সালভাদরের আকাশে 'ফ্লাইং ডাচম্যান'
সময়টা এমন এক উপাখ্যানের, যার শুরু হয়েছিল এক বুক ভাঙা হাহাকার দিয়ে।
ফিরে তাকাতে হবে ২০১০ সালের জোহানেসবার্গে। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই আচমকা শট, আর ডাচদের চোখের জলে ভেসে যাওয়া বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি। চার বছর পর, ২০১৪ সালের ১৩ জুন। ব্রাজিলের সালভাদরে অ্যারেনা ফন্তে নোভা স্টেডিয়ামের ঘাসে পা রেখেই নেদারল্যান্ডস যেন সেই পুরনো প্রেতাত্মার ফিসফিসানি শুনতে পাচ্ছিল। সামনে সেই একই স্প্যানিশ আর্মাডা, যারা 'তিকি-তাকা' নামক এক মায়াজালে পুরো ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে।
ম্যাচের ২৭ মিনিটেই জাবি আলোনসোর পেনাল্টি গোলে স্পেন যখন এগিয়ে গেল, ডাচ সমর্থকদের মনে হলো, ইতিহাস বোধহয় তার নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চলেছে। কে জানত, বিধাতা সেদিন সালভাদরের গোধূলি আকাশে এক অন্যরকম মহাকাব্য লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন! যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক বরপুত্র, রবিন ফন পার্সি।
প্রথমার্ধের খেলা শেষের পথে, ঘড়ির কাঁটা ৪৪ মিনিটে। স্পেনের আক্রমণের ঢেউ সামলে নেদারল্যান্ডস তখন ক্ষণিকের স্বস্তিতে। বল এল লেফট উইং-ব্যাক ডেলি ব্লিন্ডের বাঁ পায়ে। মাঝমাঠের সামান্য একটু বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে তিনি চোখ তুলে তাকালেন। তাঁর সামনে তখন পুরো মাঠ যেন এক বিশাল সবুজ ক্যানভাস।
ব্লিন্ড দেখলেন, স্পেনের দুই অতন্দ্র প্রহরী সার্জিও রামোস আর জেরার্ড পিকের মাঝখানের সামান্য ফাঁক গলে একটি কমলা রঙের বিন্দু তিরের মতো ছুটে যাচ্ছে। সেই বিন্দুটি আর কেউ নন, ডাচ অধিনায়ক রবিন ফন পার্সি। ব্লিন্ড আর দ্বিতীয়বার ভাবলেন না। বাঁ পায়ের জাদুকরী এক সুইংয়ে বলটি ভাসিয়ে দিলেন স্প্যানিশ পেনাল্টি বক্সের দিকে।
বলটি যেন চামড়ার কোনো গোলক ছিল না; সেটি ছিল দূরপাল্লার এক নিখুঁত মিসাইল, যা প্রায় পঞ্চাশ গজ আকাশ পাড়ি দিয়ে ছুটে আসছিল।
বল হাওয়ায় ভাসছে। ফন পার্সি দৌড়াচ্ছেন। বলের গতিপথের দিকে একবার আড়চোখে তাকালেন তিনি। সাধারণত এমন মাপা লং বল বুক দিয়ে নামিয়ে বা পায়ে রিসিভ করে শট নেওয়াটাই যেকোনো বিশ্বমানের স্ট্রাইকারদের ব্যাকরণ। কিন্তু ফুটবলীয় ব্যাকরণের সেই সাধারণ নিয়ম ফন পার্সির জন্য প্রযোজ্য ছিল না। সেই মুহূর্তে তিনি যেন গ্রিক পুরাণের ইকারাস হয়ে উঠলেন, যিনি মোমের ডানা নিয়ে সূর্য ছুঁতে চেয়েছিলেন। তবে ইকারাসের ডানা গলে গিয়েছিল, আর ফন পার্সির ডানা সেদিন রূপ নিয়েছিল এক অমর ভাস্কর্যে।
ডি-বক্সের ঠিক মাথায় পৌঁছাতেই, ফন পার্সি দৌড়ের গতি না কমিয়েই শূন্যে ভাসিয়ে দিলেন নিজের শরীর। যেন কোনো সুপারম্যান ডানা মেলেছেন সালভাদরের আকাশে! মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে, পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তিনি হয়ে উঠলেন এক উড়ন্ত বিহঙ্গ। শরীরটা মাটির ঠিক সমান্তরালে, দুই হাত পাখির ডানার মতো দুপাশে ছড়ানো, আর চোখ বলের দিকে স্থির।
মুহূর্তের জন্য সালভাদরের আকাশ থমকে দাঁড়াল। কয়েক হাজার ক্যামেরা লেন্স স্তব্ধ হলো সেই অবিশ্বাস্য ফ্রেমটি বন্দি করতে। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল বিস্ময়ে। সময় যেন বালুঘড়ির ভেতর আটকে গেল, বাতাসে ভাসমান এক মানবমূর্তি, যাঁর লক্ষ্য কেবল একটি উড়ান্ত গোলক।
ঘাড়ের এক নিখুঁত ও তীক্ষ্ণ মোচড়ে, মাথার সাথে বলের যে চুম্বন ঘটল, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক রোমান্টিক দৃশ্য। বলটি ফন পার্সির কপাল ছুঁয়ে, তাঁর নির্দেশ মেনেই স্প্যানিশ গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াসের মাথার ওপর দিয়ে এক অবিশ্বাস্য বক্ররেখা তৈরি করে জালে আশ্রয় নিল।
স্প্যানিশ গোলরক্ষক ক্যাসিয়াস, যাঁকে ফুটবল বিশ্ব ‘সেন্ট ইকার’ বা সাধু ইকার বলে ডাকত, তিনি কেবল এক পা এগিয়ে এসে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখেমুখে ঘোর অবিশ্বাস, তিনি শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন বল জালে জড়াচ্ছে। যেন নিজের চোখের সামনেই এক অজেয় সাম্রাজ্যের পতন দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি।
বল জালে জড়াতেই স্টেডিয়ামে আছড়ে পড়ল কান ফাটানো গর্জন। ফন পার্সি তখন মাটিতে ল্যান্ড করে স্লাইড করছেন। পরমুহূর্তেই উঠে দাঁড়িয়ে এক অকৃত্রিম উল্লাসে দৌড়ে গেলেন ডাগআউটে, কোচ লুইস ফন গালের দিকে। দুজনের সেই বিখ্যাত ‘হাই-ফাইভ’ যেন পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিল, প্রতিশোধের আগুন কেবল জ্বলতেই শুরু করেছে।
সামুদ্রিক লোককথায় একটি অভিশপ্ত ভূতুরে জাহাজের নাম ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’, যা কখনো বন্দরে ভিড়তে পারে না, অনন্তকাল সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সেই রাতে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক নতুন ‘ফ্লাইং ডাচম্যান’কে। যিনি অভিশাপ দিতে নয়, বরং ডাচদের ফুটবলীয় অভিশাপ মোচন করতে বাতাসে উড়েছিলেন।
সেই গোলটি কেবল একটি সমতাসূচক গোল ছিল না; তা ছিল এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক ভূকম্পন। সেই গোলের পর স্পেনের আত্মবিশ্বাস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে, এবং নেদারল্যান্ডস সেই ম্যাচে স্পেনকে ৫-১ গোলের লজ্জায় ডুবিয়ে এক ঐতিহাসিক প্রতিশোধ সম্পন্ন করে।
বছর ঘুরবে, বিশ্বকাপের অনেক আসর আসবে আর যাবে। নতুন নতুন তারকারা মাঠ মাতাবেন। কিন্তু যখনই ফুটবলের অকৃত্রিম সৌন্দর্যের কথা বলা হবে, তখন সালভাদরের সেই বিকেলের কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে কমলা জার্সির ৯ নম্বর পরা এক জাদুকরের কথা।