শহুরে লোডশেডিংয়ের সেই দিনগুলো

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

লোডশেডিংয়ের সেই দিনগুলোর কথা মনে আছে কি? যখন সন্ধ্যায় পড়ার টেবিল থেকে খানিক মুক্তি মিলতো, গরম থেকে বাঁচতে ছাদে কিংবা বারান্দায় প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ জমে উঠত এই লোডশেডিংয়ের কারণে? আর ইলেক্ট্রিসিটি ফিরে আসা মাত্রই পাড়ার সবার হই হই করে সেই এক আনন্দের চিৎকার!

হঠাৎই মনে পড়লো আগেকার সেই লোডশেডিংয়ের কথা। এখনকার জেন-জি কিংবা এর আগের প্রজন্মের কাছে এই দিনগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই! কিন্তু যাদের বড় হওয়া, বেড়ে ‍ওঠা নব্বইয়ের দশকে, তাদের কাছে আছে।

তখনো ভাড়া বাসার দিন, মানে ঢাকা শহরে আধুনিক ফ্ল্যাট বাসার প্রচলন শুরু হয়নি। অলি-গলিতে দুই-তিনতলা বাড়ি, আর বাড়িগুলোর সামনে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা। আমরা বিকেলে বড়দের হাত ধরে এখানে সমবয়সীরা একত্রিত হতাম। লোডশেডিংয়ের শুরু হতো চৈত্র থেকে। হয়তো আমরা বিকেলে ঘরে ফিরে একটু পড়তে বসেছি, হঠাৎই ইলেক্ট্রিসিটি মিলিয়ে গেল।

প্রথম প্রথম পড়া থেকে বাঁচা গেলেও এরপর এলো মোমবাতি। মোমবাতির দাম তখনো বেশ কম। একটি মোমবাতি দুই টাকা। এরপর সেই দাম এক সময় এসে ঠেকল ১০ টাকায়, তারপর ১৫...ততদিনে অবশ্য বাজারে জায়গা করে নিয়েছে ব্যাটারিচালিত চার্জার লাইট। মায়েরা লম্বা আকৃতির মেরুন রঙের সেই চার্জার লাইটের বেশ যত্ন নিতেন, যাতে করে টেকসই হয় দীর্ঘদিন।

তবে সেই চার্জার লাইটের সময় ফুরিয়ে এসেছিল চাইনিজ চার্জার লাইটের যুগে। এবারকার চাইনিজ ব্যাটারিচালিত চার্জার লাইটগুলো আগেকার মতোন নয়। এগুলো হরেক রঙের, আকারে ছোট, যাকে আমরা বলি ‘পোর্টেবল’। তবে এর আয়ুষ্কাল মায়েদের কেনা অতি যত্নের সেই পুরোনো মেরুন রঙের চার্জার লাইটের মতো হলো না। বাবারা এই কিনে আনছে, তো মাস দুয়েকের মধ্যে আর কাজই করছে না!

আরও একটা বিষয় এই লোডশেডিংয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—হাতপাখা। এটি এমনিতেই আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য। একইসঙ্গে লোডশেডিংয়ের সময় এই ৫ কিংবা ১০ টাকার পাখাগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। আমাদের স্কুলের সামনে, নিউমার্কেট কিংবা ফুটপাথের দোকানে বিভিন্ন রঙিন হাতপাখা, প্লাস্টিকের পাখা এবং সবশেষ মনে করতে পারি ফুলেল-লেস দেওয়া জাপানিজ হাতপাখা নিয়ে দোকানিরা বসতেন। বাসায় লোডশেডিং, স্কুলে লোডশেডিং, মাস্টারের বাসায় লোডশেডিং...আর সবার হাতে একটি করে পাখা।

পরবর্তীতে সেই একটি পাখার দাম বেড়ে গিয়ে দাঁড়াল ২০-২৫ টাকায়। এমনকি ৫০-১০০ টাকাতেও! আমরা স্কুলব্যাগে ছোট একটি পাখা রাখতে ভুলতাম না। স্কুলে যেই লোডশেডিং শুরু হতো, শিক্ষকেরা বিরতি দিতেন। আমরা বসে সেই পাখা দিয়েই গরম থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা চালাতাম। আবার কোনো সহপাঠীর হাতে জাপানিজ পাখা দেখলে একটু মন খারাপও হতো! কেননা জাপানিজ ফুলেল-লেস দেওয়া পাখাগুলোর মূল্য একটি বেশি যে!

শুরুর দিকে ‘আমার দেখা লোডশেডিং’ ছিল বাড়ির সামনে সেই ফাঁকা জায়গাটুকুতে সবার একত্রিত হওয়া। এরপর সেখান থেকে শুরু হলো বারান্দা কিংবা ছাদে বসে গল্প। এরপর প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল পেরিয়ে কলেজ জীবনে একদিন দেখলাম বাজারে এসেছে ‘আইপিএস’। প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা একটু অবস্থাসম্পন্ন, তাদের ঘরে আর লোডশেডিং হচ্ছে না! এদিকে আমরা গরমে অন্ধকারে বসে থাকি!

আমাদের মধ্যবিত্ত মায়েরা, যারা সংসারের খরচা থেকে কিছু টাকা জমিয়ে সেই মেরুন রঙের চার্জার লাইট কিনে অতি যত্ন করে রাখতেন, তারাই বলা শুরু করলেন—‘ঘরে আইপিএস আনা হোক’। ফলে এবার অর্থ জমিয়ে ঘরে আনা হলো ব্যাটারিচালিত সেই আইপিএস। এরপর বাজারে সেই চাইনিজ চার্জার লাইটের মতোই বিভিন্ন বিদেশি-দেশি কোম্পানি জায়গা দখল করে নিল। ফলে পণ্যের দামও কিছুটা কমলো। শহুরে মধ্যবিত্তের নাগালে এলো এই আইপিএস, যা শুরুতে কেবল অবস্থাসম্পন্ন প্রতিবেশীর ঘরে দেখা যেত।

তারপর আর কী! শুরুতে দুটা রুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ দিয়ে শুরু হলেও এখন বাসায় দিব্যি প্রতিটা ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর—সবখানেই চলছে আইপিএসের উপকারিতা। ফলে ধীরে ধীরে লোডশেডিংয়ের সময়ে সেই যে বারান্দা কিংবা শহুরে উঠোনে বসে কার কী খবর জানতে চাইতাম, সেটা হারিয়ে গেল।

এরপর তো মোবাইলে ডেটার যুগ এলো, সকলের জীবন হতে লাগলো ‘একান্তই ব্যক্তিগত’। এই যুগের আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকা ছেলেমেয়েরা জানবেই না লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যা বলে অন্যরকম এক আমেজও যে ছিল। মাঝেমধ্যেই নিজের ঘরের শিশুদের কথা ভাবি—তাদের না আছে খেলার মাঠ, না একটু ফুরসত! হাতে হাতে আছে মোবাইল কিংবা ট্যাব।

এটা ঠিক, গরমে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলে এখন আর শিশু কিংবা বয়স্কদের কষ্ট হচ্ছে না। অনেক সুবিধাই নিয়ে এসেছে আধুনিক যন্ত্র। তবুও মনের এক কোণে কোথাও যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে ফেলে আসা সেই দিনগুলো। হঠাৎ হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায়, আর ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতের সেই নস্টালজিয়ায়। ভাবায়—ইশ! কী অদ্ভুত ভালো দিনগুলোই না কাটিয়েছিলাম আমরা। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই দিনগুলোতেই যদি ফিরে যেতে পারতাম!