‘ইত্যাদি’র জাদুকরী গান যেভাবে বদলে দেয় শিল্পীদের জীবন
১৯৮৮ সাল থেকে বিটিভিতে প্রচারিত হয়ে আসছে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি'। হানিফ সংকেতের পরিকল্পনা, গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় এই অনুষ্ঠানটি গত সাড়ে তিন দশক ধরেই তুমুল জনপ্রিয়।
সামাজিক নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার পাশাপাশি অসংখ্য কালজয়ী গান দর্শক-শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে ইত্যাদি। এসব গান যেমন শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে, তেমনি এই গানগুলো বদলে দিয়েছে অনেক শিল্পীর জীবন।
আগের ঠিকানায়
১৯৯৬ সালে ইত্যাদিতে প্রচারিত হয় কণ্ঠশিল্পী মুরাদের গাওয়া 'আমি আগের ঠিকানায় আছি' গানটি। মিউজিক ভিডিওতে তার সঙ্গে ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানিয়া আহমেদ। প্রচারের পরপরই গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। চট্টগ্রামের ছেলে মুরাদ ওয়াকিল খান পেশায় একজন
স্থপতি (আর্কিটেক্ট)। গানটি প্রচারের পর রাতারাতি তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তখন সেলফির যুগ না থাকলেও রাস্তাঘাটে বেরোলে মানুষ তাকে অটোগ্রাফের জন্য ঘিরে ধরত।
পরবর্তীতে 'তোমারই অজান্তে' নামে একটি অ্যালবাম বের করলেও তিনি সংগীত জগতে নিয়মিত থাকেননি। তবে তার গানের সেই বিখ্যাত লাইন—'তবুও কিছু মন সারাটি জীবন রয়ে যায় কাছাকাছি'-র মতোই শ্রোতাদের হৃদয়ে আজও অমলিন মুরাদের নাম।
বাড়ির নাম এলোমেলো
১৯৯৮ সালের কথা। তরুণ সংগীতানুরাগী নাফিস কামাল একটি অ্যালবামের জন্য ১২টি গান তৈরি করেন। লাকী আখান্দ ও নকীব খানের মতো কিংবদন্তিরা সুর দিলেও কোনো প্রযোজক নতুন শিল্পীর ক্যাসেট বাজারে আনার সাহস করছিলেন না।
এরপর গীতিকার কাউসার আহমেদ চৌধুরী নাফিসকে নিয়ে যান হানিফ সংকেতের কাছে। ইত্যাদিতে 'এলোমেলো' গানটি প্রচারের এক রাতের ব্যবধানেই নাফিসের জীবন বদলে যায়। গানটি তখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’।
যে অ্যালবাম কেউ নিতে চায়নি, তা নেওয়ার জন্য অডিও কোম্পানিগুলোর হিড়িক পড়ে যায়। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য নাফিস বিদেশে চলে গেলেও এই একটি গানই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
আমার একটা নদী ছিল
নওগাঁর পত্নীতলার ছেলে নুরুন্নবী, যিনি লেখক নাম হিসেবে ব্যবহার করতেন ‘পথিক নবী’। ২০০২ সালে ইত্যাদিতে তার লেখা ও সুর করা গান 'আমার একটা নদী ছিল' প্রচারিত হয়।
গানটি প্রচারের পরপরই দেশজুড়ে তারকাখ্যাতি পান তিনি। নিজ গ্রামেও তাকে নিয়ে শুরু হয় তুমুল উন্মাদনা।
ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায় তার আধ্যাত্মিক সুরের জাদু। যদিও পরবর্তীতে তিনি সংগীতে অনিয়মিত হয়ে পড়েন, তবে সেই নদীর গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
হাতপাখার বাতাসে
২০০১ সালে কিশোর কুমারের বিখ্যাত গান 'একদিন পাখি উড়ে' ইত্যাদিতে গেয়েছিলেন একজন সাধারণ রিকশাচালক—আকবর। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তার সেই দরদী গায়কী পুরো দেশকে আলোড়িত করে।
পরবর্তীতে পূর্ণিমার সঙ্গে 'তোমার হাতপাখার বাতাসে' গানটি তাকে মৌলিক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর আর তাকে রিকশা চালাতে হয়নি, দেশ-বিদেশে গান গেয়েই জীবন কাটাতেন তিনি।
তবে শেষ জীবনে দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর এই শিল্পী না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।