এক নজরে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোট
সময়ের আবর্তে পশ্চিমবঙ্গে আবারও ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরপরই ভোটের বাদ্য বাজতে শুরু করে। তবে রাজ্যটিতে ভোট উৎসব শুরু হয়েছে ‘অসমাপ্ত ভোটার তালিকার কাঁটা’ নিয়েই।
এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে বিশ্লেষকরা ‘বহুল আলোচিত’ বলছেন। কেননা, ২০১১ সালে রাজ্যটির ৩৪ বছরের শাসক বামফ্রন্টকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সেই থেকে দলটি এখনো ক্ষমতায়।
দলপ্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশা, আগামী নির্বাচনে তারা বিজয়ী হয়ে রাজ্য-সরকার গঠন করবে।
অন্যদিকে, রাজ্যে প্রধান বিরোধী ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি চাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের পরিবর্তন। দলের নেতারা পরিবর্তন ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ভোট ও ফল প্রকাশ কবে?
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ২৩ এপ্রিল। ভোট হবে ২ দফায়। পরের দফা ভোট ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ করা হবে আগামী ৪ মে।
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় তথা ২৩ এপ্রিল ভোট হবে ১৫২ আসনে এবং দ্বিতীয় দফা তথা ২৯ এপ্রিল ভোট হবে ১৪২ আসনে। দুই দফায় মোট ২৯৪ আসনে ভোট হবে।
এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দুই দফায় ও এক সপ্তাহের মধ্যেই ভোট হতে যাচ্ছে।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৮ দফায় বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল। সেবছর ২৭ মার্চ ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে তা চলেছিল ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত।
সেই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে ভোট হয়েছিল ২৯২ আসনে। দুটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় ভোট পরে নেওয়া হয়।
২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভায় পেয়েছিল ২১৫ আসন ও বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি।
রাজ্যটিতে সরকার গঠনে প্রয়োজন হয় ১৪৮ আসন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগামী এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, তামিলনাড়ু ও কেরালা রাজ্যে এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে (সাবেক পন্ডিচেরি) বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে।
আরও জানা যায়—আগামী ৯ এপ্রিল আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে এক দফায় নির্বাচনের আয়োজন করা হবে এবং ৪ মে সেসব নির্বাচনের ভোটগণনার পর ফল ঘোষণা করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গ যে কারণে আলোচনায়
আরও ৩ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও সব নজর যেন পশ্চিমবঙ্গের ওপর। বিশেষ করে, সেই রাজ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করলেও ভোটার তালিকায় নাম না থাকা বেশ কয়েক লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ-ই সব মহল্লায় আলোচনার প্রধান বিষয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে—গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের নির্বাচন কমিশন ‘চূড়ান্ত’ ভোটার তালিকা প্রকাশ করলে দেখা যায় বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ জন।
গত ২৭ মার্চ দৈনিক আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের আগে মোট ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন।
এতে আরও জানানো হয়—সব মিলিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন।
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য: বাদ পড়াদের মধ্যে আছেন মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ভোটার, ভুয়া ভোটার ইত্যাদি।
তবে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে—সরকারি কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষকে নির্বাচন কমিশনের ‘বাদের তালিকা’ দেখা যাচ্ছে। অনেকের দাবি—প্রয়োজনীয় সব নথি হাতে থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম বাদ পড়েছে। তালিকায় নাম না থাকায় ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনকে দুষছেন।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য: পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা ভারতের পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে বড় শহর হওয়ায় সেখানে কাজের জন্য অনেকে আশে-পাশের রাজ্যগুলো থেকে আসেন। এক সময় তারা সেই শহর ও এর আশেপাশের জেলাগুলোয় বসতি করেন। আবার বৈবাহিক কারণে অনেকের পদবি বদলে যায়।
কিন্তু, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির কাজ নির্বাচন কমিশনের। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ঠিক আগেও ভোটার তালিকা কমিশনের গলায় ‘কাঁটা’ হয়ে আছে।
আবার প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকহারে ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটার অভিযোগ নিয়ে রাজনীতিতে বেশ সরব আছে বিজেপি। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার থাকায় ভোটারদের অনেকে তাদের নাম কাটা পড়ার জন্য বিজেপিকে দায়ী মনে করছেন।
এ দিকে, তৃণমূল নেতৃত্ব ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের নাগরিক অধিকার নিয়ে সরব।
ভোটার সমীকরণ?
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আজতক বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—গত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ৩৬ আসনে তৃণমূলের প্রার্থীদের কাছে বিজেপির প্রার্থীরা ৫ হাজারেরও কম ভোটে হেরেছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে সেই আসনগুলো রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপির জন্য চিন্তার বিষয়। সেসব আসনে ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের একটি অংশকে বাদ দিতে পারলে তা বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে বলে অভিযোগ রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল নেতাদের।
অন্যদিকে, রাজ্যে বিরোধী বিজেপির অভিযোগ—ভোটার নয় এমন ব্যক্তিদের ভোটে তৃণমূল বারবার বিজয়ী হচ্ছে।
বিশ্লেষক থেকে সাধারণ ভোটারদের অনেকে মনে করছেন—নির্বাচন কমিশন যদি এভাবে লাখ লাখ প্রকৃত ভোটারকেও ‘ভুয়া’ বলে বাতিল করে দেয় তাহলে সেই হিসাব ভোটের বাক্সে প্রবলভাবে পড়ার আশঙ্কা আছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—‘রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্লোজ কনটেস্ট আসনগুলি আগামী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামান্য ভোটের ওঠানামাই জয়-পরাজয়ের সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে।’
হুমায়ুনের ‘হুইসেল’
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে মাঠে নামছে মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর কেন্দ্রের বিধানসভা সদস্য বা বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন আম জনতা উন্নয়ন পার্টি।
গত বছর ৬ ডিসেম্বর মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে ‘বাবরি মসজিদ’ নামে নতুন একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে তিনি রাজ্যজুড়ে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন।
সর্বশেষ, তৃণমূলের হয়ে বিধায়ক হন হুমায়ুন। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর গত বছর ২২ ডিসেম্বর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গড়েন নিজের দল। আসন্ন নির্বাচনে হুমায়ুনের দল পেয়েছে ‘হুইসেল’ প্রতীক।
হুমায়ুন জোট বেঁধেছেন হায়দ্রাবাদের লোকসভা সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও তার দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের সঙ্গে।
গত ২৫ মার্চ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময় এক প্রতিবেদনে জানায়—আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সভাপতি হুমায়ুন কবির আসন্ন নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৯২ আসনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। তার জোটসঙ্গী ওয়াইসির দল প্রার্থী দেবে ১০ আসনে।
সংবাদমাধ্যমটিকে তিনি বলেন যে, তার দল আগামী নির্বাচনে ‘সরকার গড়বে’।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন—হুমায়ুন কবির মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোয় প্রার্থী দিয়েছেন। মূলত মুসলমানদের ভোট পাওয়ার আশায়। অনেকে তাকে বিজেপির ‘সহযোগী’ হিসেবে গণ্য করছেন।
কারও কারও মতে, সংখ্যালঘু মুসলমানরা বিভক্ত হয়ে গেলে সেই সুবিধা পাবে বিজেপি। ধারণা করা হয় যে, মুসলমানদের ভোটে বাড়তি সুবিধা পেয়ে তৃণমূল বারবার সরকার গঠন করছে।
তথ্য অনুসারে, গত নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৮ শতাংশের মতো ভোট। বিজেপি পেয়েছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ।
এমন বাস্তবতায় হুমায়ুনের দল যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক মুসলমানদের ভোট পায়, তাহলে তৃণমূলের ভোটবাক্সে মুসলিম ভোটের সংখ্যা কমে যাবে। আর বিজেপি যদি সামান্য সংখ্যক হিন্দু ভোট টানতে পারে, তাহলে তৃণমূলকে স্বল্প ব্যবধানে হলেও হারানো সম্ভব।
তাই হুমায়ুনের ‘হুইসেল’ আসন্ন ভোটের হিসাবে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, বলেও মনে করছেন অনেকে।
তবে সবকিছু পরিষ্কার হবে আগামী ৪ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর।




