যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার অগ্রগতি কতটুকু, বাধা কী

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে ৬ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে এখন যুদ্ধবিরতি চলছে। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার মাধ্যমে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে একমত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হতে যাচ্ছে এর মেয়াদ।

আর যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসাতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে পাকিস্তান। এরই ধারাবাহিকতায় ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সফরে ব্যস্ত দেশটির বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব।

পাকিস্তান
ছবি: স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বর্তমানে রিয়াদ, দোহা ও ইস্তাম্বুল সফর করছেন। অন্যদিকে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফর করছেন। পুরো বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে ব্রিফ করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

আজ বৃহস্পতিবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স, পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য এ পর্যন্ত কী কী করেছে পাকিস্তান, অগ্রগতি কতটা এবং সামনে কী বড় বাধা রয়েছে।

শেহবাজ শরিফের সফর

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফর করছেন। সৌদি আরব সফর শেষ করে আজ বৃহস্পতিবার তিনি কাতারের দোহায় পৌঁছান।

ইতোমধ্যে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি’র সঙ্গে বৈঠকও করেছেন শেহবাজ শরিফ। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘আজ দোহায় আমার প্রিয় ভাই, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি’র সঙ্গে অত্যন্ত উষ্ণ ও আন্তরিক বৈঠক হয়েছে।’

বৈঠকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে গতকাল বুধবার জেদ্দায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শেহবাজ শরিফ। তার পরবর্তী সফর তুরস্কে।

আসিম মুনিরের সফর

গতকাল বুধবার তেহরানে পৌঁছান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছেন।

ইরানি সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, আলোচনা পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে গঠিত একটি প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে তিনি ইরানে গেছেন। আসিম মুনিরকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘পছন্দের’ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

আজ বৃহস্পতিবার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

 ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
 ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের সেনা প্রধান আসিফ মুনির। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে যেন সংঘাত শুরু না হয় এজন্যই তেহরান সফর করছেন আসিফ মুনির।

তার এই সফরের পর দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনা ও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আশা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

চূড়ান্ত হয়নি আলোচনার তারিখ

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি আজ বৃহস্পতিবার নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনার সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

উভয় পক্ষ আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য এখনো কোনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। উত্তেজনা প্রশমন, যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখছে ইসলামাবাদ এবং অর্থবহ আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার অন্যতম বিষয় পরমাণু ইস্যু বলে উল্লেখ করেন তিনি। আলোচনার সঙ্গে জড়িত কোনো পক্ষের অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। বলেন, ‘এটি আমাদের ওপর সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আস্থার বিষয়।’

এ সময় তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোকে এ বিষয়ে জল্পনা-কল্পনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

দ্বিতীয় দফার আলোচনা প্রসঙ্গে আনদ্রাবি বলেন, ‘আলোচনা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের আস্থা ও গোপনীয়তার সাথে চলমান। আলোচনার বিষয়বস্তু গোপন রাখা আমাদের জন্য অপরিহার্য। পরবর্তী দফার সংলাপে কারা আসবেন, প্রতিনিধি দল কত বড় হবে, কে থাকবেন আর কে চলে যাবেন—তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোই ঠিক করবে। আলোচনার বিস্তারিত তথ্য আমাদের কাছে আমানত হিসেবে রাখা হয়েছে।’

আশাবাদ বাড়ছে

একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কিছু জটিল ইস্যুতে অগ্রগতি হওয়ায় ইরান যুদ্ধের অবসান ঘিরে আশাবাদ বাড়ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, পরবর্তী দুদিনের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে এবং তারা আবারও পাকিস্তানে যেতে আগ্রহী।

ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী।’

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার চেষ্টাকে তিনি ‘গঠনমূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনুরোধ করেছে—এমন খবর অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি বলেছেন, আলোচনা সফল হতে হলে ইরানের অধিকার, স্বার্থ ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অবিশ্বাসের ধারাবাহিকতা থাকলে আলোচনা সফল হওয়া কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

বাধা ও চাপ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার জায়গা হলো পারমাণবিক কর্মসূচি, এ নিয়ে বিরোধ এখনো মীমাংসা হয়নি।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ছবি সংগৃহীত
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে, ইরানকে ২০ বছরের জন্য সব পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার। অন্যদিকে তেহরান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র চায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হোক, আর ইরান চায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক।

একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কমাতে রাজি হয়েছে ইরান। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

যুদ্ধের কারণে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অন্য দেশের জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানি কমে গেছে। পাল্টা চাপ বাড়াতে ইরানের বন্দরে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি। ছবি: বিবিসি

ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে বাণিজ্য চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

তবে আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান প্রস্তাব দিয়েছে, চুক্তি হলে ওমান অংশ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা যেতে পারে—যা সম্ভাব্য সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।