মাদুরোকে আটকে যুক্তরাষ্ট্রের আড়াই ঘণ্টার গোপন অভিযানের আদ্যোপান্ত

By স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযান চালায়, সেটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

এই অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছিল 'অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ'। নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে এই অভিযানের প্রস্তুতি, বাস্তবায়ন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত তুলে ধরেছে।

অভিযানের আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ মাসের পর মাস ধরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মাদুরোর দৈনন্দিন গতিবিধির ওপর নজরদারি করে। মাদুরোর ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির কাছ থেকে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে এবং আকাশে গোপনে উড়ে বেড়ানো স্টেলথ ড্রোনের মাধ্যমেও চলে নজরদারি।

এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মাদুরোর প্রতিদিনের জীবনের সূক্ষ্ম বিবরণ ম্যাপিং করে সিআইএ।

অভিযান চলাকালে দেশটিতে বন্ধ ছিল মার্কিন দূতাবাস। ফলে, সিআইএ কর্মকর্তাদের কোনো কূটনৈতিক সহায়তা ছাড়াই কাজ করতে হয়।

মার্কিন সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র জানত যে মাদুরো কোথায় যান, কী খান, এমনকি তার কাছে কী ধরনের পোষা প্রাণী রয়েছে।

শনিবার ভোররাতে এলিট আর্মি ডেল্টা ফোর্স কমান্ডোরা অভিযান শুরু করে।

২০১১ সালে পাকিস্তানে নেভি সিল টিম সিক্সের অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর এটিকেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কিন সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অভিযানের আগে ডেল্টা ফোর্স কমান্ডোরা কেন্টাকিতে নির্মিত মাদুরোর কম্পাউন্ডের পূর্ণাঙ্গ মডেলে মহড়া করে। ইস্পাত দরজা ভেঙে কীভাবে দ্রুত মাদুরোর কাছে পৌঁছাতে হবে, সেই মহড়াও চালিয়েছে বারবার।

us-1.jpg
মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভিজাত ইউনিট ডেল্টা ফোর্সকে উচ্চঝুঁকির অভিযানে পাঠানো হয়। ছবি: সংগৃহীত

বেসামরিক নাগরিকরা যেন হতাহতের কম ঝুঁকিতে থাকেন সেজন্য অভিযানের আগে সঠিক সময় ও আবহাওয়ার অপেক্ষায় ছিল সামরিক বাহিনী।

শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অভিযানটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এ সময় নির্দিষ্ট কিছু আকাশযান উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়।

তবে এরপরের ছয় ঘণ্টা আবহাওয়া ও মাদুরোর অবস্থানসহ মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরো ছয় থেকে আটটি স্থানে ঘোরাফেরা করতেন। প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হতে পারত না যে তিনি এখন ঠিক কোথায় আছেন। ফলে এই অভিযান শুরুর আগে মাদুরোর অবস্থান নিশ্চিত করাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অভিযানের আগের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ যুদ্ধবিমান, সশস্ত্র রিপার ড্রোন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার হেলিকপ্টার মোতায়েন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এত প্রস্তুতির পর অভিযান হওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। কেবল প্রশ্ন ছিল, কবে হবে।

মাদুরোর ওপর চাপ বাড়াতে এক সপ্তাহ আগে সিআইএ ভেনেজুয়েলার একটি বন্দরে ড্রোন হামলা চালায়। পাশাপাশি কয়েক মাস ধরে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ডজনখানেক নৌকা ধ্বংস করে। এতে অন্তত ১১৫ জন নিহত হন।

শনিবার ভোরে সাইবার অভিযানের মাধ্যমে কারাকাসের বড় অংশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়—যাতে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার অদৃশ্যভাবে এগোতে পারে। এই মিশনে ২০টি ভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ থেকে উড্ডয়ন করা ১৫০টির বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়।

ভোররাতে যুদ্ধবিমানগুলো রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হামলা চালালে কারাকাসজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

afp_20260103_89gw69h_v3_highres_topshotvenezuelausconflictcrisis.jpg
ভেনেজুয়েলার ফুয়ের্তে তিইউনাতে মার্কিন হামলার দৃশ্য। ছবি: এএফপি

পরিচয় গোপন রেখে এক জ্যেষ্ঠ ভেনেজুয়েলান কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক হামলায় সামরিক-বেসামরিকসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

জেনারেল ড্যান কেইনের ভাষ্য, হেলিকপ্টারের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতেই এসব হামলা চালানো হয়।

স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটের দিকে মাদুরোর কম্পাউন্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়া মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো লক্ষ্য করে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী গুলি চালালে তারা 'অপ্রতিরোধ্য শক্তি' দিয়ে জবাব দেয়। এতে একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো অভিযানে প্রায় ছয়জন মার্কিন সেনা আহত হন।

ডেল্টা ফোর্স সদস্যদের দ্রুত ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছে দেয় এলিট আর্মির স্পেশাল এভিয়েশন ইউনিটের ১৬০তম রেজিমেন্ট। এই দলটি অত্যাধুনিক এমএইচ-৬০ ও এমএইচ-৪৭ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে।

'নাইট স্টকার্স' নামে পরিচিত এই ইউনিট উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রাতের অভিযানে বিশেষজ্ঞ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা ভেনেজুয়েলার উপকূলে প্রশিক্ষণ অভিযান চালিয়েছে বলে জানিয়েছে পেন্টাগন।

মাটিতে নামার পর ডেল্টা ফোর্স দ্রুত ভবনের ভেতরে চলে যায়। প্রায় ১ হাজার ৩০০ মাইল দূরের একটি কক্ষে বসে পুরো অভিযানের লাইভ সম্প্রচার দেখছিলেন ট্রাম্প ও তার শীর্ষ কর্মকর্তারা।

শনিবার সকালে ফক্স নিউজে ট্রাম্প বলেন, তিনি পুরো ঘটনাটি টেলিভিশন শো দেখার মতোই দেখেছেন।

ট্রাম্পের ভাষ্য, মাদুরো ও তার স্ত্রী ইস্পাত-সুরক্ষিত একটি কক্ষে লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে সেটি পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারায় মার্কিন বাহিনী তাদের ধরে ফেলতে সক্ষম হয়।

ভবনে প্রবেশের পর বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের মাদুরোর কাছে পৌঁছাতে মাত্র তিন মিনিট সময় লাগে। ভবনে প্রবেশের প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ডেল্টা ফোর্স জানায়, তারা মাদুরোকে হেফাজতে নিয়েছে।

মাদুরো আত্মসমর্পণ না করলে তাকে বোঝানোর জন্য এফবিআই-এর একজন জিম্মি-আলোচকও প্রস্তুত ছিলেন। তবে সেই প্রয়োজন আর পড়েনি।

afp_20260104_89k44kw_v2_highres_usmilitaryinterventioninvenezuela_0.jpg
গ্রেপ্তারের পর নিউইয়র্কে পুলিশ হেফাজতে মাদুরো। ছবি: এএফপি

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে হেলিকপ্টারে করে ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায় নেওয়া হয় কারাকাস সময় ভোর ৪টা ২৯ মিনিটে।

এরপর তাদের গুয়ান্তানামো বে নৌঘাঁটি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়।

ট্রাম্প জানান, প্রয়োজনে ভেনেজুয়েলায় দ্বিতীয় দফা হামলার প্রস্তুতিও ছিল। এমনকি অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
অভিযানের বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ট্রাম্প এই মিশনটিকে স্বাগত জানান।

তিনি বলেন, 'অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ' আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের বিরুদ্ধে একটি বড় পদক্ষেপ।

যদিও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক মাদক চোরাকারবারে ভেনেজুয়েলা বড় কোনো খেলোয়াড় নয়।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি দখলদারিত্বের বিরোধিতা করে এলেও ট্রাম্প শনিবার ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব এখন মার্কিন কর্মকর্তাদের হাতে এবং শিগগির মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির তেল অবকাঠামোর 'নিয়ন্ত্রণ' নেবে।