জ্বালানি সংকট সমাধানে প্রয়োজন সরকার-ব্যবসায়ীর সমন্বিত কৌশল
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় জ্বালানি সংকট কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন অর্থনীতি, উৎপাদন ও জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকার বা ব্যবসায়ী কেউই এককভাবে এই সংকট সামাল দিতে পারবে না। বরং টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বাস্তবমুখী ও আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক, যেখানে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে।
প্রথমত, জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদনে। বিদ্যুৎ ঘাটতি, গ্যাসের সংকট কিংবা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, বাজারে মূল্যস্ফীতির যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে সরকার একদিকে যেমন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণও সমানভাবে জরুরি। যদি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, মজুদদারি বাড়ে বা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হয়, তাহলে সংকট আরও তীব্র হবে। তাই এই সময়ে ব্যবসায়ীদের উচিত দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরির দিকে নজর দেওয়া, স্বল্পমেয়াদি মুনাফার দিকে নয়।
তৃতীয়ত, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য। অনেক শিল্প খাতে এখনো পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে জ্বালানির অপচয় বেশি। সরকার যদি প্রণোদনা দিয়ে আধুনিক, জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেয় এবং ব্যবসায়ীরা সেটি গ্রহণ করেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে জ্বালানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব। এখানে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি কিংবা এলএনজি—এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তবে এই খাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের এককভাবে এগিয়ে আসা কঠিন। তাই সরকারকে নীতিগত স্থিতিশীলতা, কর সুবিধা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে বড় ব্যবসায়িক গ্রুপগুলোকে এগিয়ে এসে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়ের অভাব এবং তথ্যের অস্বচ্ছতা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যদি সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ হয়, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়, তাহলে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা সহজ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানসিকতা পরিবর্তন। সংকট মানেই আতঙ্ক নয়, বরং এটি নতুন করে ভাবার সুযোগ। যারা এই সময়ে নিজেদের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করতে পারবে, খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে এবং দক্ষতা বাড়াতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতে এগিয়ে থাকবে। এখানে সরকার দিকনির্দেশনা দিতে পারে, আর ব্যবসায়ীরা বাস্তবায়ন করতে পারে।
জ্বালানি সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সমন্বয় ও নেতৃত্বের পরীক্ষা। সরকার যদি নীতিগত স্থিরতা, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে এবং ব্যবসায়ীরা যদি দায়িত্বশীল, দূরদর্শী ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করে, তাহলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
আজকের চ্যালেঞ্জই আগামী দিনের সম্ভাবনা তৈরি করে। তাই বিভক্ত না হয়ে, প্রতিযোগিতার সংকীর্ণতা ছেড়ে, সরকার ও ব্যবসায়ীদের এখনই একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, জ্বালানির এই দুঃসময়ে টিকে থাকার একটাই পথ—ঐক্য, সমন্বয় ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
মো. তরিকুল ইসলাম; লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
mtislam.ca@gmail.com