অফিসে কাজের কৃতিত্ব অন্য কেউ নিয়ে নিলে কী করবেন?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

অফিসে একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করলেন, নতুন একটি আইডিয়া দিলেন কিংবা কোনো জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করলেন। কিন্তু মিটিংয়ে গিয়ে দেখলেন, আপনার অবদানের কথা উল্লেখই করা হলো না। বরং অন্য কেউ সেই কাজের কৃতিত্ব নিয়ে প্রশংসা পাচ্ছেন। এমন অভিজ্ঞতা কর্মজীবনে অস্বাভাবিক নয়। কখনো এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটে, কখনো আবার যোগাযোগের ঘাটতি বা দলগত কাজের প্রকৃতির কারণেও হতে পারে। তবে যে কারণেই হোক, নিজের কাজের স্বীকৃতি না পাওয়া হতাশাজনক।

এমন পরিস্থিতিতে কী করতে পারেন?

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না

কাজের কৃতিত্ব অন্য কেউ নিয়ে নিলে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। তবে মিটিংয়ের মাঝখানে তর্কে জড়িয়ে পড়া বা প্রকাশ্যে কাউকে অভিযুক্ত করা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। আগে পুরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করুন। এটি ইচ্ছাকৃত ছিল, নাকি ভুলবশত ঘটেছে সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, কর্মক্ষেত্রে শুধু কী বলছেন তা নয়, কীভাবে বলছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই অভিযোগ শান্তভাবে তুললে যে ফল পাওয়া যায়, উত্তেজিত হয়ে বললে অনেক সময় তা পাওয়া যায় না। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বিচক্ষণ প্রতিক্রিয়াই বেশি কার্যকর।

নিজের অবদানের রেকর্ড রাখুন

ই-মেইল, শেয়ারড ডকুমেন্ট, মিটিং নোট বা মেসেজ—কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা ভালো অভ্যাস। এতে প্রয়োজন হলে সহজেই দেখানো যায় কোন অংশে আপনার অবদান ছিল। এটি কাউকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের কাজের রেকর্ড রাখার জন্য। কয়েক মাস পর কোনো প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে আলোচনা হলে সবার পক্ষে মনে রাখা কঠিন হতে পারে, কোন কাজটি কে করেছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে নিজের কাজের নথি থাকলে সেটি শুধু অন্যদের নয়, নিজের কাছেও পরিষ্কার থাকে। বিশেষ করে বার্ষিক মূল্যায়ন, পদোন্নতি বা নতুন দায়িত্বের বিষয়ে আলোচনা হলে এসব তথ্য নিজের অবদান তুলে ধরতে সাহায্য করে।

নিজের কাজ নিজেই তুলে ধরতে শিখুন

অনেকেই মনে করেন, ভালো কাজ করলে সেটি নিজে থেকেই সবার চোখে পড়বে। বাস্তবে সব সময় তা হয় না। কোনো প্রকল্প শেষ হলে সংক্ষিপ্তভাবে জানানো যেতে পারে, আপনি কোন অংশে কাজ করেছেন এবং কী ফল এসেছে। এটি আত্মপ্রচার নয়, বরং পেশাগত যোগাযোগের অংশ।

ব্যক্তিগতভাবে কথা বলুন

যদি মনে হয় কোনো সহকর্মী আপনার কাজের কৃতিত্ব নিয়েছেন, তাহলে সবার সামনে বিষয়টি না তুলে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা ভালো। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতেই পারেন না যে অন্যের অবদান উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। শান্তভাবে বিষয়টি তুলে ধরলে সমাধান পাওয়া সম্ভব।

দলগত কাজের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পরিষ্কার রাখুন

গ্রুপ প্রজেক্ট বা দলগত কাজে কে কী দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি শুরুতেই পরিষ্কার থাকলে পরে বিভ্রান্তি কম হয়। এতে কোনো সাফল্য এলে কার অবদান কোথায় ছিল, সেটিও বোঝা সহজ হয়। বিশেষ করে বড় কোনো প্রকল্পে কাজ শুরু হওয়ার সময় অনেক বিষয় মুখে মুখে ঠিক করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কে কোন অংশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তা নিয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে। কেউ মনে করতে পারেন তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, আবার আরেকজনের ধারণা হতে পারে প্রকল্পের মূল দায়িত্ব তার ওপরই ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে শুরু থেকেই দায়িত্বগুলো স্পষ্টভাবে ভাগ করে নেওয়া ভালো।

ম্যানেজারের সঙ্গে নিয়মিত আপডেট শেয়ার করুন

শুধু কাজ শেষ হলে নয়, কাজ চলাকালেও অগ্রগতির খবর জানানো ভালো। এতে দায়িত্ব ও অবদানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিষ্কার ধারণা থাকে। ফলে পরে কৃতিত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, নিজের কাজের খবর জানানো আর নিজের প্রশংসা করা এক বিষয় নয়। কর্মক্ষেত্রে স্বচ্ছ যোগাযোগের অংশ হিসেবেই ম্যানেজারকে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হয়। আর এই অভ্যাস ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি কমানোর পাশাপাশি কর্মীর নির্ভরযোগ্যতাও তুলে ধরতে সাহায্য করে।

শুধু একবার নয়, বারবার ঘটছে কি না খেয়াল করুন

একটি ঘটনা আর একটি প্যাটার্ন এক জিনিস নয়। কোনো সহকর্মী একবার আপনার অবদান উল্লেখ করতে ভুলে যেতে পারেন। কিন্তু যদি একই ঘটনা বারবার ঘটে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ তখন এটি কেবল ভুল নয়, আচরণগত সমস্যা।

তাই কোনো ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্তে না গিয়ে কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করুন। খেয়াল করুন, বিষয়টি কি শুধু আপনার সঙ্গেই হচ্ছে, নাকি অন্যদের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। যদি একই ব্যক্তি নিয়মিতভাবে অন্যদের কাজের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে শুধু মনে মনে বিরক্ত না হয়ে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন। বিষয়টি যদি শুধু আপনার ক্ষেত্রেই বারবার ঘটে থাকে, তাহলে নিজের অবদান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন। মিটিংয়ে নিজের কাজের অগ্রগতি নিজেই জানান, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত যতটা সম্ভব ই-মেইল বা শেয়ারড ডকুমেন্টে রাখুন এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন। তাতেও পরিবর্তন না এলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে পেশাদারভাবে বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে।

নিজের নেটওয়ার্ক তৈরি করুন

শুধু একজন ব্যক্তি আপনার কাজ সম্পর্কে জানেন, এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা ভালো। বিভিন্ন টিম, সহকর্মী এবং সুপারভাইজারদের সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ থাকলে কাজের দৃশ্যমানতা বাড়ে। ধরুন, আপনি একটি ভালো আইডিয়া দিলেন। কিন্তু সেটি জানেন শুধু আপনি আর আপনার টিম লিড। পরে যদি অন্য কেউ সেই আইডিয়ার কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন বিষয়টি প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যদি কাজের অগ্রগতি টিম মিটিংয়ে আলোচনা হয়, শেয়ারড ডকুমেন্টে সবার মন্তব্য থাকে বা একাধিক সহকর্মী প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে কার অবদান কোথায় ছিল তা সবার কাছেই পরিষ্কার থাকে।

সব লড়াই লড়তে হবে না

কখনো কখনো ছোটখাটো কৃতিত্ব নিয়ে তর্কে জড়ানোর চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুনাম গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বিষয়কে সংঘাতে রূপ না দিয়ে কোন বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার মতো, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি দেখেন আপনার কাজের স্বীকৃতি সামগ্রিকভাবে মিলছে এবং ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন, তাহলে সেটি ছেড়ে দেওয়াই অনেক সময় বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি তুলুন

যদি কারও কারণে ধারাবাহিকভাবে আপনার কাজের স্বীকৃতি না পাওয়া যায় এবং ব্যক্তিগত আলোচনাতেও সমাধান না আসে, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা মানবসম্পদ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে তার আগে তথ্য ও উদাহরণ প্রস্তুত রাখা জরুরি। এ ধরনের আলোচনায় আবেগ নয়, তথ্যই সবচেয়ে বেশি কাজে আসে। ‘আমার মনে হয়’ বা ‘আমার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে’ বলার চেয়ে কোন প্রকল্পে কী ঘটেছে, কোন কাজের দায়িত্ব আপনার ছিল এবং কোথায় আপনার অবদান উপেক্ষিত হয়েছে এসব নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে পারলে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে ভাবাই ভালো। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি আলোচনা, দায়িত্ব পরিষ্কার করা বা যোগাযোগের উন্নতির মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।