অফিসে ‘সব কাজের মানুষ’ হয়ে উঠছেন না তো?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

অফিসে কারও ছুটি, তার কাজটা আপাতত আপনিই করে দিলেন। নতুন সহকর্মী একটি বিষয় বুঝতে পারছেন না, তাকেও সাহায্য করলেন। মিটিংয়ের আগে জরুরি একটি কাজ বাকি, সেটিও আপনার কাছে এলো।

সহকর্মীদের সাহায্য করা কিংবা প্রয়োজনে নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করা পেশাগত জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু এমনটা যদি মাঝেমধ্যে না হয়ে নিয়মিত ঘটতে থাকে? নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করা, নতুন কর্মীকে শেখানো, জরুরি কাজ সামলানো, এমনকি কার দায়িত্ব তা পরিষ্কার নয় এমন কাজও আপনার কাছে চলে আসছে। একসময় অফিসে অলিখিত একটি ধারণা তৈরি হতে পারে, কাজটি যারই হোক, আপনাকে দিলেই হয়ে যাবে।

দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মী হওয়া ভালো। তবে সেই দক্ষতার কারণেই অজান্তে অফিসের ‘সব কাজের মানুষ’ হয়ে উঠছেন কি না, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার।

সাহায্য কখন নিয়মিত দায়িত্ব হয়ে যাচ্ছে?

একদিন কোনো সহকর্মীর কাজ করে দেওয়া আর প্রতি সপ্তাহে তার কাজের একটি অংশ সামলানো এক বিষয় নয়। প্রথমটি সহযোগিতা, দ্বিতীয়টি ধীরে ধীরে আপনার দায়িত্বের অংশ হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি বোঝার জন্য গত কয়েক সপ্তাহের কাজের দিকে তাকান। এমন কোনো দায়িত্ব কি নিয়মিত করছেন, যা শুরুতে সাময়িকভাবে নিয়েছিলেন? এমন কাজ কি আপনার কাছে আসছে, যার জন্য আসলে অন্য কেউ দায়িত্বপ্রাপ্ত? নিজের মূল কাজ শেষ করতে কি এখন আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বারবার ‘হ্যাঁ’ হলে বুঝতে হবে, আপনার কাজের পরিধি হয়তো অজান্তেই বদলে যাচ্ছে।

সব কাজে ‘হ্যাঁ’ বলতে বলতেই কি এই অবস্থা?

বিশেষ করে নতুন কর্মস্থলে নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে অনেকেই কোনো অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে চান না। মনে হতে পারে, কাজ ফিরিয়ে দিলে হয়তো বস অসন্তুষ্ট হবেন বা সহকর্মীরা অসহযোগী ভাববেন। ফলে হাতে থাকা কাজের পরিমাণ না ভেবেই নতুন দায়িত্ব নেওয়া হয়। প্রথম দিকে হয়তো সামলে নেওয়াও সম্ভব হয়। কিন্তু নিয়মিত এমন হতে থাকলে একসময় নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোই তাড়াহুড়া করে শেষ করতে হয় কিংবা অফিসের পরও কাজ করতে হয়। আর আপনি প্রতিবারই সব সামলে ফেললে অন্যদের কাছেও মনে হতে পারে, আপনার হাতে আরও কাজ দেওয়ার সুযোগ আছে।

দক্ষতার পুরস্কার যেন শুধু আরও কাজ না হয়

যিনি দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ শেষ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার ওপর আস্থা রাখাটাই স্বাভাবিক। কোনো জরুরি দায়িত্ব দক্ষ কর্মীর হাতে দেওয়াকে সক্ষমতার স্বীকৃতিও বলা যায়। তবে ভালো কাজের ফল হিসেবে যদি শুধু কাজের পরিমাণই বাড়তে থাকে, তখন বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। দায়িত্ব বাড়ছে, কিন্তু পদ, বেতন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কিংবা পেশাগত অবস্থানে তার কোনো প্রতিফলন নেই—এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। একসময় দেখা যেতে পারে, একই পদে থেকেও আপনি এমন অনেক কাজ করছেন, যা আগে আপনার দায়িত্বের মধ্যে ছিল না। তখন বেশি কাজ করা আর ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়া এক বিষয় থাকছে না।

তাহলে কী করবেন?

সব অনুরোধে ‘হ্যাঁ’ নয়

প্রথমেই প্রতিটি অনুরোধে সঙ্গে সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসুন। নতুন কোনো কাজ এলে নিজের হাতে থাকা কাজগুলোর সঙ্গে সেটির অগ্রাধিকার মিলিয়ে দেখুন। ধরুন, আপনার হাতে দুটি জরুরি কাজ রয়েছে, এর মধ্যে তৃতীয় একটি দেওয়া হলো। সরাসরি ‘না’ বলার বদলে ব্যবস্থাপকের কাছে জানতে পারেন, কোন কাজটি আগে শেষ করা প্রয়োজন। এতে কাজ এড়িয়ে যাওয়া হয় না, আবার সবকিছুর দায়িত্বও একা নিজের ওপর নেওয়া হয় না।

করে দেওয়ার বদলে শিখিয়ে দিন

সহকর্মী কোনো কাজ বুঝতে না পারলে প্রতিবার নিজে করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কীভাবে করতে হবে, সেটি দেখিয়ে দিতে পারেন। প্রয়োজনীয় তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে বা কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, সেটিও বুঝিয়ে দেওয়া যায়। এতে সহকর্মী পরেরবার কাজটি নিজেই করতে পারবেন। আপনিও সহযোগিতা করলেন, কিন্তু কাজটির স্থায়ী দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিলেন না। এই ছোট পরিবর্তনটি বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে যখন একই ধরনের সাহায্য বারবার চাওয়া হচ্ছে।

বাড়তি কাজের হিসাব রাখুন

নিজের মূল দায়িত্বের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ করলে সেটির সংক্ষিপ্ত হিসাব রাখুন। কোন প্রকল্পে কাজ করেছেন, নতুন কী দায়িত্ব নিয়েছেন, কোনো সহকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন কি না কিংবা বাড়তি দায়িত্ব থেকে কী ফল এসেছে, সেগুলো লিখে রাখা যায়। কারণ প্রতিদিনের কাজের মধ্যে এসব সহজেই হারিয়ে যায়। কয়েক মাস পর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সময় হয়তো নিজেই সব মনে করতে পারবেন না। পদোন্নতি বা বেতন নিয়ে আলোচনার সময় শুধু ‘আমি অনেক বাড়তি কাজ করি’ বলার চেয়ে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ফল তুলে ধরা অনেক বেশি কার্যকর।

প্রয়োজন হলে বসের সঙ্গে কথা বলুন

কাজের পরিধি যদি সাময়িকভাবে নয়, স্থায়ীভাবে বদলে যায়, তখন বিষয়টি নিয়ে বসের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে নতুন দায়িত্বের কারণে নিজের মূল কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা নিয়মিত অফিসের সময়ের বাইরে কাজ করতে হলে বিষয়টি আর ফেলে রাখা ঠিক নয়।

আলোচনাটি অভিযোগ দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে কোন কোন দায়িত্ব সামলাচ্ছেন, কোনগুলো আপনার মূল কাজের বাইরে এবং কোন কাজগুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত, তা নিয়ে কথা বলতে পারেন। আর বাড়তি দায়িত্বটি যদি কার্যত আপনার পদের স্থায়ী অংশ হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন, পদোন্নতি, বেতন বা কাজের বিবরণে সেটি কীভাবে বিবেচিত হবে, সেটিও জানতে পারেন।

‘সব কাজ পারি’ আর ‘সব কাজ আমার’ এক নয়

অফিসে ভরসাযোগ্য মানুষ হওয়া একটি শক্তি। প্রয়োজনের সময় সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোও ভালো কর্মপরিবেশের অংশ। তাই নিজের দায়িত্বের বাইরে কখনোই কাজ করবেন না—এমন কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং বুঝতে হবে কোন বাড়তি দায়িত্বটি আপনাকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছে আর কোনটি শুধু আপনার কাজের বোঝা বাড়াচ্ছে। একইসঙ্গে সাহায্য করা এবং অন্যের দায়িত্ব নিজের করে নেওয়ার পার্থক্যটিও পরিষ্কার রাখা দরকার।

সব কাজ করতে পারা অবশ্যই দক্ষতা। কিন্তু সব কাজ আপনাকেই করতে হবে না—এই সীমাটি বুঝতে পারাও পেশাগত দক্ষতার অংশ।