হোয়াইট হাউসের লেখা ‘ড্রাফট’ পোস্ট করেই যুদ্ধ থামালেন শেহবাজ শরিফ?
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের গতকালের একটি বিবৃতির পেছনে প্রকৃতপক্ষে কী ছিল, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার শেষ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া ওই পোস্টটি দুইবার এডিট করা হয়। প্রথমবার পোস্ট করার সময় উপরে লেখা ছিল, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তার খসড়া (*Draft - Pakistan’s PM Message on X*)।
শেহবাজ শরিফ নিজের পোস্টের খসড়া তৈরির সময় এমন কিছু লিখবেন না, তা সহজেই বোঝা যায়। অপরদিকে, তার মিডিয়া টিমের কেউ এটা লিখলেও, 'পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা' লিখবেন কি না, তা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।
Diplomatic efforts for peaceful settlement of the ongoing war in the Middle East are progressing steadily, strongly and powerfully with the potential to lead to substantive results in near future. To allow diplomacy to run its course, I earnestly request President Trump to extend…
— Shehbaz Sharif (@CMShehbaz) April 7, 2026
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, ওই পোস্টের ড্রাফট তৈরিতে হোয়াইট হাউস সরাসরি জড়িত ছিল।
তাহলে সরাসরি জড়িত থাকার অর্থ কি এই যে—হোয়াইট হাউসই ওই খসড়াটি লিখে দিয়েছিল?
কী ছিল পোস্টে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম শেষ হওয়ার কয়েকঘণ্টা আগে শেহবাজ শরিফ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে এক্সে (সাবেক টুইটার) যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি পোস্ট দেন।
পোস্টে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন যে, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সময় যেন আরও ২ সপ্তাহ বাড়ানো হয়।
একইসঙ্গে তিনি ইরানের প্রতি অনুরোধ জানান, যেন তারা দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেন।
যুদ্ধের সব পক্ষকে ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
এই পোস্ট দেওয়ার কয়েকঘণ্টা পর তিনি আরেকটি পোস্টে জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং শুক্রবার ইসলামাবাদে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
এরপরই সারাবিশ্ব জানতে পারে যে পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এ সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ হচ্ছে, দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
ড্রাফট কি হোয়াইট হাউসের তৈরি
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, শেহবাজ শরিফ পোস্টটি করার আগে হোয়াইট হাউস সেটি দেখেছিল ও অনুমোদন দিয়েছিল।
এতে বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের চেয়ে পেছনের কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো অনেক বেশি সক্রিয় ছিল।
অর্থাৎ, আলটিমেটাম শেষের আগের রাতে ট্রাম্প ইরানের হাজার বছরের 'সভ্যতা ধ্বংসের' যে হুমকি দেন, সেটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হওয়ার পর যেকোনো ধরনের সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইসলামাবাদকে চাপ দিচ্ছিল যেন তারা ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করায়।
পাকিস্তানের গোপন যোগাযোগ সম্পর্কে জানেন এমন অন্তত পাঁচ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে জানায়, তেলের দাম বাড়তে থাকায় ট্রাম্প একদিকে যেমন ছিলেন উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে ইরানের দৃঢ় শাসনে তিনি একইসঙ্গে বিস্মিত হচ্ছিলেন।
২১ মার্চ ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির জন্য উদগ্রীব ছিলেন বলে কর্মকর্তাদের ধারণা।
ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটামের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় ফোনালাপ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ধারণা ছিল, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব কোনো মুসলিম-প্রধান প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের কাছে গেলে তা গ্রহণ করার সম্ভাবনা বেশি হবে।
এরপর আসিম মুনির কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে।
এরপরই শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের কথা জানিয়ে এক্সে পোস্ট দেন।
পোস্টে তিনি ট্রাম্পের কাছে কূটনৈতিক সময়সীমা দুই সপ্তাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানান এবং ট্রাম্পসহ তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের ট্যাগ করেন।
তিনি এই প্রস্তাবকে পাকিস্তানের নিজস্ব উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করলেও পোস্টের উপরে ভুলবশত খসড়া (*Draft - Pakistan’s PM Message on X*) লেখাটি রয়ে যায়।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই এই মধ্যস্থতাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত চিত্রনাট্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অনেকেই বলেন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের কোনো নিজস্ব অবস্থান নেই, তারা শুধু হোয়াইট হাউসের নির্দেশ পালন করেছে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ওই পোস্টটি লিখে দেননি বলে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান দূতাবাসও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের উদ্যোগ হোক কিংবা শেহবাজ শরিফের ব্যক্তিগত উদ্যোগ হোক—বিষয়টি সাময়িকভাবে কাজে দিয়েছে। ওই পোস্টের কয়েকঘণ্টা পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তিনি ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন।
সংশয়ের মধ্যেই আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম।




