মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের ধাক্কা শ্রেণিকক্ষে

আরাফাত রহমান
আরাফাত রহমান

দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের কারণে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণিত, ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির (আইসিটি) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষকদের ওপর গিয়ে পড়ছে অতিরিক্ত কাজের চাপ। ফলে ব্যবহারিক ক্লাসের সংখ্যা কমাতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ঘাটতি ক্রমেই শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ছে।

গত ২৩ এপ্রিল সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্তত দুই হাজার ৮৪২টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের মাসিক বেতন আদেশ (এমপিও) কর্মসূচির আওতাভুক্ত বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্য পদের সংখ্যা ৭৭ হাজার ২২৭টি।

এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়গুলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত হলেও অনুমোদিত পদে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মচারীর বেতন-ভাতা সরকার বহন করে। এসব বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে শিক্ষক নিয়োগ, ফি কাঠামো ও শিক্ষা কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০ হাজার ৬৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৯০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনার তথ্য ব্যবস্থার (ইএমআইএস) নথি অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে তিন হাজার ৮৬১টিতে কোনো আইসিটি শিক্ষক নেই; দুই হাজার ৭৪৪টিতে গণিতের শিক্ষক ও দুই হাজার ৬২৫টিতে ইংরেজির শিক্ষক পদ শূন্য।

শিক্ষাবিদ ও কর্মকর্তাদের মতে, নিয়োগে বিলম্ব, শিক্ষকদের পদায়নে সমস্যা ও শিক্ষক ধরে রাখার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও আইসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, বিশেষ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব একটি ‘সাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা’।

অধ্যাপক মনজুর বলেন, ‘শিক্ষার ফলাফল উন্নত করা, ঝরে পড়া রোধ ও পাসের হার বাড়ানোর জন্য এসব বিষয়ে যথাযথ পাঠদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই।’

গত বছরের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত ১০ সদস্যের মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মনজুর।

কমিটি ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরারের কাছে ১২০টি সুপারিশ সংবলিত খসড়া প্রতিবেদন জমা দেয়। সেসব সুপারিশের মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবও ছিল।

কমিটি পেশাদার সিভিল সার্ভিসের আদলে একটি জাতীয় শিক্ষক সেবা কোর গঠনের প্রস্তাব দেয়। এর আওতায় স্নাতকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন-ভাতা ও পেশাগত মর্যাদা দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ দেওয়া হবে।

এসব শিক্ষককে সরকার নির্ধারিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচ বছর চাকরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকার শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষকদের বদলি বন্ধ রাখার সুপারিশও করে কমিটি। তাদের যুক্তি, ঘন ঘন বদলির কারণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।

অধ্যাপক মনজুর বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুপারিশগুলো ‘সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেয়নি’। এর পরিবর্তে সরকার ‘বিচ্ছিন্ন, ক্ষুদ্র অংশ ও আংশিক’ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

শিক্ষক সংকটের প্রভাব শ্রেণিকক্ষে

কয়েকটি জেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে অনেক শিক্ষক তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ঘাটতির কারণে তাদের কোচিং সেন্টার ও ইউটিউবের পাঠের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ৫৩টি শিক্ষক পদের অর্ধেকই শূন্য। প্রায় এক হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২৭ জন। অর্থাৎ, প্রতি ৪৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে, মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিদ্যালয়টিতে ইংরেজির আটটি পদের বিপরীতে পাঁচজন, গণিতের ছয়টি পদের বিপরীতে চারজন ও বাংলার আটটি পদের বিপরীতে তিনজন শিক্ষক কর্মরত। সেখানে আইসিটি বিষয়ের জন্য অনুমোদিত শিক্ষক পদ না থাকায় এই দায়িত্ব অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের নিতে হচ্ছে।

সপ্তাহে সাধারণত ১৫ থেকে ১৭টি ক্লাস নেওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষককে ২৫ থেকে ২৭টি ক্লাস নিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞান বিষয়ের ব্যবহারিক ক্লাসও হচ্ছে অনিয়মিত। বিদ্যালয়টির দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নিশাত তাবাসসুম বলেন, ‘এসব ক্লাস অনিয়মিত হয়ে পড়ায় অনেক বিষয় বোঝার জন্য ইউটিউব ভিডিওর ওপর নির্ভর করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’

একই জেলার পালং তুলাসার গুরুদাস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিস্থিতিও একই রকম। সেখানে এক হাজার ৫০ শিক্ষার্থীর জন্য অনুমোদিত ৫৩টি পদের বিপরীতে ৩২ জন শিক্ষক কর্মরত।

দক্ষিণাঞ্চলের নোয়াখালী, কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটির অনেক বিদ্যালয়ে রয়েছে শিক্ষক সংকট।

নোয়াখালীর ১৬টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ৪৫২টি শিক্ষক পদের মধ্যে অন্তত ২৫১টি বর্তমানে শূন্য। কক্সবাজারের নয়টি বিদ্যালয়ে ২২৬টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১০৯টি পদ।

রাঙ্গামাটি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জেলার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত এক হাজার ৭০০টি শিক্ষক পদের মধ্যে ৬৫৭টি শূন্য রয়েছে।

শিক্ষায় সমতা নিয়ে উদ্বেগ

শিক্ষার্থীদের শিখন মূল্যায়নে জাতীয় পর্যায়ের একটি সমীক্ষায় শিক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ফলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস ২০২৩ এর মূল্যায়নে দেখা গেছে, বিজ্ঞান বিষয়ে মূল্যায়নের আওতায় আসা অষ্টম শ্রেণির ২৬ হাজার ৬০১ জন শিক্ষার্থীর গড় স্কোর ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ ছিল অর্জনের সর্বনিম্ন দুটি স্তরে এবং ২২ শতাংশ ছিল সর্বোচ্চ দুটি স্তরে।

২০১৯ সালের তুলনায় অষ্টম ও দশম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফলাফলও খারাপ হয়েছে। বাংলায় ও গণিতে অবনতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যদিও শিক্ষক সংকটকে এর কারণ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

অধ্যাপক মঞ্জুর বলেন, শ্রেণিকক্ষে দুর্বল পাঠদান শিক্ষার্থীদের বেসরকারি কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের দিকে ঠেলে দেয়। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বিশেষভাবে অসুবিধায় পড়ে, কারণ ভালো শিক্ষক ও ছোট পরিসরের কোচিংয়ের সুযোগ পাওয়া ক্রমেই পরিবারের অর্থ পরিশোধের সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

‘এই পরিস্থিতি বিদ্যালয়ের শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে। কোনো শিশু যখন পরিবারের অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা পায়, তখন তার শিক্ষার অধিকার লঙ্ঘিত হয় এবং রাষ্ট্র তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না—সেটা স্পষ্ট হয়।’

এ সমস্যা সমাধানে অর্থায়ন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সমন্বিত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো পিছিয়ে

গত ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় মিলন বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) বলা হয়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই হাজার ৩৩০ জন শিক্ষক নিয়োগ দিতে।

তিনি আরও জানান, ৭২৮ জন বিসিএস প্রার্থীকে নন-ক্যাডার সহকারী শিক্ষক হিসেবে সাময়িকভাবে বাছাই করা হয়েছে এবং আইসিটি বিষয়ের ৭৮২টি শিক্ষক পদ সৃষ্টির উদ্যোগ চলছে।

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পিএসসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, যা ২০০৫ সালের আইনের অধীনে গঠিত বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) তদারক করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীনে পরিচালিত এনটিআরসিএ প্রাথমিক পর্যায়ের শূন্য পদে নিয়োগে প্রার্থীদের সুপারিশ করে। সম্প্রতি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্বও সংস্থাটিকে দেওয়া হয়েছে।

মার্চে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই হাজার ৮৮১ জন প্রধান শিক্ষক ও তিন হাজার ২৯৬ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয় এনটিআরসিএ। উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা ১ অক্টোবর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১৫ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়।

এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান আলিফ রুদাবা ও সচিব রনি রহমানের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মঈনউদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল জানান, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের গতি বাড়াতে অধিদপ্তর বারবার মন্ত্রণালয় ও পিএসসিকে তাগাদা দিয়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ না হওয়ায় শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত শতাধিক নন-ক্যাডার প্রার্থী এখনো নিয়োগ বা পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।

আইসিটি বিষয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ায় শিক্ষক পদ সৃষ্টির উদ্যোগ চলছে।

তিনি উল্লেখ করেন, শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে শিক্ষক সংকট কমবে। তবে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না।

‘আমাদের আরও দুই বা তিন দফায় নিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।’

ইংরেজি ও গণিতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথাও উল্লেখ করে তিনি।  সোহেল বলেন, ‘বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বর্তমানে শিক্ষকতা যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়।’

তার পরামর্শ, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।’

[প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করতে দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা সহায়তা করেছেন]