কালো চিতার অশ্রু
সেদিন লন্ডনের আকাশ কি একটু বেশিই ধূসর ছিল? নাকি ওয়েম্বলির ঘাসগুলো শোকাতুর হয়ে নুয়ে পড়েছিল এক অতিমানবিক ট্র্যাজেডির ভারে? ফুটবল ইতিহাসে কত শত জয়-পরাজয়ের উপাখ্যান ধুলোয় মিশে গেছে, কিন্তু ১৯৬৬ সালের সেই ২৬শে জুলাইয়ের পড়ন্ত বিকেলটি আজও থমকে আছে এক জোড়া অশ্রুসিক্ত চোখের মণিকোঠায়। ফুটবল যখন শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে পবিত্র এক বেদনায় রূপ নেয়, তখন সেই ক্যানভাসে কেবল একটি নামই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ইউসেবিও।
মানুষটিকে ফুটবল বিশ্ব ভালোবেসে নাম দিয়েছিল ‘কালো চিতা’ বা ব্ল্যাক প্যান্থার, সেই অদম্য, অপ্রতিরোধ্য শিকারি যখন মাঠের মাঝখানে এক অসহায় শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন, তখন যেন পুরো ফুটবল বিশ্বের হৃদয়টাই এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। পর্তুগিজ জাদুকরের সেই কান্না কেবল একটি ম্যাচের পরাজয় ছিল না, সেটি ছিল নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার পর ভাগ্যের কাছে হার মানার নীরব, সকরুণ অভিমান।
সেই বিশ্বকাপটি যেন বিধাতা কেবল ইউসেবিওর জন্যই সাজিয়েছিলেন। মোজাম্বিকের ধুলোমাখা পথ থেকে উঠে আসা এই তরুণের পায়ে ছিল চিতার মতো ক্ষিপ্রতা আর শটে ছিল কামানের গোলার মতো ধ্বংসাত্মক শক্তি। পেলে-গারিঞ্চার পরাক্রমশালী ব্রাজিলকে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় করে দেওয়ার পেছনে তার একক আধিপত্য ছিল এক বিস্ময়। কিন্তু তার অতিমানবিক রূপের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে কোয়ার্টার ফাইনালে, উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে। প্রথম পঁচিশ মিনিটেই তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে যখন পর্তুগিজদের স্বপ্নের সলিল সমাধি হতে চলেছে, ঠিক তখনই যেন ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে জেগে ওঠেন ইউসেবিও। খাদের একেবারে কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলে একাই প্রতিপক্ষের জালে চার-চারবার বল জড়ান তিনি। ৫-৩ গোলের সেই জয় কেবল একটি ম্যাচ জয় ছিল না, সেটি ছিল একজন মানুষের একাকী পুরো একটি দলকে কাঁধে বয়ে নেওয়ার এক অতিপ্রাকৃত আখ্যান।
এরপর সেই অভিশপ্ত সেমিফাইনাল। ওয়েম্বলিতে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল পর্তুগাল। একদিকে ববি চার্লটনের মতো ধ্রুপদী ইংলিশ সেনাপতি, অন্যদিকে পর্তুগালের একাকী যোদ্ধা ইউসেবিও। সেই দিন স্টেডিয়াম ছিল এক গর্জনশীল সাগর, যার ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ছিল ইউসেবিওর ওপর। ইংলিশদের জমাট রক্ষণভাগ যেন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছিল এই কালো চিতার সামনে। প্রতিটি পাস, প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি দৌড়ে তাকে থামানোর জন্য ছিল অগণিত পা, অগণিত শরীর। এরমধ্যেই ববি চার্লটনের জোড়া আঘাতে যখন ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে পর্তুগাল।
তবুও তিনি থামেননি।
তিনি দৌড়েছেন, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে ইতিহাসকে ধরতে চাইছেন। তিনি লড়েছেন, যেন প্রতিটি মুহূর্তে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাইছেন। অবশেষে, এক পেনাল্টি থেকে তিনি গোল করেন। কিন্তু বল জালে জড়ানোর পর মুহূর্তের জন্য উল্লাসে মাতেননি। বরং প্রবল আক্রোশ আর তাড়নায় ছুটে গিয়ে জালের ভেতর থেকে বলটি কুড়িয়ে এনে দৌড়ে যান মাঝমাঠে। সেই গোল ছিল প্রতিবাদের, সেই গোল ছিল বেঁচে থাকার, সেই গোল ছিল ঘোষণা, 'আমি এখনো আছি।' চোখেমুখে তখনো সমতায় ফেরার এক তীব্র, বন্য আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু সময় তখন নিষ্ঠুর। স্কোরবোর্ডে এগিয়ে ইংল্যান্ড, আর ঘড়ির কাঁটা নির্মমভাবে শেষের দিকে এগিয়ে চলেছে।
শেষ বাঁশি।
একটি শব্দ, যা মুহূর্তেই সব স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
জাদুকরী স্বপ্নের মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে। ২-১ গোলের পরাজয় নিশ্চিত হওয়া মাত্রই ওয়েম্বলির সবুজ ঘাসে লুটিয়ে পড়েন পাহাড়সম সেই মানুষটি। যে পায়ের জাদুতে পুরো বিশ্ব বিমোহিত হয়েছিল, যে চওড়া কাঁধটি পুরো একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পরম মমতায় বহন করেছিল, সেই অপ্রতিরোধ্য শিকারি হঠাৎ করেই যেন একদম নিঃস্ব হয়ে যান।
ধীরে ধীরে, খুব ধীরে, চোখ ভিজে ওঠে।
এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা… তারপর আর বাঁধ মানে না।
দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তার সেই কান্না ছিল এক বুক ফাটা আর্তনাদ, এত কাছে এসেও পরম আরাধ্য সেই সোনালি ট্রফি ছুঁতে না পারার যন্ত্রণার। তার পেশিবহুল, ঘর্মাক্ত শরীরটি কান্নার দমকে থরথর করে কাঁপছিল। বিজয়োল্লাসে মত্ত ইংলিশ খেলোয়াড়রাও সেই শোকাহত দৃশ্য দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যান। খোদ ববি চার্লটন এগিয়ে এসে পরম শ্রদ্ধায় আর মমতায় জড়িয়ে ধরেন তাকে, সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন শ্রান্ত, বিধ্বস্ত এক ফুটবল-রাজাকে।
তবুও, ইতিহাস বড় অদ্ভুত।
সেই বিশ্বকাপে নয়টি গোল করে ইউসেবিও হয়ে ওঠেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। তিনি প্রমাণ করেন, ট্রফি না জিতেও একজন খেলোয়াড় কিভাবে পুরো একটি যুগের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তার কান্না, তার দৌড়, তার সংগ্রাম, সবকিছু মিলে তিনি হয়ে ওঠেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
সময়ের স্রোত অনেক কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কত বিশ্বকাপ এসেছে, কত নায়ক জন্ম নিয়েছে, কত ট্রফি উঠেছে আকাশে। কিন্তু সেই এক বিকেলের কান্না, ইংল্যান্ডের সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে থাকা ইউসেবিওর অশ্রুসিক্ত মুখ, তা আজও অমলিন।