যে কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে যাচ্ছে মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ড
মার্কিন নৌবহরের অত্যাধুনিক রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ড মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করে রেখেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিমান বহন ও দ্রুত হামলায় সক্ষম এই রণতরি গত কয়েক মাসে অনেক ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে গেছে।
এক রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষতি হয় এই রণতরি। তাই এটি এখন মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যাচ্ছে।
আজ বুধবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম গার্ডিয়ান এই তথ্য জানিয়েছে।
আগুনে ব্যাপক ক্ষতি
আগুনে নাবিকরা আহত হয়েছেন। প্রায় ১০০টি বিছানা পুড়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় রণতরিতে এ ধরনের দুর্ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
প্রায় নয় মাস টানা এক মহাসাগর থেকে আরেক মহাসাগরে ঘুরছে জেরাল্ড আর ফোর্ড। ইরান যুদ্ধে সহযোগিতা করতে লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকা জাহাজটি শিগগির গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে।
মূলত মেরামতের জন্যই এই ক্রিটে যাওয়া। এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, দীর্ঘসময় টানা সাগরে মোতায়েন থাকায় জাহাজের নাবিকদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি, জাহাজটির ‘যুদ্ধ প্রস্তুতিও’ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন।
প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে তৈরি রণতরিটি কতদিন ক্রিটে থাকবে, তা জানাননি কর্মকর্তারা।
এক কর্মকর্তার ভাষ্য: জাহাজের কাপড় ধোয়ার লন্ড্রি থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া ২০০ নাবিককে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছিল। প্রায় ১০০টি বিছানা পুড়ে যায়।
কর্মকর্তা জানান, গুরুতর আহত এক ক্রুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ওই গুরুতর আহত ক্রুর বিষয়ে জানতে সংবাদ সংস্থাটির পক্ষ থেকে পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) বরাত দিয়ে জানান, দুই নাবিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে তাদের অবস্থা আশংকাজনক ছিল না।
আগুনের খবর প্রকাশের পর প্রাথমিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, জাহাজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
টয়লেট ব্যবস্থায় ক্ষয়ক্ষতি
একাধিক মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগুনে জাহাজের টয়লেট ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেকগুলো টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
এ কারণে জেরাল্ড আর ফোর্ডের চার হাজারেরও বেশি নাবিক নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
কার্যকর আছে এমন টয়লেটের সামনে নাবিকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে বলেও কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এর আগে, মার্কিন সরকারের জবাবদিহি কার্যালয় ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, জাহাজটির টয়লেট ব্যবস্থা ‘অপ্রত্যাশিতভাবে এবং প্রায়ই অকেজো হয়ে পড়েছে’। আটকে থাকা মানব-বর্জ্য পরিষ্কার করতে নিয়মিত এসিড ফ্লাশের ব্যবস্থা করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রতি দফায় চার লাখ ডলার খরচ পড়ে।
গত ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে মার্কিন নৌবাহিনী টয়লেট সমস্যার বিষয়টি মেনে নেয়। তবে তারা দাবি করে, ‘টয়লেট অকেজো হয়ে পড়লে প্রশিক্ষিত কর্মীরা নূন্যতম সময়ে তা মেরামত করে নেন।’
মনোবল ভেঙে পড়েছে ক্রুদের
সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও ডেমোক্র্যাট নেতা মার্ক ওয়ার্নার গত মঙ্গলবার এত দীর্ঘ সময় ধরে এই রণতরিটিকে সক্রিয় অভিযানে ব্যস্ত রাখার কড়া সমালোচনা করেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘প্রায় এক বছর সাগরে মোতায়েন রেখে (জেরাল্ড আর) ফোর্ড ও এর ক্রুদের সহ্যক্ষমতা শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লাগামছাড়া সামরিক সিদ্ধান্তের বলি হয়েছেন তারা।’
বড় ঘাটতির আশংকা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড রুডলফ ফোর্ড জুনিয়রের প্রতি সম্মান জানিয়ে ওই রণতরির নামকরণ করা হয়েছে। রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের পর ফোর্ড ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত দেশটির শীর্ষ ক্ষমতায় ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই রণতরি সরে গেলে তা মার্কিন বাহিনীর শক্তিমত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
গত ১৯ দিনের যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যেসব যুদ্ধবিমান ব্যবহার হয়েছে, এর অনেকগুলোই এই রণতরি থেকেই পরিচালনা করা হয়েছিল।
তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এক সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়—শিগগির অপর একটি রণতরি জেরাল্ড ফোর্ডের জায়গায় মোতায়েন করা হবে। সম্ভবত এটি হতে যাচ্ছে ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ।
ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের জন্য জাহাজটিকে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানের সাত হাজারেরও বেশি জায়গায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ডে ৭৫টির বেশি যুদ্ধবিমান আছে। এর মধ্যে আছে অত্যাধুনিক এফ-১৮ সুপার হরনেট। এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও গতিপথ নির্ধারণের জন্য এতে যুক্ত আছে অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থাও।
ইরানে সামরিক অভিযানের আগে ওই রণতরি ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন অভিযানে অংশ নিয়েছিল। সেখানে মাদক পাচারের অভিযোগে একাধিক নৌকা ও তেলের ট্যাংকারে হামলা চালানো হয় এই রণতরিটি থেকে।
পাশাপাশি, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকেও অপহরণের কাজে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ব্যবহার করা হয়েছিল।




