রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ ইউক্রেনের

স্পোর্টস ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ফুটবলে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইচ্ছা প্রকাশ করে বিতর্কের জন্ম দিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি রাশিয়াকে ফের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনার কথা বলতেই ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সরাসরি ইনফান্তিনোকে আখ্যা দেন 'নৈতিকভাবে অধঃপতিত' হিসেবে।

২০২২ সালে ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণের পর ফিফা ও উয়েফা যৌথভাবে রুশ ক্লাব ও জাতীয় দলকে আন্তর্জাতিক ও ক্লাব পর্যায়ের সব প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করে। সে সময় পোল্যান্ড, সুইডেন, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বহু দেশ ঘোষণা দিয়েছিল, তারা রাশিয়ার বিপক্ষে খেলবে না। প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখেই ফিফা কাউন্সিল ও উয়েফার নির্বাহী কমিটি এই সিদ্ধান্ত নেয়।

তখন ফিফা এক বিবৃতিতে বলেছিল, ফুটবল ইউক্রেনের জনগণের পাশে আছে এবং শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি এক মিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তার ঘোষণাও দেন ইনফান্তিনো। কিন্তু সাম্প্রতিক স্কাই নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা "কিছুই অর্জন করতে পারেনি, বরং হতাশা ও ঘৃণা বাড়িয়েছে।" তিনি আরও দাবি করেন, রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো দেশের শিশু-কিশোরদের ফুটবল থেকে দূরে রাখা উচিত নয় এবং রুশ শিশুদের ইউরোপে খেলতে দেওয়া পরিস্থিতি "ভালো করতে পারে"।

এই বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, "৬৭৯ জন ইউক্রেনীয় শিশু আর কখনো ফুটবল খেলতে পারবে না, রাশিয়া তাদের হত্যা করেছে। যুদ্ধ চলছেই, অথচ কিছু নৈতিকভাবে অধঃপতিত মানুষ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একে ১৯৩৬ সালের অলিম্পিকের লজ্জার সঙ্গে তুলনা করবে।"

ইউক্রেনের ক্রীড়ামন্ত্রী মাতভি বিদনি ইনফান্তিনোর মন্তব্যকে "দায়িত্বজ্ঞানহীন ও শিশুসুলভ" আখ্যা দিয়ে বলেন, ফুটবলকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হচ্ছে, যেখানে শিশুদের জীবন যাচ্ছে। তিনি নিহত কিশোর ক্রীড়াবিদদের উদাহরণ তুলে ধরেন, মারিউপোলের স্কুলছাত্র ইলিয়া পেরেজহোগিন, যিনি স্কুল মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন, কিংবা কিয়েভে গোলাবর্ষণে নিহত সাবেক ফুতসাল খেলোয়াড় ভিক্তোরিয়া কোটলিয়ারোভা।

ইউক্রেন ফুটবল ফেডারেশন (ইউএফএ) এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানায়, যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়াকে ফুটবলে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের ভাষায়, আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাই কার্যকর চাপের মাধ্যম, আর রাশিয়ার পুনঃঅন্তর্ভুক্তি প্রতিযোগিতার নিরাপত্তা ও নৈতিকতার জন্য হুমকি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য ডন বেকনও ইনফান্তিনোর সমালোচনায় ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, যতদিন রাশিয়া আগ্রাসন চালাবে, ততদিন তাদের ফিফা থেকে নিষিদ্ধই থাকা উচিত।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ফিফা ও উয়েফা সীমিত পরিসরে রাশিয়ার অনূর্ধ্ব-১৭ দলকে নিরপেক্ষ পরিচয়ে ফেরানোর উদ্যোগ নিলেও ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিবাদের মুখে উয়েফা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

রাশিয়া ইস্যুর পাশাপাশি গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েল প্রসঙ্গেও ফিফার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফলে ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু ইউক্রেন নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনেই নতুন করে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বিতর্ক উসকে দিয়েছে।