উপজেলা পরিষদে এমপির স্থায়ী উপস্থিতি: ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায়?

জি এম সাইফুল ইসলাম
জি এম সাইফুল ইসলাম

সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে আলাদা বসার কক্ষ থাকবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পরিদর্শন কক্ষ’। প্রথমে এটা খুব স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে। কারণ, সংসদ সদস্যরা এলাকায় যান, কাজও করেন। তাই তাদের বসার একটা জায়গা থাকলে দোষ কী?

কিন্তু বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে যারা বোঝেন, তারা জানেন যে বিষয়টা এত সহজ নয়। এই সিদ্ধান্তের ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার সংঘর্ষ, প্রভাবের লড়াই, আর এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে ক্ষমতার কাছে থাকা মানেই সেই ক্ষমতা নিজের বলে ভাবা।

বিষয়টি বুঝতে হলে একটু পেছনে গিয়ে দেখতে হবে যে উপজেলা স্তর কাঠামোগতভাবে কতটা জটিল।

বিভক্ত এক কাঠামো

উপজেলা পরিষদকে কল্পনা করা হয়েছিল বিকেন্দ্রীভূত, জনমুখী শাসনের কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু, বাস্তবে এটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রাতিষ্ঠানিক অস্পষ্টতার মঞ্চ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) একজন পেশাদার আমলা এবং তিনি ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক শৃঙ্খলের কাছে জবাবদিহি করেন; উপজেলা চেয়ারম্যান সরাসরি নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধি। এই দুইয়ের মধ্যকার টানাপোড়েন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর একটি।

২০২০ সাল পর্যন্তও উপজেলা পরিষদে অবস্থানরত ১৭টি মন্ত্রণালয়ের উপজেলা কার্যালয়ের কাজ কীভাবে পরিষদের ম্যান্ডেটের সঙ্গে যুক্ত হবে, তার সুস্পষ্ট কার্যপরিধি ছিল না। ফলে কর্মকর্তাদের আনুগত্য ছিল দ্বৈত—কাগজে-কলমে পরিষদের প্রতি, কিন্তু বাস্তবে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের প্রতি।

এর ফলাফল ছিল অনুমেয়। উন্নয়ন প্রকল্প আটকে গেছে প্রক্রিয়াগত অচলাবস্থায়। নির্বাচিত চেয়ারম্যান অনেক সময় এমন এক আনুষ্ঠানিক প্রধানের ভূমিকায় নেমে এসেছেন, যার অধীনস্থ কর্মকর্তারা প্রকৃত নির্দেশ নিয়েছেন ঢাকা থেকে। জবাবদিহি মিশে গেছে এক প্রশাসনিক ধূসর অঞ্চলে।

এখন নামমাত্র কার্যপরিধি নির্ধারিত হলেও বহু উপজেলায় বাস্তবতা এখনও ‘সমঝোতামূলক স্থবিরতা’। উপরিতলে সৌহার্দ্যপূর্ণ, ভেতরে গভীরভাবে বিরোধপূর্ণ।

উপজেলা স্তরে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক পদটি উপজেলা চেয়ারম্যানের। সেখানে একজন সংসদ সদস্যের আবির্ভাব এবং তার জন্য সরকারি কক্ষ বরাদ্দ কোনো নিরপেক্ষ ঘটনা নয়।

এখতিয়ারের অস্পষ্টতা

যেসব উপজেলায় পৌরসভা রয়েছে বা যার সীমানা উপজেলার সঙ্গে ভাগাভাগি করে, সেখানে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এখানে সরাসরি নির্বাচিত একজন মেয়র নগরসেবা পরিচালনা করেন, আলাদা বাজেট তত্ত্বাবধান করেন এবং নিজস্ব রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক পরিসর গড়ে তোলেন।

অন্যদিকে উপজেলা চেয়ারম্যানের কর্তৃত্ব তাত্ত্বিকভাবে বৃহত্তর গ্রামীণ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। কিন্তু বাস্তবে এই দুই কর্তৃপক্ষকে একই ভূখণ্ড, সম্পদ এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভাগাভাগি করতে হয়। সড়ক, বাজার, ড্রেনেজ, উন্নয়ন তহবিল সংক্রান্ত বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রের মধ্যে এখতিয়ারগত টানাপোড়েন অস্বাভাবিক নয়। একই দলের হলেও সমন্বয় খুব কম ক্ষেত্রেই নির্বিঘ্ন থাকে।

এমনিতেই জটিল এই পরিস্থিতিতে এখন কক্ষ বরাদ্দের মাধ্যমে যোগ হচ্ছে তৃতীয় এক ক্ষমতাধর ব্যক্তি—স্থানীয় সংসদ সদস্য। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) তহবিল বরাদ্দে তার প্রভাব আছে, কিংবা অন্তত এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। দলীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের ওপরও তার প্রভাব থাকে। সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি প্রায়শই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার চূড়ান্ত নির্ধারক বলে বিবেচিত হন। উপজেলা চেয়ারম্যান বা মেয়রের মতো উপজেলা পর্যায়ে তার আনুষ্ঠানিক স্থানীয় সরকার-সংশ্লিষ্ট ম্যান্ডেট নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকৃত প্রভাবের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে। যে কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রতিশ্রুতি থাকে স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট।

বাজেটের প্রভাব: যেখানেই বদলে যায় সবকিছু

এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ কম আলোচিত দিক হলো ইউনিয়ন পরিষদে বাজেট বণ্টনে উপজেলা পরিষদের ভূমিকা। উন্নয়ন তহবিল কীভাবে ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাবে, সে প্রক্রিয়ায় উপজেলা পরিষদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

অর্থাৎ উপজেলা পরিষদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, বা অন্তত তার কাছাকাছি অবস্থান সবচেয়ে তৃণমূল স্তরের নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের ওপরও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।

কোনো সংসদ সদস্য যদি নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করতে চান, তবে এটি তার কাছে মোটেই বিমূর্ত বিষয় নয়। উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণের ভেতরে একটি কক্ষ নিছক বসার জায়গা নয়, এটি ক্ষমতার এক স্থায়ী পা রাখার জায়গা।

যখন একজন সংসদ সদস্য সরকারি বরাদ্দকৃত কক্ষসহ শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত থাকেন, তখন সেই পরিসরে তার মর্যাদা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয় এবং অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাস আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

কর্মকর্তারা, যারা আগে থেকেই রাজনৈতিক আবহাওয়া বুঝে চলতে অভ্যস্ত, এখন তা আরও সতর্কভাবে বুঝবেন। একজন ইউএনও, যাকে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র এবং এখন স্থায়ী উপস্থিতিসহ একজন সংসদ সদস্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে, শেষ পর্যন্ত তাকেই অগ্রাধিকার দেবেন যিনি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী বলে মনে হন।

সুদূরপ্রসারী প্রভাব

বাংলাদেশে দৃশ্যমান শ্রেষ্ঠত্বের এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে কার গাড়িবহর কত বড়, কার চেয়ার সামনে, কার ব্যানার বেশি চোখে পড়ে। এগুলো তুচ্ছ অহমিকার বিষয় নয়। সমাজে এগুলোর বাস্তব অর্থ আছে, যেখানে দৃশ্যমান কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

জাতীয় সংসদে এই ব্যবস্থা ঘোষণার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলাদা করে উল্লেখ করেছিলেন যে সংসদ সদস্যরা সরকারি গাড়ি পাবেন না, শুধু একটি কক্ষ পাবেন। ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা না হোক, এই বক্তব্যে যেন স্বীকার করাই হয়েছে, একটি কক্ষের প্রতীকী গুরুত্বই স্থানীয় ক্ষমতার স্তরবিন্যাসে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে।

এনসিপির যে সংসদ সদস্য প্রথম প্রকাশ্যে এই ধরনের বসার কক্ষ দাবি করেছিলেন, অন্তত তার যুক্তির মধ্যে এক ধরনের ধারাবাহিকতা ছিল। তাদের দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী এলাকার কাজে উপেক্ষিত বোধ করছিলেন। কিন্তু সেই রাজনৈতিক হতাশাকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভেতরে স্থায়ী কাঠামোগত সুবিধায় রূপ দেওয়া এমন এক উদ্যোগ, যার প্রভাব বহুদূর গিয়ে পৌঁছাবে।

করণীয় কী?

এই আলাপ থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয় যে সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকায় যাওয়া সীমিত করতে হবে, কিংবা স্থানীয় শাসনের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বরং একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতীয় ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সুপরিকল্পিত সমন্বয় কাঠামো থাকা জরুরি ও কাম্য।

সরকারের উচিত তাৎক্ষণিক ও খাপছাড়া ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে একটি সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো তৈরি করা, যেখানে নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হবে যে উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় একজন সংসদ সদস্যের ভূমিকা কী, আদৌ কোনো ভূমিকা থাকলে তা কতটুকু।

উপজেলা পরিষদের ১৭টি লাইন অফিসের কার্যপরিধি—যা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি—আরও শক্তিশালী করতে হবে। যেসব এলাকায় উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সীমানা বা কাজের ক্ষেত্র ওভারল্যাপ করে, সেখানে এখতিয়ারগত সীমারেখা আইনগতভাবে পরিষ্কার করতে হবে এবং উন্নয়ন বাজেট, বিশেষত যার প্রভাব ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পৌঁছায়, তার ওপর উপজেলা চেয়ারম্যানের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বকে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিকদের অনানুষ্ঠানিক প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।

কোনো সংসদ সদস্য যদি সত্যিই উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করতে চান বা উপজেলা পর্যায়ে এসে জনগণের সঙ্গে দেখা করতে চান, সেটি অবশ্যই বৈধ ও প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই কাজের জন্য স্থায়ী কক্ষের প্রয়োজন নেই, বিশেষ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, যা সাংবিধানিকভাবে তার শাসনাধীন নয়।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো বহু দশক ধরে প্রকৃত ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। সরকারের মনে রাখা উচিত, সংসদ সদস্যদের সম্মান দেখানোর উদ্দেশ্যে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, উপজেলা স্তরে সেটি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখা হতে পারে।

জি এম সাইফুল ইসলাম: উন্নয়নকর্মী
saiful.learner@gmail.com