এক চাকরিতে দীর্ঘদিন থাকা, নাকি ঘন ঘন বদল—কোনটি ভালো?

জারীন তাসনিম

একই প্রতিষ্ঠানে আট-দশ বছর ধরে কাজ করছেন একজন। অন্যদিকে তারই কোনো বন্ধু হয়তো একই সময়ে তিন বা চারটি প্রতিষ্ঠান বদলে ফেলেছেন। প্রথমজনের পেশাগত জীবনে স্থিতিশীলতা এসেছে, দ্বিতীয়জন হয়তো প্রতিবার চাকরি বদলে পেয়েছেন নতুন অভিজ্ঞতা, ভালো পদ কিংবা বেশি বেতন। তাহলে ক্যারিয়ারের জন্য কোন পথটি ভালো?

একসময় একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করাকে পেশাগত জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখা হতো। এখন কয়েক বছর পরপর নতুন প্রতিষ্ঠানে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তবে একটি চাকরিতে কত বছর থাকতে হবে বা কখন সেটি বদলাতে হবে, এর ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। বরং বর্তমান চাকরিটি আপনার ক্যারিয়ারে কী যোগ করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন থাকলে কাজের গভীরে যাওয়া যায়

একটি প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর কাজ করলে শুধু নিজের দায়িত্ব নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন সম্পর্কেও ধারণা তৈরি হয়। কোন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে, সমস্যার সমাধান কীভাবে হয় কিংবা কার সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে হয়, এসব বুঝতে সময় লাগে। ফলে নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে গভীর অভিজ্ঞতা তৈরি করার সুযোগ পাওয়া যায়।

সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কাছেও একজন কর্মীর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। বড় প্রকল্প বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীরা এগিয়ে থাকতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পদোন্নতির সুযোগ থাকলে ধীরে ধীরে নেতৃত্বের পর্যায়ে যাওয়ার পথও তৈরি হতে পারে।

দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার আরেকটি দিক হলো সম্পর্ক। সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বছরের পর বছর কাজ করলে পেশাগত সম্পর্ক গভীর হয়। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক পরামর্শ, রেফারেন্স কিংবা অন্য কোনো পেশাগত সুযোগের ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।

প্রতিষ্ঠানভেদে দীর্ঘমেয়াদি কর্মীদের জন্য গ্র্যাচুইটি, অবসরকালীন সুবিধা বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও থাকতে পারে। ফলে কারও কাছে একই প্রতিষ্ঠানে থাকার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে।

দীর্ঘদিন থাকা মানেই সব সময় এগিয়ে যাওয়া নয়

একটি পরিচিত কর্মপরিবেশে স্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বস্তিই কখনো কখনো কমফোর্ট জোন হয়ে উঠতে পারে। নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে বলে কেউ হয়তো ভালো সুযোগ সামনে এলেও সেটি নিয়ে ভাবতে চান না।

আবার একই ধরনের কাজ বছরের পর বছর করতে থাকলে দক্ষতার পরিধি সীমিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে যে পেশাগুলোতে প্রযুক্তি বা কাজের ধরন দ্রুত বদলায়, সেখানে নতুন বিষয় শেখার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

তাই দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে আছেন বলেই সেখানে থেকে যেতে হবে, এমন নয়। সময়ের সঙ্গে আপনার কাজ ও অবস্থানও বদলাচ্ছে কি না, সেটি দেখা দরকার।

চাকরি বদলালে অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়তে পারে

নতুন প্রতিষ্ঠানে গেলে নতুন সহকর্মী, ভিন্ন কর্মসংস্কৃতি এবং কাজের অন্য ধরনের পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় হয়। একই ধরনের কাজও দুটি প্রতিষ্ঠানে দুইভাবে করা হতে পারে। ফলে কয়েকটি ভিন্ন পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা একজন কর্মীকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।

চাকরি বদলের সময় অনেকেই বর্তমান বেতনের চেয়ে বেশি বেতন নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ পান। নতুন প্রতিষ্ঠান উচ্চতর পদ বা আগের চেয়ে বড় দায়িত্বও দিতে পারে। তাই বর্তমান কর্মস্থলে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক বা পেশাগত অগ্রগতি না হলে নতুন সুযোগ খোঁজা ক্যারিয়ারের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

এক্ষেত্রে নেটওয়ার্কও ভিন্নভাবে তৈরি হয়। এক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকলে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে, আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে পেশাগত পরিচিতির পরিধি বাড়তে পারে।

কখন চাকরি বদলানোর কথা ভাববেন?

কাজে একটি খারাপ দিন গেল বা সহকর্মীর সঙ্গে মতের অমিল হলো বলেই চাকরি ছাড়তে হবে, এমন নয়। তবে কিছু বিষয় দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে নতুন সুযোগের দিকে তাকানো যেতে পারে।

একই পদে বছরের পর বছর আছেন, কিন্তু সামনে পদোন্নতির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নতুন কিছু শেখার সুযোগও নেই। অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব বাড়লেও বেতন দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় রয়েছে। কিংবা প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো পদই নেই, যেখানে ভবিষ্যতে নিজেকে দেখতে চান। এসব ক্ষেত্রে নিজের ক্যারিয়ার কোন দিকে যাচ্ছে, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নিজের বেতন বাজারের সঙ্গে তুলনা করাও কাজে দিতে পারে। একই ধরনের অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের পদ ও বেতন দিচ্ছে, চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে বা নিজের পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে সে সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়।

তবে সরাসরি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আগে বর্তমান প্রতিষ্ঠানেই পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ আছে কি না, সেটি দেখা ভালো। বেতন, পদোন্নতি, নতুন দায়িত্ব কিংবা অন্য বিভাগে যাওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। সেখানে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ না থাকলে নতুন চাকরি খোঁজার সিদ্ধান্ত আরও পরিষ্কার হয়।

ঘন ঘন বদলানোরও কিছু সমস্যা আছে

নতুন সুযোগের জন্য চাকরি বদলানো স্বাভাবিক। কিন্তু খুব অল্প সময় পরপর প্রতিষ্ঠান বদলালে নিয়োগদাতার মনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হতে পারে, আগের চাকরিগুলো এত দ্রুত ছাড়ার কারণ কী ছিল।

আরেকটি বিষয় হলো, নতুন কর্মস্থলে গিয়ে কাজের ধরন বোঝা, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং নিজের জায়গা তৈরি করতে সময় লাগে। বারবার প্রতিষ্ঠান বদলালে প্রতিবারই এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। খুব অল্প সময় কোনো প্রতিষ্ঠানে থাকলে বড় কোনো প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখার অভিজ্ঞতাও সব সময় পাওয়া যায় না।

তবে শুধু সিভিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেই সেটি নেতিবাচক, এমনও নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে যুক্তিসংগত কারণ থাকা এবং সেই অভিজ্ঞতাগুলো আপনার পেশাগত জীবনে কী যোগ করেছে, তা দেখাতে পারা।

নতুন অফার পেলে হিসাবটা পুরো করুন

নতুন চাকরিতে বেতন বেশি হলে সেটি আকর্ষণীয় লাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দিয়ে দুটি চাকরির তুলনা করলে অনেক কিছু বাদ পড়ে যায়।

নতুন অফিসে যাতায়াতে কত সময় লাগবে, কাজের সময় কেমন, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কী, দায়িত্ব কতটা বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিবেশ কেমন, এসবও জেনে নেওয়া দরকার। বেশি বেতনের বিনিময়ে যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বেশি সময় দিতে হয়, সেটি আপনার জন্য গ্রহণযোগ্য কি না, সেই হিসাবও করতে হবে।

বর্তমান চাকরি ছাড়ার আগে নতুন প্রতিষ্ঠানের লিখিত অফার হাতে থাকা ভালো। পদ, বেতন, যোগদানের তারিখ এবং গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো পরিষ্কারভাবে জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নিলে অনিশ্চয়তা কমে।

ক্যারিয়ারের পর্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ

ক্যারিয়ারের একেক পর্যায়ে চাহিদাও একেক রকম হতে পারে। শুরুর দিকে কেউ বিভিন্ন ধরনের কাজ করে নিজের আগ্রহ ও দক্ষতার জায়গা খুঁজে দেখতে পারেন। কয়েকটি ভিন্ন পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা তখন নিজের পছন্দ বোঝার ক্ষেত্রেও সাহায্য করতে পারে।

অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারও কাছে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গভীর দক্ষতা, নেতৃত্বের সুযোগ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আবার অন্য কেউ মাঝপথেও সম্পূর্ণ নতুন ক্ষেত্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই ক্যারিয়ারের পর্যায় বিবেচনায় রাখা যায়, কিন্তু এটিকেও নিয়ম হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই

একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকা ভালো, নাকি কয়েক বছর পরপর চাকরি বদলানো ভালো, তার উত্তর সবার জন্য এক হবে না। একই জায়গায় থেকেও একজন নিয়মিত নতুন দায়িত্ব পেতে পারেন, আবার অন্যজন সেখানে বছরের পর বছর একই অবস্থানে আটকে থাকতে পারেন।

তাই শুধু কত বছর হয়ে গেল, সেই হিসাব না করে দেখা দরকার চাকরিটি এখনো আপনার জন্য অর্থবহ কি না। আপনার কাজের যথাযথ মূল্য পাচ্ছেন কি না, সামনে এগোনোর জায়গা আছে কি না এবং বর্তমান অবস্থানটি আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে মেলে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরই সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সাহায্য করবে।

অন্যরা চাকরি বদলাচ্ছেন বলে বদলাতে হবে না। আবার শুধু পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না বলেও থেকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যারিয়ারে থাকা বা যাওয়ার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত সময়ের নয়, সুযোগ এবং অগ্রগতির হিসাব।