৬৯ দিন বাকি

চারটি তারা: ইতালির বিশ্বজয়ের গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক

ফিফা বিশ্বকাপে শিরোপার সংখ্যার বিচারে ব্রাজিলের ঠিক পরেই অবস্থান ইতালির। জার্মানির সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চারবার সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছে তারা। অথচ সেই দলটিই বিস্ময় জাগিয়ে ২০১৪ সালের পর থেকে এই নিয়ে টানা তিনটি আসরে অনুপস্থিত।

ইতালি ১৯৩৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিশ্বজয়ের যে কীর্তি গড়েছে, তার প্রতিটি আসরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ সব তথ্য। আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা জায়গা না পেলেও চলুন ফিরে দেখা যাক আজ্জুরিদের জার্সিতে চারটি তারা যোগ হওয়ার স্মরণীয় মুহূর্তগুলো।

ইতালির বিশ্বকাপ জয়ের তালিকা:

১৯৩৪: ইতালিতে অর্থাৎ ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন
১৯৩৮: ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন
১৯৮২: স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন
২০০৬: জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন

ইউরোপের প্রথম বিশ্বজয়

১৯৩৪ সালের আসরটি ছিল ইউরোপের মাটিতে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপ। স্বাগতিক হওয়ার পরেও ইতালিকে বাছাইপর্ব খেলে মূল আসরে জায়গা করে নিতে হয়েছিল। আগের অর্থাৎ বিশ্বকাপের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে সেবার অংশ নেয়নি। চার বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় খেলতে যাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় ইউরোপের দেশগুলোর অনীহার প্রতিবাদে তারা প্রতিযোগিতাটি বয়কট করেছিল।

ওই আসরটি ছিল সরাসরি নকআউট পদ্ধতির (শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের সমন্বয়ে)। মাত্র ১৭টি ম্যাচের আসরটি এখনো বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ম্যাচের আসরের রেকর্ড ধরে রেখেছে। ইতালিকে খেলতে হয়েছিল পাঁচটি ম্যাচ (স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ড্র হওয়ায় ঠিক পরের দিনই আবার খেলাটি পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল)।

বিশ্বমঞ্চে ইতালির অভিষেক ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করার মধ্য দিয়ে। এটি এখন পর্যন্ত একমাত্র ম্যাচ, যেখানে ইতালি বিশ্বকাপে চারটির বেশি গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। তৎকালীন ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী বেনিতো মুসোলিনি ঘরের মাঠে দলের জয় নিয়ে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। শেষ পর্যন্ত রোমের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনালে অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিওর লক্ষ্যভেদে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারায় ইতালি। প্রথম ইউরোপিয়ান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে তারা।

বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে শ্রেষ্ঠত্ব

ফুটবল ইতিহাসে ভিত্তোরিও পোজো একমাত্র কোচ, যিনি দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়েছেন আর ১৯৩৮ সালের আসরটিই এর মূল কারণ। ইতালি প্রথম দেশ হিসেবে সেবার নিজেদের বিশ্বসেরার মুকুট ধরে রাখতে সক্ষম হয় (পরবর্তীতে কেবল ব্রাজিল এই কীর্তি গড়েছে)।

নিজেদের প্রথম ম্যাচে নরওয়ের বাধা টপকাতে ইতালির অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এরপর বোর্দোতে কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের মুখোমুখি হয় তারা। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যে দুই দল একটি করে গোল করলে লড়াই জমে ওঠে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে কিংবদন্তি স্ট্রাইকার সিলভিও পিওলার জোড়া গোল ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। স্বাগতিকদের বিদায় করে সেমিফাইনালে পা রাখে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্যারিসের ফাইনালে হাঙ্গেরির মুখোমুখি হয় ইতালি। ফাইনালে পিওলা আরও দুটি গোল করেন, সাথে জিনো কোলাউসির জোড়া লক্ষ্যভেদে হাঙ্গেরিকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখে আজুরিরা। ম্যাচপ্রতি গোলের গড়ের দিক থেকে এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরিং টুর্নামেন্ট (প্রতি ম্যাচে ৪.৬৭ গোল)।

১৯৩৮ সালের সেই ইতালি দল ফুটবল ইতিহাসের মাত্র চারটি দলের একটি, যারা বিশ্বকাপের কোনো আসরের প্রতিটি ম্যাচে জয়লাভ করেছে। আর ১৯৩৪ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তাদের কাছেই গচ্ছিত ছিল পরম আকাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি। এর পেছনে মাঠের পারফরম্যান্সের ছিল নয়, বরং দায়ী ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা।

শূন্য থেকে নায়ক

১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজও এক রঙিন স্মৃতি। ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিরা তাদের ইতিহাসের সেরা একাদশগুলো নিয়ে হাজির হয়েছিল স্পেনের মাটিতে। তবে টুর্নামেন্ট শেষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল ইতালি। অবসান ঘটেছিল ৪৪ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার, আজ্জুরিরা জিতেছিল তাদের তৃতীয় শিরোপা।

ধীরগতিতে শুরু করে রাজকীয় সমাপ্তি— ইতালির কৌশলটা ছিল অনেকটা এমনই। প্রথম রাউন্ডে একটি ম্যাচও না জিতে পরের পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছিল ইতালি। পোল্যান্ডের সাথে ০-০, পেরুর সাথে ১-১ ও ক্যামেরুনের সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছিল তারা। দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে ওঠার পুরস্কার হিসেবে ইতালিকে পড়তে হয় দক্ষিণ আমেরিকার দুই জায়ান্ট ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সামনে। তবে টুর্নামেন্টের শুরুতে খর্বশক্তির দলগুলোর বিপক্ষে জিততে না পারা ইতালিই ছন্দে ফিরে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয়।

এরপর ইতালি বনাম ব্রাজিল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় সর্বকালের অন্যতম সেরা লড়াই হিসেবে অমর হয়ে আছে। পাওলো রসি শুরুতে ইতালিকে লিড এনে দিলেও সক্রেটিস সমতা ফেরান। কিছুক্ষণ পর রসি আবার ব্যবধান ২-১ করেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ফ্যালকাওয়ের গোলে আবারও সমতা টানে ব্রাজিল। তারপর ম্যাচ শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট আগে রসি তার হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের দায়ে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা এই স্ট্রাইকার দলকে জিতিয়ে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্পটি লিখে ফেলেন।

রসির জাদু সেখানেই শেষ হয়নি। সেমিফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়েও তিনি লক্ষ্যভেদ করেন। গোল্ডেন বুটের সাথে গোল্ডেন বল নিজের করে নেন তিনি। তার নৈপুণ্যে ব্রাজিলের সমান তিনটি শিরোপার মালিক হয় ইতালি। তবে তাদের চতুর্থ ট্রফির অপেক্ষা শেষ হওয়ার আগেই ব্রাজিল পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়।

অনন্য এক দলগত জয়

২০০৬ সালের আসরেও ফেভারিটদের তালিকায় অনেক পেছনে থাকা ইতালি গ্রুপ পর্বের বাধা অনায়াসেই পার করে। টুর্নামেন্টের ভাগ্য যখন পরিণতির দিকে গড়িয়েছিল, তখনই জ্বলে উঠেছিল তারা। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক জার্মানি, যারা ঘরের মাঠে দর্শকদের প্রবল সমর্থন সঙ্গী করে আসরজুড়ে দারুণ ফুটবল খেলছিল।

সেই লড়াইটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে অমর হয়ে আছে। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা গোলশূন্য থাকায় পেনাল্টি শুটআউট ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ঠিক তখন মুহূর্তের ব্যবধানে জোড়া গোল করে জার্মানিকে স্তব্ধ করে দেয় তারা। ১৯৯৪ সালে রানার্সআপ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখে আজ্জুরিরা।

ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল টাইব্রেকারে। আর সেখানে শেষ হাসি ছিল ইতালিরই। বার্লিনে হওয়া ম্যাচটি চিরকাল মনে রাখা হবে মাঠের ভেতরে জিনেদিন জিদানের মার্কো মাতেরাজ্জিকে 'হেডবাট' বা ঢুস মারার অকল্পনীয় ঘটনার জন্য। যার ফল হিসেবে তার কপালে জুটেছিল লাল কার্ড। টাইব্রেকারে জিদানের অভাব হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল ফ্রান্স। ডেভিড ত্রেজেগের মিসের বিপরীতে ইতালিয়ানদের পাঁচটি শটই সফল হয়।

সেমিফাইনালের নায়ক ফাবিও গ্রসো ইতালির হয়ে জয়সূচক স্পট-কিকটি নেন। এই জয়ে ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় দল হিসেবে অন্তত চারবার বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি গড়ে ইতালি (পরবর্তীতে জার্মানি তাদের পাশে বসে)। পুরো আসরে তাদের পক্ষে রেকর্ড ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেছিলেন, যা দলগত সংহতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিল।