বাইরে সেহরি করতে চান? যেতে পারেন ঢাকার এই ১২ জায়গায়

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

রমজানের রাতে ঢাকার খাবারের মানচিত্র যেন বদলে যায়। ইফতারের পর থেকে ভোর পর্যন্ত শহরের নানা প্রান্তে জ্বলে ওঠে চুলা, ভিড় জমে রেস্তোরাঁয়। কেউ খোঁজেন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদ, কেউ আবার চান আধুনিক বুফে বা ভিন্নধর্মী কুইজিন।

সেহরিকে ঘিরে এই প্রাণচাঞ্চল্যের ভেতর থেকে বেছে নেওয়া কয়েকটি পরিচিত জায়গার কথাই থাকছে এখানে—স্বাদ, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতায় যেগুলো আলাদা করে নজর কাড়ে।

১) আল রাজ্জাক রেস্তোরাঁ

পুরান ঢাকার বংশালে অবস্থিত আল রাজ্জাক রেস্তোরাঁ তিন দশকের ঐতিহ্য বহন করে। সেহরির সময় এখানে ভিড় জমে রাত বারোটার পর থেকেই। নরম খাসির বিরিয়ানি, কাচ্চি, লেগ রোস্ট, খাসির গ্লাসি, পোলাও, ডাল-ভাত—সবকিছুতেই আছে পুরান ঢাকার স্বাদ ও ঘ্রাণ। বড় ডেগে রান্না হওয়া খাবারের আলাদা এক উষ্ণতা আছে, যা রাতজাগা ঢাকাকে টেনে আনে। সাদামাটা পরিবেশ, দ্রুত সার্ভিস এবং সাশ্রয়ী দাম—সেহরির জন্য এটিকে করে তোলে নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।

২) হোটেল স্টার (প্রা.) লি.

ঠাটারীবাজারের হোটেল স্টার ঢাকার আরেক কিংবদন্তি নাম। সেহরির সময়ে তাদের কাচ্চি, কাবাব, নেহারি ও মগজ ভুনা আলাদা জনপ্রিয়তা পায়। নরম রুটি আর গরম ধোঁয়া ওঠা কাবাব কিংবা মগজ ভুনা ভোরের আগে ক্ষুধা মেটাতে দারুণ সঙ্গী। জায়গাটি ঝাঁ-চকচকে নয়, কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে আপস নেই। বন্ধুবান্ধব নিয়ে সেহরি করতে চাইলে এখানে আড্ডার আবহও পাওয়া যায়। দাম তুলনামূলক মধ্যম, পরিমাণ বেশ ভালো—যা রাতের শেষভাগে তৃপ্তি দেয়।

৩) বিসমিল্লাহ কাবাব

বিসমিল্লাহ কাবাব মূলত কাবাবপ্রেমীদের জন্য স্বর্গতুল্য। সেহরিতে তাদের শিক কাবাব, বটি কাবাব, চিকেন তন্দুরি, চিকেন চাপ ও পরোটা বেশ জনপ্রিয়। মসলার ভারসাম্য এমন যে অতিরিক্ত ঝাল নয়, আবার স্বাদেও ঘাটতি নেই। ছোট পরিসরের দোকান হলেও সার্ভিস দ্রুত, আর খাবার সবসময় গরম। যারা ভারী বিরিয়ানির বদলে কাবাব-রুটি দিয়ে সেহরি সারতে চান, তাদের জন্য এটি চমৎকার বিকল্প। স্বাদ ও সাশ্রয়ের সমন্বয় জায়গাটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

৪) বোখারী রেস্তোরাঁ

নাজিরাবাজার এলাকার বোখারী রেস্তোরাঁ পুরান ঢাকার খাবার ঐতিহ্যের অংশ। সেহরিতে এখানে পাওয়া যায় গরু ও খাসির বিভিন্ন পদ, খাসির তেহারি ও কাচ্চি, নেহারি, কালাভুনা এবং সুস্বাদু ডাল। বড় কড়াইয়ে ধীরে ধীরে রান্না হওয়া মাংসে মসলার গভীরতা টের পাওয়া যায়। সাদামাটা সাজসজ্জা, কিন্তু খাবারে আস্থা রাখার মতো মান। পরিবার বা ছোট গ্রুপ নিয়ে গেলে আরাম করে বসে খাওয়া যায়। সেহরিতে তাদের চিকেন ভেজিটেবল তাওয়া চাপও অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে।

৫) ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশান

ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশান সেহরিকে দেয় আন্তর্জাতিক বুফের রূপ। আরবি, এশিয়ান ও কন্টিনেন্টাল নানা পদ সাজানো থাকে পরিপাটি কাউন্টারে। নরম আলো, প্রশস্ত ডাইনিং স্পেস আর পেশাদার সার্ভিস—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা হয় প্রিমিয়াম। যারা পরিবার নিয়ে বা করপোরেট আড্ডার আমেজে সেহরি করতে চান, তাদের জন্য এটি উপযুক্ত। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও মান ও বৈচিত্র্যে তা পুষিয়ে যায়। বিশেষ করে লাইভ স্টেশনগুলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

৬) বাহার

রেনেসাঁ ঢাকা গুলশানের বাহার রেস্টুরেন্ট সেহরিতে মাল্টিকুইজিন বুফে সাজায় রুচিশীল আয়োজনে। দেশি-বিদেশি নানা পদ, সালাদ বার, ডেজার্ট কাউন্টার—সবই থাকে সুসংগঠিত। পরিবেশ শান্ত ও অভিজাত, যা রাতের ক্লান্তি দূর করে। পরিবার নিয়ে বা বিশেষ উপলক্ষে সেহরি করতে চাইলে এটি মানানসই। লাইভ কুকিং স্টেশন থেকে গরম খাবার নেওয়ার সুযোগ বাড়তি আনন্দ দেয়। স্বাস্থ্য-সচেতনদের জন্যও হালকা ও পুষ্টিকর অপশন রাখা হয়।

৭) হাক্কা ঢাকা

হাক্কা ঢাকা চাইনিজ ও ফিউশন খাবারের জন্য পরিচিত। সেহরির সময়ে তাদের ফ্রাইড রাইস, নুডলস, চিলি চিকেন বা বিফ মানচুরিয়ান বেশ জনপ্রিয়। যারা একটু ভিন্ন স্বাদে সেহরি করতে চান, তাদের জন্য এটি ভালো বিকল্প। পরিবেশ আধুনিক, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার উপযোগী। পরিমাণ যথেষ্ট, আর মসলার স্বাদ বাংলাদেশি রুচির সঙ্গে মানানসই করে সাজানো। রাতের গভীরতার মাঝেও উষ্ণ পরিবেশ বজায় রাখে এই রেস্টুরেন্ট।

৮) সিজনাল টেস্টস

দ্য ওয়েস্টিন ঢাকার সিজনাল টেস্টস সেহরিকে নিয়ে যায় বিলাসী অভিজ্ঞতায়। বিশাল বুফে স্প্রেডে থাকে দেশি-বিদেশি পদ, লাইভ গ্রিল, তাজা ফল ও ডেজার্ট। আলো-আঁধারি অভিজাত পরিবেশে রাতের খাবার হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। সার্ভিস টিমের পেশাদারিত্ব চোখে পড়ে প্রতিটি ধাপে। করপোরেট বা পারিবারিক আয়োজনের জন্য এটি জনপ্রিয়। দাম বেশি হলেও মান, স্বাদ ও পরিবেশ মিলিয়ে সেহরিকে করে তোলে স্মরণীয়।

৯) ইস্তানবুল রেস্টুরেন্ট ঢাকা

ইস্তানবুল রেস্টুরেন্ট ঢাকা টার্কিশ ও মিডল-ইস্টার্ন স্বাদের জন্য পরিচিত। সেহরিতে তাদের কাবাব প্ল্যাটার, মান্দি, হামুস ও নরম পিটা ব্রেড বেশ চাহিদাসম্পন্ন। মসলার ব্যবহার তুলনামূলক মৃদু, কিন্তু স্বাদ গভীর ও সুগন্ধি। সাজসজ্জায় আছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোঁয়া, যা অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে তোলে। যারা ভিন্ন সংস্কৃতির খাবারে আগ্রহী, তাদের জন্য এটি দারুণ জায়গা। পরিবার নিয়ে আরাম করে বসে সেহরি করার পরিবেশও রয়েছে।

১০) স্কাইপুল রেস্টুরেন্ট

সিক্স সিজনস হোটেলের স্কাইপুল রেস্টুরেন্ট ছাদঘেরা অভিজ্ঞতায় সেহরিকে করে তোলে বিশেষ। শহরের আলোঝলমলে দৃশ্যের মাঝে বাফে বা সেট মেনু উপভোগ করা যায়। দেশি-বিদেশি নানা পদ, লাইভ কাউন্টার ও ডেজার্ট স্টেশন আকর্ষণীয়। রোমান্টিক বা বিশেষ আয়োজনের জন্য জায়গাটি মানানসই। দাম প্রিমিয়াম হলেও পরিবেশ ও উপস্থাপনায় আছে আলাদা মাত্রা। ভোরের আগে শহরকে অন্য চোখে দেখার সুযোগ দেয় এই স্থান।

১১) বাংকা: অরিয়েন্টাল অল-ইউ-ক্যান-ইট

এই রেস্টুরেন্টটি মূলত এশিয়ান বুফের জন্য পরিচিত। সেহরিতে তাদের সুশি, নুডলস, কারি ও গ্রিলড আইটেম বৈচিত্র্য আনে। ‘অল-ইউ-ক্যান-ইট’ ধারণায় ইচ্ছেমতো চেখে দেখার সুযোগ থাকে। পরিবেশ আধুনিক ও তরুণদের উপযোগী। বন্ধুদের সঙ্গে ভিন্ন স্বাদের সেহরি উপভোগ করতে চাইলে এটি ভালো পছন্দ। খাবারের উপস্থাপনায় যত্ন দেখা যায়, যা অভিজ্ঞতাকে আরও উপভোগ্য করে।

১২) স্বদেশী

স্বদেশী তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক বিকল্প। সেহরিতে এখানে পাওয়া যায় ভাত, খিচুড়ি, নানা পদের ভর্তা, গরু ও মুরগির ভুনা, লইট্টা মাছ ভাজা, ডাব চিংড়ি, মগজ ভুনা ও ডাল। ঘরোয়া স্বাদ ও পরিমিত মসলার ব্যবহার জায়গাটিকে জনপ্রিয় করেছে। ছাত্রছাত্রী বা তরুণদের আড্ডার জন্য উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। দাম হাতের নাগালে, কিন্তু স্বাদে আপস নেই। সহজ-সরল আয়োজনে পেটভরে সেহরি সেরে নেওয়ার জন্য এটি নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।