তুলতুলের কাছে এলো ডোরাকাটা বাঘ
সন্ধ্যা হয়ে আসছে, না আম্মু এসেছে বাসায়, না আব্বু।
দু'জনের দুইটা অফিস। একই সময়ে শুরু, একই সময়ে শেষ। কিন্তু শেষ তো হয় সেই পাঁচটায়। অথচ প্রতিদিনই তাদের দেরি। তুলতুল ফোন দিলেই বলে, এই তো বাবা, আর একটু সময়। রাস্তায় আছি, খুব জ্যাম।
জ্যামের কথা শুনতে তুলতুলের আর ভালো লাগে না।
সন্ধ্যা সন্ধ্যা হলে তুলতুলের মনটা খারাপ হয়ে যায়। অন্যদিন এ সময়ে তবু খালামনি থাকে। খালামনি তার সাথে কিছুক্ষণ খেলে, কিছুক্ষণ হাসে, আর কিছুক্ষণ পড়া ধরে। এইসব করতে করতে সময় কেটে যায় ঝটপট। আজকে খালামনিও নেই। তার ভার্সিটিতে কী সব হাবিজাবি আছে!
এর মধ্যেই কারেন্ট গেল। কারেন্ট গেলে নিচ থেকে জেনারেটর চালু হয়, আজ তাও হচ্ছে না। তুলতুল একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসল। তাতে ঘরের দেয়ালে পড়ল লম্বা লম্বা ছায়া। ভয় তুলতুল কমই পায়... কিন্তু কেন যেন মোমবাতিটাও কাঁপতে শুরু করল, আর ছায়াগুলোও লাফাতে শুরু করল। কলিজা শুকিয়ে এল তুলতুলের! আম্মু বলে চিৎকার দিয়ে উঠল না এইই ভাগ্য!
তখনই এল দরজায় নক—ঠক ঠক! ঠক ঠক! ঠক!
কলিংবেল কি বাজল না কারেন্ট থাকার জন্য? আম্মু কি এল? আব্বু কি এল? নাকি খালামনি?
কি-হোল পর্যন্ত তুলতুলের চোখ যায় না। একটা টুলের ওপর উঠে দরজার বাইরে দেখল। আর দেখল কী… ওপাশ থেকেও একটা ইয়াব্বড় চোখ, তাকিয়ে আছে যেন তুলতুলের দিকেই!
চিৎকার দিলো তুলতুল। পা হড়কে পড়ে গেল টুল থেকে। মোমবাতির দপদপানি শুরু হলো আরো। ঘরময় কাঁপতে থাকল ছায়াগুলো। ওদিক থেকে আবার এল নক—ঠক ঠক! ঠক ঠক! ঠক!
তুলতুলকে যেন নিশিতে পেয়েছে। যন্ত্রের মতো গিয়ে খুলে দিলো এবার দরজাটা। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বাঘ!
কী আশ্চর্য!
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাঘ। ডোরাকাটা। ইয়াব্বড়। হলুদ গায়ে কালো রঙের দাগ। বড় বড় গোঁফ। মুখের ভাঁজটায় কেমন যেন হাসি হাসি ভাব। চোখগুলো গোল। বড়। আর… সুন্দর!
তুলতুল তো অবাক! একটা বাঘকে তার সুন্দর লাগছে?
বাঘটা লেজ ঘোরালো। লেজটা তার একটু কাটা। কান নাড়িয়ে বাঘ বলল, শোনো তুলতুল, তোমাদের বাসায় কি লবণ আছে?
: লবণ মানে?
: আরে কী যন্ত্রণা! লবণ মানে লবণ! যেটা নিয়ে প্রতিদিন তোমার আব্বু-আম্মুর ঝগড়া হয় খাওয়ার টেবিলে। সাদা সাদা। চিনির মতোই দেখতে। কিন্তু তেমন মিষ্টি না, নোনতা!
: সে তো আমি বুঝেছি। কিন্তু বাঘ বুঝি লবণ খোঁজে?
: খোঁজে খোঁজে। দুইটা আম কুড়িয়ে পেয়েছি বুঝলে। দেখেই বুঝতে পারছি খেতে খুবই মজা হবে। কিন্তু এমনি এমনি খেলে তো হবে না। লবণ লাগবে। আছে?
তুলতুল কী বলবে ভেবেই পেলো না। আর সেই সুযোগে বাঘটা বাসার ভেতরে চলে এল। এসেই মাথা দুলিয়ে বলল, বাহ! তোমাদের বাসাটা তো খুব সুন্দর। একটু বসি, তুমি লবণ নিয়ে এসো।
বাঘটা সোফার ওপর বসে পড়ল। তুলতুল খেয়াল করল তার থাবায় দুটো আম আছে সত্যি সত্যিই। তুলতুল লবণ আনতে তাই দেরি করল না। বলল, লবণ নিয়ে তাড়াতাড়ি যাও তো! আব্বু আম্মু তোমাকে দেখে ফেললে খুব রাগ করবে। আমাকে বলবে, সে কী! চেনো না জানো না, একজনকে বাসায় ঢুকতে দিয়েছ কেন!
: কে বলল আমরা পরিচিত না! সেই যেবার তুমি চিড়িয়াখানা গেলে… আমার সাথে সেলফি তুলেছ তো তুমি! আমি তখন একটু হেসেও দিয়েছিলাম, খেয়াল নেই তোমার!
: কী বলো, তুমি চিড়িয়াখানার বাঘ?
: এই ঢাকা শহরে আর কই বাঘ পাবে তুমি? সেলফি তুলতে তুলতে কী বলেছিলে মনে আছে?
: কী বলেছিলাম?
: বলেছিলে হ্যালো বাঘ… আমাদের বাসায় বেড়াতে এসো।
: বলেছিলাম নাকি?
: মানুষের স্মৃতিশক্তি এত যে খারাপ...বলার মতো না!
: আর সে জন্য তুমি চলে এলে?
: ভালো লাগছিল না বুঝলে… একই জায়গায় একইভাবে কত দিন থাকা যায় বলো? একটু ঘুরে ফিরে না বেড়াতে পারলে… সে জন্যই পালিয়ে…
: কী বলো, তুমি পালিয়ে এসেছো?
: তা না তো কি! আমাকে কি ওরা এমনি এমনি ছাড়বে? আচ্ছা শোনো, একটু মরিচগুঁড়া হবে? লবণ আর মরিচগুঁড়া দিয়ে আম খেতে কী যে ভালো লাগে…
তুলতুল আর কী করবে! রান্নাঘর থেকে নিয়ে এল মরিচগুঁড়া। বাঘটা সেগুলো ভালো করে মেখে যে-ই আমে কামড় দিতে যাবে ঠিক তখনই চলে এল কারেন্ট। শনশন করে ফ্যান ঘুরতে শুরু করল। আলো লাফিয়ে যেন পড়ল সবার গায়ে। আর তখনই বেজে উঠল কলিংবেলটা—টিংটং...টিংটং…
তারপর বাঘটা হুড়মুড়িয়ে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। তুলতুল চিৎকার করে বলল, ওদিকে না! ওদিক থেকে পালাতে পারবে না...শোনো…
কিন্তু কে শোনে কার কথা!
রান্নাঘর থেকে থালাবাসন পড়ার আওয়াজ উঠল ঝনঝনিয়ে। ওদিকে কলিংবেল বাজছে। তুলতুল দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল। আম্মু আব্বু দাঁড়িয়ে আছে।
আব্বু বলল, কীরে, তোকে এমন লাগছে কেন?
তুলতুল বলল, বাঘ আব্বু!
আম্মু বলল, বাঘ? কোথায়? কী বলিস!
তুলতুল আঙুল দিয়ে রান্নাঘর দেখাল। আব্বু আম্মু দেখল রান্নাঘরের ছোট্ট জানলাটা খোলা। কিন্তু বাঘটাঘ আবার কী! আব্বু হেসে বলল, ওটা বনের বাঘ না রে তুলতুল। ওটা হলো মনের বাঘ। ভয়ের বাঘ!
তুলতুল কিছু বলল না। সে জানে, বড়দের কোনো কিছু বিশ্বাস করানো যায় না।
২.
রাতের খাবার খেতে খেতে আব্বু সব সময় খবর শোনে। আজকেও শুনছিল। তখনই একটা খবর শুনে তুলতুলের কান খাড়া হয়ে উঠল—আজকে দুপুর আড়াইটার দিকে চিড়িয়াখানা থেকে একটা বাঘ পালিয়েছে। বাঘটা আকারে বেশ বড়। চোখগুলো গোলগোল। আর লেজের কাছটা ছোট্ট একটু কাটা!
তুলতুল কিছু বলল না, শুধু মুচকি একটু হাসল। আব্বুরা খুব বোকা হয়!