মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে কি আসলেই শিশুর বুদ্ধি বাড়ে?
খাদ্যতালিকায় শিশুদের পছন্দের শীর্ষে থাকে মিষ্টি জাতীয় খাবার। অভিভাবকরাও শিশুদের বুদ্ধি বাড়বে এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে শিশুদের মিষ্টি খাবার খেতে নিরুৎসাহিত করেন না।
কিন্তু বাস্তবতা আসলে কী? এই বিষয়ে কথা বলেছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ।
মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে কি আসলেই শিশুদের বুদ্ধি বাড়ে
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, মিষ্টি জাতীয় খাবার খেলে শিশুদের বুদ্ধি বাড়ে—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে শিশুরা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করে। অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার শিশুদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। কারণ চিনি শরীরকে ক্যালরি দেয়। কিন্তু পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে না। বরং এই মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। শিশুদের স্থূলতা ও দাঁতের সমস্যার জন্য এই মিষ্টি জাতীয় খাবার দায়ী।
কোনো খাবারই রাতারাতি বুদ্ধিমত্তায় অলৌকিক পরিবর্তন আনে না। মস্তিষ্কের সঠিক গঠনের জন্য প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেটের সুষম সমন্বয় প্রয়োজন। অতিরিক্ত চিনি এবং প্রসেসড খাবার মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি করে। খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও পানি পান মস্তিষ্কের জন্য অপরিহার্য।
ছোটবেলা থেকেই অনেক পরিবারে শিশুরা মিষ্টি খেতে না চাইলে বলতে শোনা যায়, মিষ্টি খেলে ব্রেইন ভালো হবে।
গ্লুকোজ (যা মিষ্টি স্বাদের অন্যতম উপাদান) মস্তিষ্কে শক্তি উৎপাদনের প্রাথমিক উৎস। মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অব্যাহত রাখার জন্য এই গ্লুকোজের বিকল্প নেই। গ্লুকোজ তাৎক্ষণিক এনার্জি সরবরাহ করে। ফলে মস্তিষ্ক সতেজতা অনুভব করে। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে সেবনে তা ওভারড্রাইভ মুড সৃষ্টি করে, যা হাইপার অ্যাকটিভিটি বা মুড সুইংয়ের কারণ।
শিশুদের ওপর মিষ্টি জাতীয় খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব
শিশুরা ছোটবেলায় মিষ্টি, চকলেট, আইসক্রিম বা এই ধরনের মিষ্টি জাতীয় অনেক খাবার খেতে পছন্দ করে। এ ছাড়া মিষ্টি জাতীয় পানীয় অ্যাডেড সুগারের অন্যতম উৎস। মিষ্টি জাতীয় খাবার শিশুরা বেশি খেলে তারা ঝাল, টক বা তিতা জাতীয় খাবারের অভ্যাস গড়ে উঠবে না। এ ছাড়া মিষ্টি জাতীয় খাবারে শিশুর পেট দীর্ঘ সময় ভরে থাকবে। ফলে সে ক্ষুধা অনুভব করবে না এবং দিনের অন্যান্য সময়ের যে খাবার তা খেতে চাইবে না। মিষ্টি জাতীয় খাবারে শিশুর দাঁতের মাড়ি দুর্বল হয়ে যায়, অনেক সময় মাড়ি থেকে রক্তপাত হয়, মুখে ফাংগাল সংক্রমণের ফলে ঘা-ও হতে পারে। এ ছাড়া ডেন্টাল ক্যারিজের একটা বড় কারণ এই মিষ্টি জাতীয় খাবার। আরও কিছু কারণের মধ্যে আছে—
অতিরিক্ত চিনি থেকে দাঁতে ক্যাভিটি হওয়ার এবং দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খেলে ক্যালরির চাহিদা পূরণ হলেও স্থূলতা বা মোটা হয়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়।
অতিরিক্ত স্থূলতা ভবিষ্যতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে, যা থেকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যারা বেশি মিষ্টি খায় তারা স্থূল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী জীবনে তাদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপ করে। ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি হয়ে থাকে।
মিষ্টি জাতীয় খাবার শিশুর পেট ভরে দেয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয় না। ফলে অপুষ্টিতে ভোগার ঝুঁকি বাড়ে।
অনেক সময় অতিরিক্ত চিনি খেলে শিশুদের মধ্যে হাইপার অ্যাক্টিভিটি বা অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিশেষত ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের খাবারে চিনি দেওয়া হলে তা তাদের শারীরিক ও মানসিক সঠিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
অতিরিক্ত চিনি জাতীয় খাবার অন্ত্রে খারাপ ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ায়। ফলে পেটে গ্যাস, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া জাতীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ শিশুর স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং মনোযোগের ঘাটতি তৈরি করতে পারে।
শিশুদের বুদ্ধির বিকাশে যে ধরনের খাবার জরুরি
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, খেজুর, কলা, অন্যান্য মিষ্টি ফল, কিসমিস, মধু—এসব মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু চিনি দিয়ে খাবার মিষ্টি করা বাদ দিতে হবে। ড্রাই ফুডে ফ্রুক্টোজের পরিমাণ বেশি থাকে, চিনিতে থাকে গ্লুকোজ। অতিরিক্ত গ্লুকোজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
ঘরে বানানো খাবারই শিশুদের জন্য বেশি উপযোগী। প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং কিছু খনিজ পদার্থের মতো পুষ্টি শিশুদের জন্য খুবই দরকার। এগুলো বাচ্চাদের স্মৃতিশক্তিকে তীক্ষ্ণ করতে সাহায্য করে। ডিম, কলা, দুধ, বাদাম (আখরোট, কাঠবাদাম ও পেস্তা), ঘি, দই—এগুলোতে প্রোটিন, ফ্যাট, আয়রন, কার্বোহাইড্রেট এবং ফসফরাস থাকে, যা স্বাস্থ্যকর, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায়, হাড়কে শক্তিশালী করে, শিশুদের শক্তিশালী ও সুস্থ করে তোলে।

