ইরানে ‘রাজা যায় রাজা আসে’?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

১৯৭৯ সালের জানুয়ারি। ইতিহাস বলছে—সে মাসে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল সংঘাতময়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মুক্তির দাবিতে দিকে-দিকে স্বৈরাচারী শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে গণ-জাগরণ। রেজা শাহের পতনের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে সর্বস্তরের মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালায় শাহ-সমর্থিত নিরাপত্তা বাহিনী। সরকারি পরিষেবা ভেঙে পড়ে। জনরোষ পৌঁছে যায় চরমে।

শাসকবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয় দেশটির শ্রমিক সংগঠনগুলো। ধর্মঘটে বন্ধ হয়ে যায় ইরানের খনিজতেল উৎপাদন। এর ফলে মার্কিন ও মিত্রদের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে, দেশবাসীর একমাত্র দাবি হয়ে ওঠে রেজা শাহীর মূল-উৎপাটন।

সেই বছর ১৬ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান পারস্যরাজ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। বর্তমানের ইরান তথা সাবেক পারস্য সাম্রাজ্যের প্রায় আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান হয়।

এ ঘটনার ১৫ দিন পর বীরের বেশে দেশে ফেরেন শাহবিরোধী ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। শাহের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাকে ১৯৬৪ সালে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

তুরস্ক, ইরাক ও ফ্রান্সে প্রায় ১৪ বছর নির্বাসনে কাটিয়ে ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্যারিস থেকে ভাড়া করা উড়োজাহাজে তেহরানে ফেরেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছিল ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ভক্ত। সেদিনের সেসব ঘটনার ভিডিওচিত্র এখন অনলাইনে পাওয়া যায়।

দেশে ফেরার ১০ দিন পর অর্থাৎ, ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, ইরানের রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়। এরপর উপসাগরীয় দেশটিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। আসে নতুন শাসন ব্যবস্থা। আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইরানকে ঘোষণা দেন ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে। সবাইকে দেন 'নতুন যুগের' আশ্বাস।

iran-unrest.jpg
তেহরানে সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলন চলাকালে যানবাহনে আগুন। জানুয়ারি ৯, ২০২৬। ভিডিও থেকে নেওয়া। ছবি: রয়টার্স

এসবই আজ থেকে ঠিক ৪৭ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু, প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর আজকের ইরানের দিকে তাকালে দেখা যায় একই চিত্র। আজ ১০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে—ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংঘাতময়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মুক্তির দাবিতে দিকে-দিকে স্বৈরাচারী শাসক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে চলছে গণ-জাগরণ।

বিক্ষোভকারীদের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনগুলো আরও জানাচ্ছে—নাগরিকদের ভাগ্য বদলাতে ব্যর্থ চলমান ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিলুপ্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছে সর্বস্তরের মানুষ। বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাচ্ছে খামেনি-সমর্থিত নিরাপত্তা বাহিনী। সরকারি পরিষেবা ভেঙে পড়েছে। জনরোষ পৌঁছেছে চরমে।

বিপ্লবের বিরুদ্ধে বিপ্লব

আজ ১০ জানুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—চিকিৎসকরা বলেছেন তেহরানে সরকারি বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছোড়ায় ২০০ জনের বেশি মারা গেছেন।

এতে বলা হয়, তেহরানের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাময়িকীটিকে বলেছেন, বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তেহরানের ৬ হাসপাতালে ২১৭ বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য আছে। তাদের 'বেশিভাগের গায়ে গুলি ক্ষত'।

গতকাল ৯ জানুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—'আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ায় ইরানের শাসকরা বৈধতার সংকটে পড়েছে'।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে বিদেশি চাপ। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া নতুন বিক্ষোভ এখনো পর্যন্ত সামাল দিতে পারেনি দেশটির শাসকগোষ্ঠী। এমন পরিস্থিতিতে তাদের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৫ জানুয়ারি আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানে ইসলামী বিপ্লবের ২ সপ্তাহ পরেই হিজাবকে বাধ্যতামূলক করার প্রতিবাদে তেহরানে হাজারো নারী প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় ইরানে প্রতিনিয়ত এই আইনের বিরোধিতা হয়েছে।

সর্বশেষ, ২০২২ সালে হিজাব পরা নিয়ে সরকারি বাহিনীর হাতে তরুণ মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে প্রবল সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল। এরপর থেকে ইরানে সেই আইনের শিথিলতা দেখা যাচ্ছে।

iran-unrest.jpg
তেহরানের রাজপথে সরকারবিরোধীদের জমায়েত। জানুয়ারি ৮, ২০২৬। ভিডিও থেকে নেওয়া। ছবি: রয়টার্স

শুধু পোশাক নিয়ে নয়, গত ৪৭ বছর ধরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে ইরানে প্রতিনিয়ত আন্দোলন হয়ে এসেছে। সরকারি বাহিনী সেসব আন্দোলন নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে দমনও করেছে। অন্যান্য স্বৈরশাসকদের মতো ইরানের ক্ষমতাসীনরা কখনই জনমতের ওপর গুরুত্ব না দেওয়ায় প্রতি আন্দোলনকে আগেরটির তুলনায় জোরালো হতে দেখা গেছে।

খামেনি-প্রশাসনবিরোধী সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য—ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ তাদের বর্তমান পরিস্থিতিকে 'দুর্দশাময়' বলে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি, দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বর্তমান শাসকের পরিবর্তন চায়।

অর্থাৎ, ৪৭ বছর পর ইরানে এক বিপ্লবের বিরুদ্ধে আরেক বিপ্লবের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

'রাজা যায় রাজা আসে'?

পারস্যের বিস্মৃতপ্রায় পাহলবি রাজবংশের শেষ প্রদীপ ৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি দূর থেকে দেখেছিলেন ইরানে গণঅভ্যুত্থানে তার বাবা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সিংহাসন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। তখন ১৭ বছর বয়সী রেজা পাহলভি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে, যুদ্ধবিমান পরিচালনার প্রশিক্ষণে।

১৯৭৯ সালে ইরানে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পাশাপাশি এর পরের বছর কায়রোয় নির্বাসিত-ক্ষমতাচ্যুত বাবা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর থেকে এক রাজ্যহীন যুবরাজে পরিণত হন রেজা পাহলভি।

১৯৮০ সালে বাবার মৃত্যুর পর রেজা পাহলভি কায়রোয় এক প্রতীকী অনুষ্ঠানে নিজেকে ইরানের শাহ বা বাদশাহ বা সম্রাট অর্থাৎ, সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর থেকে বিশ্ববাসীর কাছে তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়ে চলেছেন 'দ্বিতীয় রেজা শাহ' হিসেবে।

এরপর থেকে বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনগুলোয় তিনি সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে চলেছেন।

১৯৬০ সালে তেহরানে জন্ম নেওয়া রেজা পাহলভি এখনো যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত। থাকেন ওয়াশিংটন ডিসির কাছে মেরিল্যান্ডের পোটোম্যাক উপশহরে। সেখানে তিনি পড়েছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে। বিয়ে করেন ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনজীবী ইয়াসমিনকে। তিন কন্যা—নূর, ইমন ও ফারাহকে নিয়ে এই দম্পতির সংসার।

গত ৯ জানুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—রেজা পাহলভি সাধারণ জীবন যাপন করেন। সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যান। আরও বলা হয়—চোখে পড়ার মতো কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তার নেই। মাঝেমধ্যেই তাকে স্ত্রী ইয়াসমিনের সঙ্গে স্থানীয় ক্যাফেগুলোয় দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোয় বারবার বলা হয়—ইরানের যুবরাজ চান তার দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হোক। নারীর সম-অধিকারের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। ইরানে রাজতন্ত্র আবারও ফিরবে, নাকি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হবে—সেই সিদ্ধান্ত গণভোটের মাধ্যমে ঠিক করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজা পাহলভির যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতাকে বেশিরভাগ ইরানি অপছন্দ করলেও তার ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ একে 'বাস্তবসম্মত' পররাষ্ট্রনীতি বলে মনে করেন।

iran-unrest.jpg
ইরানে ক্রমশ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। জানুয়ারি ৮, ২০২৬। ভিডিও থেকে নেওয়া। ছবি: রয়টার্স

গত বছর জুনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে রেজা পাহলভি সেসব হামলার পক্ষে অবস্থান নেন। তার মতে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করতে সেসব হামলা চালানো হয়েছে। এমন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি নিজ দেশে বেশ সমালোচিত।

বিদেশে বসে সরকারবিরোধী কথা বলে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও রেজা পাহলভি নিজ দেশে তেমন সংখ্যক সমর্থক তৈরি করতে পারেননি বলেও সংবাদ প্রতিবেদনগুলোয় উল্লেখ করা হচ্ছে।

তবুও ইরানে অন্যান্য গণআন্দোলনের তুলনায় এবারের সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রেজা পাহলভির নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে বলেও সমাজমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে। চলমান গণবিক্ষোভকে আরও জোরালো করতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বিপ্লবোত্তর ইরান বিরোধীদলহীন হওয়ায় সেখানকার গণআন্দোলনগুলোয় রেজা শাহকে অনেকে আয়াতুল্লাহবিরোধী পরিচিত 'মুখ' হিসেবে দেখেন। তাই গত ৪৭ বছর ধরে ইরানে খোমেনি ও খামেনি-শাসনের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভগুলোয় শাহ-পন্থি স্লোগান শোনা যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

বিশ্লেষকদের অনেকের মতে—শাহের পতনের প্রায় ৫ দশক পরও ইরানে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ শাহের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এমন সময় ছিল যখন বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে কেউ শাহের পক্ষে স্লোগান দিলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। এত নির্মম হয়েও বিপ্লবী সরকার ইরানের ভেতরে শাহপন্থিদের নির্মূল করতে পারেনি। যেমন, রেজা শাহের কুখ্যাত সাভাক বাহিনীর শত নির্যাতনের পরও শাহবিরোধীদের নির্মূল করতে পারেনি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগের শাহ-সরকার বা যুবরাজ রেজা পাহলভির বাবা।

ইরানের বুকে ইতিহাসের এমনই পুনরাবৃত্তি যে, প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে দেশটির রাজপথগুলোয় 'শাহের পতন' চেয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। এখন সেসব রাজপথে 'শাহের উত্থান' নিয়ে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। যে শহরের রাজপথগুলোয় মানুষ একসময় আয়াতুল্লাহদের স্বাগত জানাতে জড়ো হতেন, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে আয়াতুল্লাহদের পতনের দাবিতে রক্তাক্ত বিক্ষোভ।

যদি দেখা যায়—৪৭ বছর আগের সেই স্বৈরাচারী শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির মতো গণঅভ্যুত্থানের জেরে একদিকে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে; অন্যদিকে, নির্বাসিত যুবরাজ দেশে ফিরছেন বীরের বেশে। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন লাখো মানুষ—তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে কি?