৭ মার্চের ভাষণ বাজানো এত বড় অপরাধ?

আরাফাত রহমান
আরাফাত রহমান

একটি ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর অভিযোগে একজন ছাত্রনেত্রী দেড় মাস ধরে কারাগারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে দেশের অন্যতম কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। তিন দফায় তার জামিন নামঞ্জুর হয়েছে।

প্রশ্ন তাই সহজ, কিন্তু এড়ানো কঠিন—৭ মার্চের ভাষণ বাজানো কি সত্যিই এত বড় অপরাধ?

শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি এবং ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ভিপি পদপ্রার্থী ছিলেন। তাকে গত ৭ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুই সদস্যকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ, তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর চেষ্টা করেছিলেন।

ঘটনার শুরু মো. আসিফ আহমেদ সৈকতকে ঘিরে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক। ৭ মার্চ বিকেলে লাউডস্পিকারে ভাষণটি বাজানোর অভিযোগে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে আটক করে।

সেদিন রাতেই সৈকতের আটকের প্রতিবাদে জাতীয় জাদুঘরের সামনে একই ভাষণ বাজানোর চেষ্টা করেন ইমি ও আরও কয়েকজন। তখন ডাকসুর দুই প্রতিনিধি তাদের বাধা দেন এবং পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরে তিনজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এ মামলা হয়।

সেখান থেকে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে। একটি ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানো যদি সন্ত্রাস হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে বলতে হবে, ইতিহাসের কোন কোন অংশ এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য?

প্রশ্নটির উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বরং, ৮ এপ্রিল ইমি ও অন্যদের তৃতীয় দফায় জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর প্রশ্নটি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

পুলিশের বর্ণনা সত্য ধরে নিলেও শুরুতে কিন্তু সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হামলা বা নিষিদ্ধ সংগঠন পুনরুজ্জীবনের অভিযোগ সামনে আনা হয়নি। প্রথমে বলা হয়েছিল, ভাষণটি বাজানো হয়েছে। সৈকতকে আটকের পর শাহবাগ থানার ওসি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভাষণটি বাজানো নিষিদ্ধ।

প্রশ্ন হলো, কবে থেকে ৭ মার্চের ভাষণ বা সেটি বাজানো নিষিদ্ধ হলো? এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলে পুলিশ কেন এমন আচরণ করল যেন এটি আইনত অপরাধ? এই ব্যাখ্যা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।

অবশ্য পরে মামলার এজাহারে আরও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। সেখানে বলা হয়, ইমি ও অন্যরা নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করেছেন, পুলিশকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়েছেন এবং সৈকতকে পুলিশি হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শুরুতে জনসমক্ষে পুলিশের যে বক্তব্য এসেছিল, তাতে এসব অভিযোগের কিছুই ছিল না।

আর একটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ, অর্থাৎ ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোকে নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনের সমান বলা যায় কি?

এখানে সাংবিধানিক প্রশ্নও আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার অধীনে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও স্বীকৃত।

তাই এখন পর্যন্ত যে তথ্য সামনে এসেছে, তার ভিত্তিতে কোন আইনের কোন ধারা কীভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, তা রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করতে হবে। আইন ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ইতিহাসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন না; রাষ্ট্রও পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৭ মার্চের ভাষণ কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আওয়ামী লীগ কীভাবে কী ব্যবহার করেছে সেটা সেই দলের দায়; ইতিহাসের নয়। ইউনেসকো ভাষণটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় স্বীকৃতি দিয়েছে, কারণ এটি বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে বলে রাষ্ট্র এই ভাষণ বাজানোকে সন্দেহজনক কাজ হিসেবে দেখতে পারে না।

যদি অভিযোগ হয় পুলিশকে বাধা দেওয়া, বেআইনি জমায়েত বা নিষিদ্ধ সংগঠন পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা—তাহলে রাষ্ট্রকে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইনে বিচার হতে পারে। কিন্তু ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর একটি ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানোর ঘটনাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কাঠামোয় বসানো কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত নয়।

এ কারণেই এই মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং এর অপপ্রয়োগের দিকটিই সামনে আসে। আইনটি করা হয়েছিল সন্ত্রাসবাদ, সংগঠিত সহিংসতা ও জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরিকারী অপরাধ মোকাবিলা করার জন্য। এই আইনে মামলা হলে ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত আসে, জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই আইনে অভিযুক্ত কিছু আলোচিত ব্যক্তি জামিন পেয়েছেন। কিন্তু এখন অবধি ইমির ক্ষেত্রে সেই বিচারিক বিবেচনা দেখা যাচ্ছে না। এতে আইনটির অপব্যবহার ও অসম প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।

জামিনের প্রসঙ্গে আরেকটি সাম্প্রতিক মামলার কথা না বললেই নয়। ঘটনা ও আইনি কাঠামো এক নয়, তবু মামলাটি দেখায় যে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও জামিন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক অংশ।

ময়মনসিংহের ভালুকায় গত ১৮ ডিসেম্বর দীপু চন্দ্র দাস হত্যার মামলার আসামি মাসুম খালাসির কথাই ধরা যাক। অভিযোগ ছিল, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে দীপুকে ধাওয়া করা হয়, চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং পরে হত্যা করে তার লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ ও আদালতের নথি অনুযায়ী, মাসুম ছিলেন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া ১২ আসামির একজন। তিনি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন।

অথচ গ্রেপ্তারের চার মাসের কম সময়ের মধ্যে ১৩ এপ্রিল তিনি দুই হাজার টাকার বন্ডে এক বছরের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। এতে জনমনে যেমন ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তেমনি জামিনের নীতির প্রয়োগ কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, সেটিও সামনে এসেছে।

এখানে দীপু দাসের মামলা ও ইমির মামলাকে এক করে দেখা হচ্ছে না, দুটি মামলা তুলনীয়ও নয়। বিষয়টি হলো, গুরুতর অপরাধের অভিযোগেও জামিন যেখানে একটি বাস্তব আইনি সুযোগ হিসেবে থাকে, সেখানে ইমির ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রশ্নবিদ্ধ প্রয়োগ এবং বারবার জামিন নামঞ্জুর হওয়া আরও বেশি অস্বস্তিকর।

এই বাস্তবতায় কর্তৃপক্ষের এখন স্পষ্ট করে বলা জরুরি, ৭ মার্চের ভাষণ জনসমক্ষে বাজানো কোন আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ? একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে হবে, অভিযুক্তদের কথিত কাজ কীভাবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় পড়ে? তাদের জামিন চাওয়ার অধিকারও কার্যকরভাবে বিবেচনা করতে হবে।

একজন হত্যা মামলার আসামি যদি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এই মৌলিক সুযোগ পেতে পারেন, তাহলে জনমতের চোখে তিনজন শিক্ষার্থী, বিশেষ করে যিনি কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য নন; তাদের বারবার জামিন না পাওয়া শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, বরং ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্ন।

রাষ্ট্রের যদি ইমির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা থাকে, তবে আদালতে তা প্রমাণ করুক। তাকে কারাগারে রাখার মতো জোরালো কারণ থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে বলা হোক। কিন্তু ঐতিহাসিক এই ভাষণ বাজানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে, দেশের অন্যতম কঠোর আইনের অধীনে বারবার জামিন নামঞ্জুর করা আমাদের এমন এক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন কঠোর আইন ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে অহরহ ব্যবহৃত হতো।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি পুরোনো দমননীতির পথেই হাঁটে, তাহলে মানুষ জানতে চাইবে; পরিবর্তন আসলে কোথায়?


লেখক দ্য ডেইলি স্টারের একজন সাংবাদিক, যিনি শিক্ষা, সুশাসন, মানবাধিকার ও জনজবাবদিহিতা নিয়ে লেখালিখি করেন।
arafat.mcj@yahoo.com