ঢাকার আন্ডাররেটেড ৫ চিকেন চাপ

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

ঢাকায় চিকেন চাপ মানেই অনেকের মনে আগে আসে দুটি নাম—বিসমিল্লাহ বা বোখারী। পুরান ঢাকার খাবারের আলোচনায় এই দুই জায়গার চাপ প্রায় কিংবদন্তির মতো জায়গা করে নিয়েছে। আড্ডা, ইউটিউব রিভিউ কিংবা ফুড গ্রুপ—সব জায়গাতেই এদের নাম বারবার ঘোরে।

কিন্তু ঢাকার খাবারের জগৎ আসলে এত ছোট নয়। এই শহরের অলিগলি, বাজার, পুরোনো হোটেল আর ব্যস্ত মোড়ের ভেতরে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে বছরের পর বছর ধরে দারুণ চিকেন চাপ বানানো হচ্ছে—তবু সেগুলো বড় আলোচনায় খুব একটা আসে না।

এই জায়গাগুলোর চাপ হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় তেমন ভাইরাল নয়, কিন্তু স্বাদে কোনো অংশে কমও নয়। বরং অনেক সময় এগুলোতে থাকে নিজস্ব রান্নার স্টাইল, আলাদা মসলা বা বিশেষ কোনো সসের ব্যবহার, যা তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে দিয়েছে।

ঢাকার খাবারপ্রেমীদের জন্য তাই আজ তুলে ধরা হলো এমন পাঁচটি চিকেন চাপ, যেগুলো আন্ডাররেটেড—কিন্তু না খেলে মিস করার মতো।

১. আমজাদ রেস্তোরাঁ (বাংলামোটর)

বাংলামোটরের ব্যস্ত এলাকায় ছোট্ট কিন্তু পুরোনো একটি খাবারের জায়গা আমজাদ রেস্তোরাঁ। বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও এখানকার চিকেন চাপ অনেকের কাছে নীরব প্রিয়।

এই চাপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর মশলাদার স্বাদ এবং আলাদা ধরনের সস। সাধারণ চাপের মতো শুধু ভাজা মুরগি আর মসলার ঝোল নয়—এখানে মুরগির ওপর দেওয়া হয় হালকা ঘন সস, যা স্বাদকে একটু আলাদা মাত্রা দেয়।

মুরগিটা ভালো করে ভাজা থাকে, তাই বাইরের স্তরটা হালকা ক্রিস্পি আর ভেতরটা থাকে নরম। মসলার মধ্যে থাকে রসুন, আদা, মরিচ আর গরম মসলার শক্ত উপস্থিতি। ফলে প্রথম কামড়েই ঝাঁঝালো একটা স্বাদ পাওয়া যায়।
বাংলামোটরে অনেকেই দ্রুত খাবার খেতে ঢুকে পড়েন এই রেস্তোরাঁয়, কিন্তু নিয়মিত ক্রেতারা জানেন—এখানকার চিকেন চাপ চুপচাপ নিজের মান ধরে রেখেছে বহু বছর ধরে।

২. আলম রেস্তোরাঁ (বাংলামোটর)

বাংলামোটরেই আরেকটি পরিচিত নাম আলম রেস্তোরাঁ। জায়গাটা খুব বড় নয়, কিন্তু পুরোনো ঢাকার ধাঁচের খাবারের জন্য এর একটা আলাদা সুনাম আছে।

এখানকার চিকেন চাপের মূল আকর্ষণ হলো মুরগির নরম টেক্সচার। মুরগিটা এমনভাবে রান্না করা হয় যে চাপের মাংস প্রায় হাড় থেকে আলগা হয়ে আসে। ফলে খেতে খুব সহজ এবং স্বাদও বেশ গভীর লাগে।

মসলার পরিমাণ খুব বেশি নয়, কিন্তু ভারসাম্য ভালো। ভাজার স্তরটা সুন্দরভাবে করা থাকে—না বেশি পুড়ে যাওয়া, না আবার কম ভাজা।

যারা খুব অতিরিক্ত ঝাল বা ভারী মসলা পছন্দ করেন না, তাদের জন্য আলম রেস্তোরাঁর চাপ বেশ আরামদায়ক একটি স্বাদ দেয়। অনেকের মতে, এই চাপের সাদামাটা কিন্তু সুস্বাদু চরিত্রটাই এর বড় শক্তি।

৩. প্লিজ্যান্ট রেস্তোরাঁ (শ্যামলী)

শ্যামলীর খাবারের তালিকায় প্লিজ্যান্ট রেস্তোরাঁ একটি পুরোনো নাম। অনেকেই এখানে খিচুড়ি বা কাবাব খেতে আসেন। কিন্তু যারা জানেন তারা বিশেষভাবে খোঁজেন এখানকার চিকেন চাপ।

এই চাপের সবচেয়ে আলাদা দিক হলো এর কড়া মসলা আর টমেটো সসের স্বাদ। রান্নার সময় মুরগির সঙ্গে এমনভাবে মসলা ব্যবহার করা হয় যে স্বাদটা বেশ গভীর ও ঝাল হয়ে ওঠে।

মুরগির ওপর হালকা টমেটো সসের একটা প্রলেপ থাকে, যা চাপটাকে একটু টক-ঝাল স্বাদ দেয়। ফলে প্রতিটি কামড়ে পাওয়া যায় তিন ধরনের অনুভূতি—ঝাল, মসলাদার আর হালকা টক।

যারা একটু শক্তিশালী স্বাদের খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই চাপ বেশ সন্তোষজনক। অনেক সময় রাতের আড্ডা শেষে শ্যামলীতে যারা খাবার খুঁজতে বের হন, তাদের কাছে প্লিজ্যান্টের চাপ একটা গোপন আনন্দ।

৪. লাভলী রেস্তোরাঁ (নীলক্ষেত)

নীলক্ষেত মানেই বই, ছাত্রদের আড্ডা আর সস্তা খাবারের রাজ্য। এই জায়গার খাবারের তালিকায় বহুদিন ধরে টিকে আছে লাভলী রেস্তোরাঁ।

এখানকার চিকেন চাপ ছাত্রদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়, যদিও বড় ফুড আলোচনায় এর নাম খুব কম শোনা যায়।

এই চাপের বৈশিষ্ট্য হলো নরম মাংস আর কড়া ঝাল স্বাদ। মুরগিটা আগে ভালোভাবে মেরিনেট করা হয়, তাই ভেতর পর্যন্ত মসলা ঢুকে যায়। ভাজার পর সেটা আরও গভীর স্বাদ তৈরি করে।

ঝালের মাত্রা অনেক সময় বেশ তীব্র হতে পারে। মরিচের ঝাঁজ আর মসলার ঘ্রাণ মিলিয়ে একটা শক্তিশালী স্বাদ তৈরি হয়, যা ঝালপ্রেমীদের জন্য বেশ উপভোগ্য।

নীলক্ষেতের ছাত্রজীবনের সঙ্গে অনেকের কাছে এই চাপের একটা আলাদা স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

৫. গ্রীন হোটেল (মোহাম্মদপুর)

মোহাম্মদপুরের খাবারের মানচিত্রে গ্রীন হোটেল একটি পরিচিত নাম। পুরোনো ধাঁচের এই রেস্তোরাঁয় এখনো এমন কিছু খাবার পাওয়া যায়, যেগুলো নতুন জায়গাগুলোতে খুব একটা দেখা যায় না।

এখানকার চিকেন চাপের স্বাদ একটু ভিন্ন ধরনের। এতে ব্যবহার করা হয় ক্যাপসিকাম আর টমেটোর মিশ্র স্বাদ, যা চাপটাকে একটু আলাদা করে তোলে।

মসলার ঘ্রাণ বেশ তীব্র, কিন্তু তার সঙ্গে ক্যাপসিকামের হালকা মিষ্টি স্বাদ একটা ভারসাম্য তৈরি করে। ফলে চাপটা খুব ভারী লাগে না, আবার স্বাদও ফিকে নয়।

অনেক স্থানীয় খাবারপ্রেমীর মতে, মোহাম্মদপুর এলাকায় চিকেন চাপের ক্ষেত্রে গ্রীন হোটেল অনেক দিন ধরেই নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

আলোচনার বাইরে, স্বাদে দুর্দান্ত

ঢাকার খাবারের সংস্কৃতি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন নতুন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ আর ফুড ট্রেন্ড প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্র দখল করে নেয়। কিন্তু এর মাঝেও শহরের নানা কোণে এমন অনেক পুরোনো বা কম আলোচিত জায়গা আছে, যেখানে বছরের পর বছর ধরে ভালো খাবার তৈরি হচ্ছে।

চিকেন চাপের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। বিসমিল্লাহ বা বোখারীর নাম আমরা প্রায়ই শুনি, কিন্তু এই শহরে আরও অনেক জায়গা আছে যেখানে স্বাদের দিক থেকে কোনো কমতি নেই—শুধু আলোচনার বাইরে থেকে গেছে।

তাই যারা ঢাকার খাবারের আসল বৈচিত্র্য খুঁজতে চান, তারা একদিন সময় করে এই জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে পারেন। হয়তো দেখবেন—এই আন্ডাররেটেড চাপগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন প্রিয় স্বাদ।