কলাবাগানের মামা হালিমের এই বিশেষত্বগুলো জানেন?
রাজধানীর কলাবাগান মাঠের উল্টো পাশে বিকেলের দিকে গেলেই দেখা যায় ছোট্ট একটা ভিড়। কারও হাতে মাটির হাঁড়ি, কেউ দাঁড়িয়ে আছে পার্সেলের অপেক্ষায়। বাতাসে ভাসছে ঘন ডাল, গরমমশলা আর মাংসের মোলায়েম গন্ধ। ঢাকাবাসীর কাছে এই জায়গাটা শুধু একটা দোকান নয়—এটা এক স্বাদের ঠিকানা। নাম তার ‘মামা হালিম’।
যাকে সবাই ‘মামা’ বলে চেনে, তার আসল নাম দীন মোহাম্মদ মনু। কিন্তু সেই নাম যেন অনেক আগেই চাপা পড়ে গেছে। তিনি এখন সবার মামা—রসনাপ্রিয় ঢাকাবাসীর আত্মীয়।
‘মামা’ নামের গল্প
দীন মোহাম্মদের বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। শৈশবটা ছিল অস্থির আর ঘটনাবহুল। ছোটবেলায় মামাবাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গিয়েছিলেন আজমির শরিফে খাজাবাবার দরবারে। সেখান থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসা। ঢাকায় এসে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘোরাফেরা, মানুষের ছোটখাটো কাজ করে দিন পার করা। পরে মোহাম্মদপুরের বিহারি কলোনির এক রেস্তোরাঁয় সাগরেদের কাজ শুরু।
সেই রেস্তোরাঁয় সবাই তাকে ডাকত ‘মামা’ বলে। নামটা সেখানেই লেগে যায়। স্বাধীনতার আগে মোহাম্মদপুরের মাল্লু ও কাল্লু ওস্তাদের কাছ থেকে শিখেছিলেন বিশেষ এক রান্না—তখন যার নাম ছিল ‘ডাল-গোশত’। ১৯৭৫ সালে কলাবাগানের একটি ছোট ছাপড়া ঘরে শুরু করেন নিজের দোকান। পরে সেই ডাল-গোশতের নাম দেন ‘হালিম’। আর তিনি হয়ে যান সবার ‘মামা’।
হালিমের ইতিহাস, মামার অবদান
মোগল আমলে দরবারি খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল হালিম। সেনানায়ক ও সুবেদারদের প্রিয় নাশতা। ঢাকায় কবে থেকে এর প্রচলন, তার সঠিক ইতিহাস না জানা গেলেও রাজধানীবাসীর কাছে হালিম মানেই আগে আসে ‘মামা হালিম’-এর নাম।
মামার দাবি, ঢাকায় এককভাবে হালিমের দোকান তিনিই প্রথম চালু করেন। পাকিস্তান আমলে দুই-চার পয়সায় যে পরিমাণ হালিম বিক্রি হতো, এখন তা ৭০ টাকা থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। রোজার সময় বিভিন্ন আকারের মাটির হাঁড়িতে বিক্রি হয় গরু, খাসি ও মুরগির হালিম।
বারোটা না বাজলে চুলায় ওঠে না
মামা হালিমের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—বারোটা না বাজলে রান্না শুরু হয় না। কারণ, আগে দেখতে হয় দিনের আবহাওয়া কেমন। তীব্র শীত, হালকা শীত বা গরম—প্রতিটি আবহাওয়ায় মানুষের শরীর মসলার ভিন্ন অনুপাত গ্রহণ করে। তাই গরমে এক রকম, শীতে আরেক রকম মসলা ব্যবহার করা হয়।
মরিচের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা। প্রতিদিন বাজারের মরিচের ঝাল এক রকম থাকে না। তাই মরিচ ভেঙে জিভে ছুঁয়ে তেজ মাপেন মামা নিজে। প্রতিদিন একই পরিমাণ মরিচ দেওয়া হয় না। এটাই তার ওস্তাদি।
শত মসলার গোপন রহস্য
মামা জানান, তার হালিমে ব্যবহার হয় ১০০ প্রকারের মসলা। তবে সব বলা যাবে না। সাতটি মসলার নাম তিনি গোপন রাখেন। প্রধান উপকরণ হিসেবে লাগে সাত রকমের ডাল—অড়হরের ডাল ছাড়া নাকি হালিমের স্বাদ পূর্ণ হয় না। সঙ্গে থাকে সুগন্ধি চাল, ধনে, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, গোলমরিচ, মৌরি, মেথি, সরিষা।
মাংস হতে পারে গরু, খাসি বা মুরগি—কিন্তু মসলার অনুপাত একই। পরিবেশনের সময় কাঁচামরিচ, আদা, ধনেপাতা, বেরেস্তা, শসার কুচি আর অবশ্যই এক টুকরো লেবু। মামার ভাষায়, ‘লেবু না দিলে স্বাদ খুলবে না।’
তার আত্মবিশ্বাসী দাবি—‘একই হালিম তিন বছরের বাচ্চার ঝাল লাগবে না, আবার ৩০ বছরের লোকেরও ঠিকঠাক লাগবে।’
তেঁতুলের টকে আলাদা কেরামতি
হালিমের সঙ্গে থাকে বিশেষ কায়দায় তৈরি তেঁতুলের টক। দুটি আলাদা প্যাকেট—একটি মেয়েদের জন্য, একটি ছেলেদের জন্য। পুরো রহস্য তিনি খোলাসা করেন না। শুধু জানান, এতে আছে বিট লবণ, জৈন আর পুদিনা পাতা, যা পেটের সমস্যায় উপকার দেয়।
সততার ব্যবসা
‘এইটা সততার ব্যবসা’—বলতে ভালোবাসেন মামা। প্রতিদিন একই পরিমাণ হালিম তৈরি করেন না। আগের দিনের হালিম পরের দিন বিক্রি হয় না। গতকাল যেমন ঘন ছিল, আজও তেমনই থাকবে। মানের সঙ্গে আপস নেই। যেনতেন তেল নয়, ব্যবহার করেন ভালো মানের ঘি।
রোজার সময় দুপুরের পর থেকেই দোকানের সামনে লাইন পড়ে যায়। এখন বসে খাওয়ার সুযোগ নেই, শুধুই পার্সেল। দাম একটু বেশি হলেও স্বাদের জন্য মানুষ কিনে নিয়ে যায়।
২৭ রমজানের বিশেষ হালিম
২৭ রমজানে মামা তৈরি করেন বিশেষ হালিম। তাতে থাকে একশ গরু ও একশ খাসির মগজ, আলুবোখারা, বাদাম, কালিজিরা, সাদা-কালো গোলমরিচ, জায়ফল, জয়ত্রীসহ নানা মসলা। কিছু মসলা ভাজা হয়, কিছু ভাজা হয় না। হামানদিস্তায় পিষে তৈরি করা হয় মসলা, যাতে স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে।
এক বাটি হালিম, এক শহরের ভালোবাসা
৬৩ বছর বয়সেও সাদা পাঞ্জাবি আর টুপি পরে নিজেই দেখাশোনা করেন দোকান। ডাল-মসলা মেশানোর কাজটি করেন নিজের হাতে। তার দুই ছেলে রুবেল ও রাসেলও এখনো পুরো রহস্য জানে না। সময় হলে শিখিয়ে যাবেন—এমনটাই তার ইচ্ছা।
কলাবাগানের এই দোকান আজ শুধু খাবারের জায়গা নয়, স্মৃতির অংশ। ঢাকার ইফতার মানেই যেন এক বাটি ‘মামা হালিম’। এক বাটি ঘন, গরম হালিমের ভেতর মিশে আছে অর্ধশতকের সাধনা, পরিশ্রম আর ভালোবাসা। তাই শহরের মানুষ তাকে শুধু ব্যবসায়ী নয়, নিজেদের মানুষ বলেই মনে করে—সবার প্রিয় ‘মামা’।



