হরমুজ এড়িয়ে ইউরিয়া আমদানির চেষ্টায় বাংলাদেশ

সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

ইউরিয়া সার আমদানি করতে গত মাসে আহ্বান করা আন্তর্জাতিক দরপত্রে কোনো অংশগ্রহণকারী না পাওয়ায় আমন মৌসুম নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) প্রক্রিয়ায় চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করতে গতকাল রাশিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে সরকার।

একইসঙ্গে নিকটবর্তী উৎপাদক ব্রুনেই এবং দূরবর্তী ও তুলনামূলক কম প্রচলিত সরবরাহকারী লাটভিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে ঢাকা।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের নিয়মিত সরবরাহকারী সৌদি আরবকে সরকার বিকল্প নৌপথে সার পরিবহনের বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০ শতাংশ সার পরিবহন ব্যাহত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আমদানি নিশ্চিত করতে তারা বর্তমানে রাশিয়া, লাটভিয়া, ব্রুনেই ও ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে সার সরবরাহ করতে পারবে জন্য এই দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।’

রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, আশা করা হচ্ছে, শিগগির মস্কোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় দেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশে বছরে ২৬ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। অন্য খাতে গ্যাস ব্যবহার করায় দেশীয় কারখানাগুলো প্রায়ই পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। ফলে মোট চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ লাখ টন সার মজুত রয়েছে, এটি জুন পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট। বিসিআইসি আগেই জানিয়েছিল, বছরের দ্বিতীয়ার্ধের চাহিদা পূরণে মজুত বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশের প্রধান সরবরাহকারী দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার। এসব দেশ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন সার সরবরাহ করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতার ও সৌদি আরবের বড় উৎপাদকরা ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় সরবরাহ সংকট আরও বেড়েছে। পাশাপাশি সারের দাম ও উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দামও বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পণ্যদ্রব্য মূল্য তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের তুলনায় ইউরিয়ার দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মার্চে প্রতি টনের গড় দাম ৪৭২ ডলার থেকে বেড়ে ৭২৫ দশমিক ৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেটসহ (টিএসপি) অন্যান্য সারের দামও বেড়েছে।

মার্চে অব্যাহত দাম বৃদ্ধি ও আমন মৌসুম ঘনিয়ে আসায় বিসিআইসি ২ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করে। কোনো সাড়া না পাওয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার সময় আগামী বৃহস্পতিবার শেষ হবে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান জানান, সৌদি আরব ৪০ হাজার টন সার সরবরাহে সম্মত হয়েছে, তবে হরমুজ প্রণালির সমস্যার কারণে চালান এখনো পৌঁছায়নি।

‘তাই আমরা তাদের অনুরোধ করেছি, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প বন্দর ব্যবহার করে সার পাঠানো যায় কি না তা বিবেচনা করতে,’ বলেন তিনি।

ফজলুর রহমান বলেন, গত সপ্তাহে ইউরিয়ার দাম প্রতি টন ৭৮৫-৭৮৬ ডলারে উঠেছিল এবং এ সপ্তাহে তা ৮০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

দাম বাড়লে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়বে। কারণ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকার ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সার কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করে, যোগ করেন তিনি।

চলতি অর্থবছরে সার ভর্তুকির জন্য সরকার ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, দাম বেশি থাকলে আগামী বছর তা ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

গ্যাস সংকটে বন্ধ কারখানাগুলো চালুর চেষ্টা চলছে জানিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জটিল ও অনিশ্চিত। আমরা এই সংকট মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক ব্লগে বলা হয়েছে, সার সরবরাহ ব্যাহত থাকলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

লেখকরা বলছেন, ‘ধান চাষে প্রচুর সার প্রয়োজন এবং এটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কেন্দ্রীভূত, যেখানে উপসাগরীয় অঞ্চলের ইউরিয়া আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ নাইট্রোজেন সার মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই সংগ্রহ করে।’

তারা আরও বলছেন, ‘যদি ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত সারের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকে এবং একই সময়ে এল নিনো ঘটে, তাহলে ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো একইসঙ্গে বাড়তি উৎপাদন খরচ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়তে পারে।’