৫০ কোটি টিকিট অনুরোধের ঢোল ফিফার : সংখ্যা বড়, প্রশ্ন আরও বড়

স্পোর্টস ডেস্ক

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট নিয়ে আগ্রহের যে চিত্র তুলে ধরছে ফিফা, তা দেখলে মনে হতে পারে, বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা যেন হুড়োহুড়ি করে টিকিট কিনতে নেমে পড়েছেন। ফিফার দাবি অনুযায়ী, বিশ্বকাপের টিকিটের জন্য এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৫০ কোটি অনুরোধ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এই সংখ্যা ১৫ কোটি থেকে ৩৫ কোটি হয়ে অর্ধ বিলিয়নে পৌঁছেছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একে আখ্যা দিয়েছেন 'অবিশ্বাস্য' এবং বলেছেন, এটি শুধু চাহিদা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক বার্তা।

কিন্তু এই বিপুল সংখ্যার আড়ালেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো, যেগুলোর উত্তর ফিফা দিচ্ছে না।

সংখ্যা আছে, ব্যাখ্যা নেই

৫০ কোটি অনুরোধ, শুনতে বিশাল। তবে এই অনুরোধগুলো ২০২৬ বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচে কীভাবে ভাগ হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ফিফা। কোন ম্যাচে কতটা আগ্রহ, আর কোন ম্যাচে আগ্রহ কম, এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া সংখ্যাটি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

বিশ্বকাপজুড়ে আগ্রহ যে থাকবে, তা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। ৪৮ দল, রেকর্ডসংখ্যক ম্যাচ, উত্তর আমেরিকার বিশাল স্টেডিয়াম আর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজন, সব মিলিয়ে ২০২৬ আসর যে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে, তা কারও অজানা নয়। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া বিশ্বকাপ এখনো দর্শকসংখ্যার মানদণ্ড, তখন যেখানে দল ছিল ২৪টি। এবার সেই সংখ্যা দ্বিগুণ।

দাম নিয়ে সমালোচনার মাঝেই 'চাহিদার গল্প'

এই টিকিট উৎসাহের প্রচার যে সময়টায় করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের টিকিটের চড়া দাম নিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফিফা একের পর এক ঘোষণা দিয়ে বোঝাতে চাইছে, সমালোচনা সত্ত্বেও মানুষ এই দাম দিতে প্রস্তুত, চাহিদা সরবরাহকে অনেক পেছনে ফেলেছে, এমনকি টিকিটের দাম হয়তো যথেষ্ট বেশি নয়।

কিছু ম্যাচের ক্ষেত্রে এই দাবি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পর্তুগাল-কলম্বিয়া, মেক্সিকোর ম্যাচ কিংবা বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো হাই-প্রোফাইল ম্যাচে ফিফা আরও বেশি দাম নিলেও টিকিট বিক্রি হতো। এমনকি ফাইনালের জন্য বর্তমান সর্বোচ্চ ৮,৬৮০ ডলারের চেয়েও বেশি মূল্য ধার্য করা যেত।

কিন্তু সব ম্যাচ কি এক রকম?

সমস্যা শুরু হয় অন্য জায়গায়। অপেক্ষাকৃত কম আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোতে কি একই রকম আগ্রহ রয়েছে? মিশর–ইরান, কুরাসাও–আইভরি কোস্ট বা যুক্তরাষ্ট্র–প্যারাগুয়ের মতো ম্যাচগুলোর জন্য শত শত ডলারের টিকিটে কি সত্যিই লাখ লাখ আবেদন পড়েছে?

ফিফা বলছে, এই ৫০ কোটি অনুরোধ প্রমাণ করে যে বিশ্বকাপজুড়ে চাহিদা আকাশচুম্বী। কিন্তু বাস্তবে এমনও হতে পারে, মোট অনুরোধের বড় অংশ এসেছে মাত্র ২৫–৩০টি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচ থেকে। বাকি ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে চাহিদা কতটা, তা জানা যাচ্ছে না, কারণ ফিফা ম্যাচভিত্তিক কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।

রিসেল বাজার কতটা প্রভাব ফেলছে?

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনিয়ন্ত্রিত টিকিট পুনর্বিক্রয় বাজারও এই সংখ্যাকে ফুলিয়ে তুলেছে। অনেক ম্যাচেই এখনই দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক দামের কয়েকগুণ দামে টিকিট বিক্রি হচ্ছে সেকেন্ডারি মার্কেটে। ফলে প্রকৃত সমর্থকের পাশাপাশি বিনিয়োগ বা লাভের আশায় টিকিটের জন্য আবেদন করেছেন এমন মানুষ ও স্ক্যালপাররাও এই সংখ্যার অংশ, যার প্রকৃত পরিমাণ অজানা।

আসল পরীক্ষা হবে মাঠে

শেষ পর্যন্ত, পর্তুগাল–কলম্বিয়া বা বিশ্বকাপ ফাইনালের জন্য কত মিলিয়ন অনুরোধ পড়েছে, সেটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওই ম্যাচগুলোয় স্টেডিয়াম ভরবেই। আসল প্রশ্ন হলো, গ্রুপ পর্বের কম আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোতেও কি গ্যালারি ভরবে? যুক্তরাষ্ট্রের লেভিস স্টেডিয়াম বা অনুরূপ ভেন্যুগুলোতে কি দেখা যাবে প্রাণবন্ত বিশ্বকাপের আবহ?

যদি তা না হয়, তাহলে ফিফাকে হয়তো আরও এক দফা টিকিটের দাম কমাতে হবে, যা আগেভাগে চড়া দামে টিকিট কেনা সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেবে। অতএব, ৫০ কোটির সেই ঝলমলে সংখ্যাটি এই টিকিট কাহিনির শেষ কথা নয়। এই গল্পের প্রকৃত উত্তর মিলবে বিশ্বকাপ শুরু হলে মাঠে, গ্যালারিতে এবং দর্শকদের উপস্থিতিতেই।