ডিজিটাল যুগে রমজান: প্রচলিত ধারার এই বদলগুলো খেয়াল করেছেন?
পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে সূর্য। শহরজুড়ে রাত নামার প্রস্তুতি চলছে। ফুটপাতের ধারে নানা মুখরোচক খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসছে লোভনীয় ঘ্রাণ। পরিবারের সবাই একসঙ্গে ইফতারের টেবিলে, কানে আসছে শিশুদের উচ্ছ্বসিত নানা কথা।
রমজান মাসের এমন চিত্র আবহমান বাংলায় দীর্ঘদিনের। কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানেও পরিবর্তন এসেছে, ছোঁয়া লেগেছে আধুনিকায়নের। আর তাই তো বাসায় ইফতার তৈরির সময় রান্নাঘরের আলো আর সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের একসঙ্গে ইফতারের সময় মসজিদের বাতির পাশাপাশি আরেকটি আলো চোখে পড়ে—স্মার্টফোনের মৃদু আলো।
এই আধুনিক সময়ে প্রযুক্তির কল্যাণে রমজান যেন আর শুধু পরিবার বা মসজিদে সীমাবদ্ধ নেই। দূরত্ব কমিয়ে নানা কমিউনিটিকে একই ছাদের নিচে এনে দিয়েছে।
ডিজিটাল রান্নাঘর
একসময় মা-বোনেরা নিজের জানা রেসিপির পাশাপাশি রান্নার বই দেখে বিভিন্ন ইফতারি আইটেম ঘরে তৈরি করতেন। প্রয়োজনে বিকেলের দিকে পাড়ার দোকান থেকে পছন্দের আরও কিছু আইটেম যোগ হতো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইফতারের পরিচিত চিত্র এটাই। কিন্তু, সেখানে বড় পরিবর্তন এনেছে সোশ্যাল মিডিয়া।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা রুমা বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন ইফতারে নতুন নতুন কিছু খেতে চায়। তাই টিকটকে রেসিপি দেখে একদিন নিজেই জিলাপি বানিয়েছিলাম।’
দুই সন্তানের এই জননী বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে বসে রান্নার ভিডিও দেখি। যেটা ভালো লাগে নিজেরাই বানাই। এ কারণে আমাদের একসঙ্গে অনেকটা সময়ও কাটে, পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত হয়, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো সবাই মিলে অনেক আনন্দ করি।’
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া যেন রান্না শেখার বা নতুন নতুন আইটেম নিজের হাতে তৈরি করার জন্য নতুন স্কুল হয়ে উঠেছে। রমজান উপলক্ষে এখানে ট্র্যাডিশনাল থেকে শুরু করে ওয়েস্টার্ন সব ধরনের রান্নার রেসিপি ধাপে ধাপে দেখিয়ে দেওয়া হয়। অনেকের জন্যই টিকটক, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো প্লাটফর্মগুলো রান্না শেখার সুযোগ ও পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত করেছে।

ডিজিটাল চ্যারিটি
একইভাবে দানের পদ্ধতি ও পরিধিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। পবিত্র রমজানে সওয়াবের আশায় মানুষ সাধ্যমতো দান করেন। এখন ডিজিটাল মাধ্যমের কারণে এই বিষয়টি আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে।
আগে রমজানে সাধারণত মসজিদে দান করা হতো। কিংবা এলাকার দায়িত্বশীল কেউ সবার দানের টাকা সংগ্রহ করে গরিব ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন।
কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে সহজেই দানের আহ্বান জানানো যায়। এসব পোস্ট দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষ তাতে সাড়া দেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়ান। ফলে খুব দ্রুতই যথেষ্ট তহবিল সংগ্রহ করে যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফারহানা রমজানে তার বিভিন্ন পোস্ট থেকে প্রাপ্ত অর্থ নির্ভরযোগ্য সংস্থাগুলোতে দান করেন। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনে ব্যাংক ট্রান্সফার করে দানের টাকা পাঠিয়ে দেওয়া যায়। ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের কারণে দান করাও এখন অনেক সহজ হয়েছে।’
বিকাশ বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য থেকে এর সত্যতাও মেলে। ২০২৫ সালে বিকাশের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রমজান মাসে তাদের আর্থিক লেনদেন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এর থেকেই বোঝা যায়, বর্তমানে মানুষ ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দান করেন।
রমজানে স্বেচ্ছায় ঢাকায় ইফতার বিতরণের কাজে যুক্ত থাকেন মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকি প্রবাসীরাও আমাদের কাছে দানের অর্থ পাঠান। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের পোস্ট দেখে অনেক স্বেচ্ছাসেবক আসেন। এর ফলে কাজ যেমন দ্রুত করা যায়, সেইসঙ্গে পুরো কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হয়।’
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তি মানবসেবার ক্ষেত্রকেও এগিয়ে নিচ্ছে এবং মানুষের সদিচ্ছা ও সেটা বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করছে।
দূরের মানুষ কাছে
ইফতার বা সেহরির সময় পরিবারের সবাই যখন এক টেবিলে, তখন এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি হয়। তবে সবার পক্ষে সব সময় এটা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পরিবার ছেড়ে অন্য শহরে থাকেন। ফলে রমজানের দিনগুলোতে হাজারো শিক্ষার্থী পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকেন।
হোস্টেল জীবনে রমজানের আবহও থাকে একটু ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফিফাহ বলেন, ‘হোস্টেলে ইফতার বানানোর জন্য সবসময় পর্যাপ্ত সুবিধা থাকে না। আর পরিবারের মতো সেই পরিবেশটাও নেই। কিন্তু, তারপরও বিভিন্ন রান্নার ভিডিও দেখে বান্ধবীরা মিলে আমাদের কমন কিচেনে বিভিন্ন রেসিপি বানানোর চেষ্টা করি।’
তিনি বলেন, ‘রোজায় বাড়িতে রান্নার সময় ভিডিও কল দেই মাকে। মনে হয় যেন মায়ের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে আছি। বানানো হলে সবাই একসঙ্গে ইফতার করব।’
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আদনান কিছুটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানান। বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইফতার দেওয়া হয়। পরিবার ছাড়া ইফতার করতে তেমন ভালো লাগে না। পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো খুব মিস করি। তাই আমিও রান্নার বিভিন্ন ভিডিও দেখি, তারাবির নামাজের লাইভ স্ট্রিমিং ফলো করি, পরিবারের সবার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলি, ম্যাসেজ করি। শারীরিকভাবে তাদের থেকে দূরে থাকলেও মানসিকভাবে যেন তাদের কাছেই থাকি।’
এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই নয়, বরং দূরত্ব কমিয়ে মানুষকে নিয়ে এসেছে আরও কাছাকাছি।
কর্মজীবন ও রোজা দুটোকেই ব্যালেন্স করে চলা
কর্মজীবীদের জন্য রোজা রেখে অফিস করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে শহুরে জীবনের রোজা রেখে ট্র্যাফিক ঠেলে অফিসে যাওয়া, আবার কর্মব্যস্ত দিন পার করে বিশাল ট্র্যাফিক জ্যাম ঠেলে ঘরে ফেরার তাড়া থাকে প্রতিদিন। ঢাকা শহরের করপোরেট কিংবা সরকারি—মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের রোজা রেখে প্রতিদিনের অফিস যাতায়াত, মিটিং আর সারাদিনের এই কর্মব্যস্ততা একসঙ্গে সামলাতে হয়।
মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ সাবিহা রহমান বলেন, ‘রোজায় তো প্রায় প্রতিদিনই অফিস থেকে ফেরার পথে জ্যামে বসে থাকতে হয়। বেশিরভাগ দিন গাড়িতে থাকতেই মাগরিবের আজান হয়ে যায়। তখন গাড়িতে বসেই একটি খেজুর ও পানি খেয়ে ইফতার করি। সেই প্রস্তুতি নিয়েই অফিস থেকে বের হই।’
সারাদিনের এই ব্যস্ততার মধ্যেও ডিজিটাল মাধ্যম ধর্মচর্চায় সহায়তা করতে পারে। সাবিহা বলেন, ‘লাঞ্চ ব্রেকের জন্য যে সময়টা থাকে, তখন ছোট ছোট ইসলামিক রিমাইন্ডারগুলো ফলো করি। নিজে গিয়ে দান করা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় দান করি।’
তার মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সহজলভ্যতায় ধর্ম ও কর্মের মাঝে ভারসাম্য রাখা অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল যুগে ধর্মচর্চা
রমজান আত্মউপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির মাস। মুসলমানরা এ মাসে ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়কের ভূমিকা রাখছে। ইউটিউবে বিভিন্ন ধর্মীয় লেকচার, ফেসবুক রিলসে ধর্মীয় আলোচনা ও ছোট ছোট ইসলামিক রিমাইন্ডার—এসবই রমজান জুড়ে ধর্মীয় অনুশাসন পালন ও আমল করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
যারা ধর্মচর্চা করেন, তাদের কাছে এগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এসব ভিডিও থেকে তারা অনেক কিছু শিখতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সানিয়া বলেন, ‘ওয়াজ মাহফিলে বা এ ধরনের ধর্মীয় লেকটার শুনতে সবসময় যেতে পারি না। কিন্তু অনলাইনে বিজ্ঞ আলেমদের লেকচার প্রায়ই শুনি।’
বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় বক্তারা এই বিশাল সংখ্যক ডিজিটাল অডিয়েন্সের জন্য ছোট থেকে বড় সব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরেন। তাদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্মচর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে ডিজিটাল মিডিয়াগুলো।

সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত রীতিনীতি
ঢাকা শহরের ফুটপাতে খাবার বিক্রেতাদের কাছেও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব বেশ স্পষ্ট। চকবাজারের ইফতার বিক্রেতা ফরিদের মতে, ক্রেতারা এখন অনলাইনে খাবারের ছবি বা ভিডিও দেখে কিনতে আসেন।
তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘তারা এসে খাওয়ার আগে খাবারের ছবি তোলেন। তারপর অনলাইনে সেগুলো দিলে তাদের পরিচিতরা আবার আসে।’ এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়া স্থানীয় খাবারকে বহু মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলছে।
সব মিলিয়ে মহিমান্বিত রমজান আরও অর্থবহ হয়ে উঠছে ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে। নিজের রোজা, ধর্মচর্চা, উদারতা ও ঐক্যবদ্ধতা অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরও অনেক মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছে। যেখানে ৭৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে (বিটিআরসির ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী), সেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো রান্নাঘর, মসজিদ ও দাতব্য সংস্থা—প্রতিটি জায়গাতেই সম্পৃক্ততা, শেখার পরিধি ও একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, সেটাই প্রত্যাশিত।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী



