৯৮ দিন বাকি

রবার্তো ব্যাজ্জিও: যে মানুষটি দাঁড়িয়েই মারা গিয়েছিল

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

ফুটবল কখনও কখনও কেবল খেলা থাকে না; তা হয়ে ওঠে নিয়তির নাটক। এটি যেমন মানুষকে ঈশ্বরসম আসনে বসাতে পারে, তেমনি পারে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিতে। ১৯৯৪ সালের ১৭ জুলাই। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় রোজ বোল স্টেডিয়ামে খাঁ খাঁ রোদ্দুরে এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। মাথা খুব নিচু নয়, চোখে জল নেই, অঙ্গভঙ্গিতে ভাঙন নেই, তবু তার চারপাশে জাতির স্বপ্ন ভেঙে রচিত হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিষণ্ণ অথচ কাব্যিক এক ট্র্যাজেডি। যে ট্র্যাজেডির কেন্দ্রীয় চরিত্র, রবার্তো ব্যাজ্জিও।

ইতালির সেই শিল্পী-ফুটবলার, যার পায়ে বল মানে ছিল কবিতার ছন্দ, যার ড্রিবলিং মানে ছিল হাওয়ার ভেতর দিয়ে সেলাই করা এক সূক্ষ্ম সুতো। গ্রুপ পর্বে টালমাটাল ইতালি যখন দিশেহারা, তখন ব্যাজ্জিওর পা থেকেই জ্বলে ওঠে আলোর রেখা। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোল, স্পেনের বিপক্ষে জয়সূচক গোল, কিংবা বুলগেরিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে জাদুকরী পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে ব্যাজ্জিও তখন একাই টেনে নিয়ে চলেছেন আজ্জুরিদের। তার ওই 'ডিভাইন পনিটেইল' তখন ইতালির কোটি ভক্তের প্রার্থনার প্রতীক।

ফাইনাল। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ব্রাজিল। রোমারিও, বেবেতো, দুঙ্গাদের বিপক্ষে ইতালির সবচেয়ে বড় ঢাল আর আশার প্রদীপ ওই একটাই নাম, রবার্তো ব্যাজ্জিও। কিন্তু ফাইনালের আগে তাকে নিয়ে বড় শঙ্কা। ঊরুর চোটে খেলা নিয়েই শঙ্কা। ব্যান্ডেজ করে ব্যাজ্জিও মাঠে নামলেন, কিন্তু তার দৌড় ছিল সংযত, স্পর্শ ছিল সতর্ক। প্রতিটি পাস, প্রতিটি স্টেপ যেন ব্যথার সঙ্গে সমঝোতা করে নেওয়া। তিনি আর সেই ঝলমলে ড্রিবলার নন; তিনি তখন এক যোদ্ধা, যিনি ক্ষত নিয়ে লড়ছেন।

১২০ মিনিটের গোলশূন্য লড়াইয়ের পর ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় টাইব্রেকারে। রোমাঞ্চ, স্নায়ুচাপ আর নীরবতার এক দমবন্ধ করা পরিবেশ। ব্রাজিলের হয়ে গোল করে গেছেন রোমারিও, ব্রাঙ্কো আর দুঙ্গারা। ইতালির হয়ে ফ্রাঙ্কো বারেসি আর ড্যানিয়েল মাসারো ততক্ষণে মিস করে বসেছেন। ইতালির পঞ্চম এবং শেষ শটটি নিতে এলেন রবার্তো ব্যাজ্জিও। তাকে গোল করতেই হবে, নইলে বিশ্বকাপ ব্রাজিলের।

ব্যাজ্জিও এগিয়ে যান। পনিটেল দুলে ওঠে বাতাসে। বল বসালেন স্পটের ওপর। কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শূন্যতা, হয়তো বা রাজ্যের ক্লান্তি। রেফারি বাঁশি বাজালেন। এক পা, দুই পা, শট। কিন্তু এ কী! বলটি ব্রাজিলের গোলরক্ষক ক্লদিও তাফারেলকে ফাঁকি দিলেও, ফাঁকি দিলো জালের সীমানাকেও। বল উড়ে গেল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার নীল আকাশের ক্যানভাসে হারিয়ে গেল ইতালির চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

কেউ হাঁটু গেড়ে বসেন, কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিন্তু ব্যাজ্জিও দাঁড়িয়ে রইলেন। একা। নীরব। দু'হাত কোমরে রাখা, মাথা নিচু, দৃষ্টি মাটির দিকে। নিথর, নিস্তব্ধ। যেন অনন্তকালের এক স্থবিরতা গ্রাস করেছে তাকে। তার চোখের সামনেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে তার নিজের হাতে তিল তিল করে গড়া এক স্বপ্নপ্রাসাদ। তার পেছনে ব্রাজিল দলের উৎসবের উল্লাস, সামনে শূন্যের বিস্তার। সেই নিস্তব্ধ, নিথর দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার নায়ককে দেখলে আজও সবাই বলে, 'মানুষটি দাঁড়িয়ে মারা গিয়েছিলেন'।

ব্যাজ্জিওর ওই নিস্তব্ধতা কেবল একটি পেনাল্টি মিসের হতাশা ছিল না; ওটা ছিল এক মহানায়কের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার নীরব আর্তনাদ। এক জাদুকর, যিনি পুরো টুর্নামেন্টে বিশ্বকে নিজের জাদুতে আচ্ছন্ন করেছিলেন, শেষমেশ তিনি নিজেই শিকার হলেন ভাগ্যের এক নিষ্ঠুর জাদুর।

কিংবদন্তি কেবল ট্রফি দিয়ে গড়া হয় না। কিংবদন্তি গড়ে ওঠে সেইসব মুহূর্তে, যখন একজন মানুষ নিজের ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়। ব্যাজ্জিও জানতেন, ইতালিকে ফাইনালে তোলার পথটাও তার পায়ের রেখা দিয়ে আঁকা। তাই শেষ ব্যর্থতার দায়ও তিনি নিলেন নির্বাক ভঙ্গিতে।

আজও যখন সেই ছবিটির দিকে তাকানো হয়, তখন কেবল একজন পরাজিত ফুটবলারকে দেখা যায় না; দেখা যায় এক অদ্ভুত সুন্দর ট্র্যাজেডিকে। দেখা যায় এমন এক মানুষকে, যিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটির মৃত্যু নিজ চোখে দেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাথরের মতো। এক লহমায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর অথচ সবচেয়ে বেদনাবিধুর এক জীবন্ত ভাস্কর্য।

কিছু মানুষ আসলে জিতে মহান হয়, আবার কেউ হেরেও মহান।