বিড়াল কেন গরগর শব্দ করে
বিড়ালকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কেন তারা গরগর শব্দ করে? কেন হঠাৎ করে টেবিলের ওপর রাখা জিনিসপত্র ফেলে দেয়? আর ঘর পরিষ্কার করার পরই বা কেন সবকিছু আবার এলোমেলো করে?
শেষ প্রশ্নের উত্তর হয়তো তাদের স্বভাবজাত দুষ্টুমির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু গরগর শব্দ বা ‘পারিং’-এর রহস্য কিছুটা জটিল।
আমরা সাধারণত মনে করি, বিড়াল খুশি হলেই গরগর শব্দ করে।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই মিষ্টি শব্দের পেছনের গল্প আরও জটিল। কখনো এটি ভালোবাসার প্রকাশ, কখনো যোগাযোগের মাধ্যম, কখনো সাহায্যের আবেদন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এটি মানুষকে প্রভাবিত করার কৌশলও হতে পারে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের অনেক বছর লেগেছে।
একসময় ধারণা করা হতো, হৃদযন্ত্রের কাছের একটি বড় শিরায় রক্তপ্রবাহের কারণে এই শব্দ তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় সেই ধারণা বাতিল হয়ে যায়।
বর্তমানে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, গরগর শব্দের উৎস বিড়ালের স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংক্স।
বিড়াল যখন শ্বাস নেয় এবং ছাড়ে, তখন স্বরযন্ত্রের একটি অংশ স্বররজ্জুর কাছে দ্রুত কম্পন সৃষ্টি করে। সেই কম্পনের ফলেই তৈরি হয় গরগর শব্দ।
মজার ব্যাপার হলো, বিড়াল শ্বাস নেওয়ার সময়ও এবং শ্বাস ছাড়ার সময়ও এই শব্দ করতে পারে। এ কারণেই শব্দটি একটানা শুনতে পাওয়া যায়।
বিড়াল কেন গরগর শব্দ করে, তার নির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।
গবেষকেরা বিড়ালের মস্তিষ্কে এমন কিছু স্নায়বিক কার্যকলাপ শনাক্ত করেছেন, যা গরগর শব্দ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু ঠিক কী কারণে সেই প্রক্রিয়া চালু হয়, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল একাধিক কারণে গরগর শব্দ করতে পারে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্য এসেছে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল তার প্রয়োজন অনুযায়ী গরগর শব্দের ধরন বদলে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রাণীকল্যাণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাট কেয়ারের গবেষক ড. লরেন ফিঙ্কা বলেন, যখন একটি বিড়াল খাবার চায়, তখন তার গরগর শব্দে সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়।
এই শব্দ সাধারণ সময়ের গরগর আওয়াজের চেয়ে বেশি জরুরি শোনায়।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই শব্দের মধ্যে মানুষের শিশুর কান্নার মতো উচ্চ কম্পাঙ্কের একটি অংশ থাকে।
অর্থাৎ, ক্ষুধার্ত বিড়ালের গরগর শব্দে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যা অবচেতনভাবে আমাদের কাছে শিশুর কান্নার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, এটি মোটেও কাকতালীয় নয়।
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই শিশুর কান্নার প্রতি খুব সংবেদনশীল। শিশুর কান্না শুনলে আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত সাড়া দিতে প্রস্তুত হয়। বিড়াল যেন সেই সহজাত মানবিক প্রবৃত্তিকেই নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে।
তারা তাদের স্বাভাবিক গরগর শব্দের ভেতর এমন একটি সংকেত লুকিয়ে রাখে, যা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
অর্থাৎ, বিড়াল যখন মিষ্টি করে গরগর শব্দ করছে, তখন সে হয়তো শুধু আদরই চাইছে না। সে হয়তো বলছে, ‘আমার খাবার কোথায়? এখনই দাও!’
এখানেই শেষ নয়।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিড়াল কেবল সুখী থাকলেই নয়, অসুস্থ, ভীত বা ব্যথা পেলেও গরগর শব্দ করতে পারে।
ড. ফিঙ্কার মতে, কিছু ক্ষেত্রে এই শব্দ বিড়ালের জন্য এক ধরনের আত্মসান্ত্বনার কাজ করে।
যখন তারা মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা শারীরিক অস্বস্তির মধ্যে থাকে, তখন গরগর শব্দ তাদের শান্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি আহত বিড়ালকেও অনেক সময় গরগর শব্দ করতে দেখা যায়।
কখনো কখনো এটি মালিকের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়ার উপায়ও হতে পারে।
তবে বিষয়টি সব সময় এত সরল নয়। কারণ অসুস্থ বা আহত অনেক বিড়াল আবার একা থাকতে পছন্দ করে এবং স্পর্শ এড়িয়ে চলে। তাই শুধু গরগর শব্দ শুনে বিড়ালের অনুভূতি বোঝা সবসময় সম্ভব হয় না। তার শরীরের ভঙ্গিও লক্ষ্য করতে হয়।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের গরগর শব্দের কম্পন সাধারণত ২০ থেকে ১৫০ হার্টজের মধ্যে থাকে।
নিউজিল্যান্ডে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছে, এই ধরনের কম্পন হাড়ের বৃদ্ধি এবং নরম টিস্যুর পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।
অর্থাৎ, গরগর শব্দ হয়তো বিড়ালের শরীরকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
পরে ইঁদুরের ওপর করা কিছু গবেষণাতেও দেখা গেছে, নিম্নমাত্রার কম্পন ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রভাব এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
বিড়ালের গরগর শব্দকে আমরা সাধারণত সুখের প্রকাশ হিসেবে দেখি। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই মিষ্টি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও অনেক গল্প।
কখনো এটি ভালোবাসার প্রকাশ, কখনো খাবারের দাবি, কখনো সাহায্যের আবেদন। আবার কখনো এটি নিজের ব্যথা ও উদ্বেগ কমানোর একটি উপায়।
আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের কৌশল।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস



