ছবি: রয়টার্স

ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর ওপর হামলা

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে ইরানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।

ইসরায়েল জানিয়েছে, হামলায় ইরানের সামরিক নেতৃত্বের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও নিহত হয়েছেন।

গত দুই বছরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের প্রভাবশালী প্রক্সি বাহিনীগুলোও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, তিনি নিজে, বিচার বিভাগের প্রধান এবং শক্তিশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এক সদস্যকে নিয়ে গঠিত একটি নেতৃত্ব পরিষদ সাময়িকভাবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করছে।

নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ভেঙে দিতে চেষ্টা চলানোর অভিযোগ তোলেন এবং সতর্ক করে বলেন, ‘কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী পদক্ষেপ নিলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

ছবি: রয়টার্স

ইরানের ক্ষমতা কাঠামো

খামেনিকে হত্যার পর এই সামরিক অভিযান অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তন করে দিতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাই এ বিষয়ে সন্দিহান।

খামেনি নিহত হলে এর প্রভাব কী হতে পারে, এ নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আলোচনা শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়।

কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিতর্ক চলছে যে, খামেনির মৃত্যু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনবে কিনা।

তারা আরও বলেন, খামেনির মৃত্যু বা অপসারণ ইরানকে আবার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলা থেকে কতটা বিরত রাখতে পারে, এ বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি: তেল পরিবহনের সরুপথ

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ায় উপসাগরীয় জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন সরুপথে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় হামলার পর এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ইরানের সক্ষমতা বাজারকে অস্থির করে তুলেছে এবং বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

তেলের দাম ইতোমধ্যে দ্রুত বেড়েছে এবং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বাজারে উদ্বেগের কারণে দাম আরও কিছুদিন বেশি থাকবে।

গত বছর গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, কনডেনসেট ও জ্বালানি এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।

সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাক তাদের অধিকাংশ তেল এই পথ দিয়ে রপ্তানি করে, প্রধানত এশিয়ায়।

বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি রপ্তানিকারক কাতারও প্রায় সব গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পাঠায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের হামলায় কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইরান ও ওমানের মাঝের এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ছবি: রয়টার্স

ইরানে হামলা সমর্থন করেন মাত্র চারজনের একজন মার্কিন নাগরিক

এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানে হামলার পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।

৪৩ শতাংশ এই হামলার বিরোধিতা করেছেন এবং ২৯ শতাংশ নিশ্চিত নন।

দলীয় বিভাজনও স্পষ্ট: রিপাবলিকানদের ৫৫ শতাংশ হামলাকে সমর্থন করলেও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমর্থন মাত্র ৭ শতাংশ।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহারে অতিরিক্ত আগ্রহী।

ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল ব্যাহত

ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বড় বিমানবন্দরগুলো বন্ধ বা সীমিতভাবে চালু থাকায় আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

দুবাই, আবুধাবি ও দোহা, এই গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট বিমানবন্দরগুলোও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।

হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েছেন বালি, কাঠমান্ডু ও ফ্রাঙ্কফুর্ট পর্যন্ত বিভিন্ন শহরে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইটঅ্যাওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে এবং ইরান, ইরাক, কুয়েত, ইসরায়েল, বাহরাইন, আরব আমিরাত ও কাতারের আকাশসীমা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে।

ছবি: রয়টার্স

স্যাটেলাইট ছবিতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ক্ষয়ক্ষতি

বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ছবি: রয়টার্স

এ ছাড়া, ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনাতেও হামলার চিহ্ন দেখা গেছে।

নাতাঞ্জের ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার প্রবেশপথে দুটি হামলার চিহ্ন শনাক্ত হয়েছে।

ছবি: রয়টার্স

এই স্থাপনাটি ৫০ হাজার সেন্ট্রিফিউজ ধারণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ

মেরিনট্রাফিকের জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি এই পথ দিয়ে যায়।

ডেটা অনুযায়ী, অন্তত ২০০টি জাহাজ প্রণালির বাইরে অপেক্ষা করছে এবং বন্দরে পৌঁছাতে পারছে না।

ছবি: রয়টার্স

ইরান সীমান্তে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী

ইরানি কুর্দি মিলিশিয়ারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে।

ইরান-ইরাক সীমান্তে অবস্থান নেওয়া এসব গোষ্ঠী এমন অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রবিহীন জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি কুর্দিরা, সংখ্যা প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি।

তারা ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে।

ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে।

ফলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম বেড়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বহু নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং ‘প্রায় সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’

ছবি: রয়টার্স

লেবাননে গণ-উচ্ছেদের নির্দেশ ও বৈরুতে বোমাবর্ষণ

ইসরায়েল লেবাননের বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।

ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

হামলার আগে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো খালি করার নির্দেশ দেয় ইসরায়েল।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, ‘এমন গণ-উচ্ছেদ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।’

ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে উদ্বেগ

ইরানের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম বেড়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।

জাপানের নিক্কেই সূচকও ৬ শতাংশ কমেছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের শীর্ষ তেল আমদানিকারকদের মধ্যে অন্যতম এবং তাদের তেলের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।